হিমাচলের ভীমকালী এবং চম্বলের চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরের রহস্যময়তা নিয়ে লিখছেন সমৃদ্ধ দত্ত।
Advertisement
একটু পর সন্ধ্যা হয়ে যাবে। কিন্তু এখনও অন্তত এক ঘণ্টার জার্নি। হয়তো লেগে যেতে পারে তারও বেশি। এটা রামপুর বুশাহর। অতীতের বুশাহর রাজ্যের কেন্দ্রস্থল। প্রায় মাটি ঘেঁষেই যে নদী বয়ে যাচ্ছে অবিরত কুলকুল শব্দ করে, তার নাম শতদ্রু। সূর্যাস্ত আসার আগে যেন নিজেকে মনে করিয়ে রাখার জন্যই সূর্যালোক বিদায়ের পূর্ব মুহূর্তে চরাচরের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছে নিজেকে। শতদ্রুর প্রতিটি তরঙ্গ থেকে যেন বিচ্ছুরিত হচ্ছে রামধনুর দ্যুতি। পথপার্শ্বের দেওদারে জ্বলছে সেই একই আলো। পাইন থেকে চুঁইয়ে পড়ছে রশ্মি। এই পথ চলেছে সারাহান। শতদ্রুর কলতান এবং শেষ বিকেলের সূর্যালোক ক্রমেই স্তিমিত হয়ে আসে সারাহানের পাহাড়ি পথে। তখন শুধুই নির্জনতা। হঠাৎ করে আসা দীর্ঘ বিস্তৃত শ্বাসের শব্দ। প্রকৃতির সেই শ্বাস নিশ্চিত শ্রীখণ্ড পাহাড় থেকে ধেয়ে আসা বাতাসের সৃষ্টি।
ভীমকালী মন্দির
হিমাচল প্রদেশ
পৌঁছতে কি সন্ধ্যা হয়ে গেল? কানে আসছে না কোনও ঘণ্টাধ্বনি? বাতাসে মিশে নেই উগ্র ধূপের সুবাস? তাহলে এখনও সারাহান আসেনি? কারণ সারাহানে প্রবেশ করা হলে এই মাহেন্দ্রক্ষণে এতক্ষণে নিশ্চিত কানে আসবে ঘণ্টা আর কাঁসরের মিলিত ধ্বনি। যা প্রতিধ্বনিত হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে পাহাড় আর অরণ্যের নিস্তব্ধ রহস্যময়তায়। উৎস কী ওই ধ্বনি এবং প্রতিধ্বনির? সারাহানে প্রবেশের পর ক্ষুদ্র নির্জন একাকী জনপদের কেন্দ্রস্থলের প্যাগোডা আকৃতির ওই মন্দিরই হল সারাহান, বুশাহর রানওয়ানের মতো গ্রামগুলির আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় চালিকাশক্তি। ভীমকালী মন্দির। দেবী দুর্গার আদিরূপ আদিশক্তির প্রকাশের স্থানই কি ছিল এই পাহাড় আর অরণ্যবেষ্টিত হিমাচলের প্রান্তিক এক পার্বত্য উপত্যকায়? হিমাচলপ্রদেশ তো বটেই, উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন গাড়োয়ালের পাহাড়ি সভ্যতায় এরকমই বিশ্বাস। সিমলা থেকে ১৮৪ কিলোমিটার দূরের সারাহানে এক চিরন্তন রহস্য নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভীমকালী মন্দির!
প্রথমেই কেন ঘণ্টাধ্বনির প্রসঙ্গ উত্থাপন? কারণ ভীমকালী মন্দিরের সন্ধ্যারতির শব্দ সারাহানের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে যায়। আর জনশ্রুতি হল, মন্দিরে আরতি হচ্ছে, অথচ মন্দির থেকে অনেকটা দূরে থাকলেও কেউ সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছে না, তাহলে সেটি এক বিপজ্জনক পূর্বাভাস। সেই মানুষটির মধ্যে অপদেবতা ভর করেছে। অথবা সে অসুস্থ হবে। শীঘ্রই। অতএব দিতে হবে পুজো। শ্রবণশক্তির ইন্দ্রিয়ই তো ভীমকালীর সর্বোচ্চ আশীর্বাদ। এই বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে মিশে থাকা উৎকৃষ্ট অংশ যেন কর্ণকুহরে প্রবেশ করে। সন্ধ্যারতির মাধুর্য চিরকাল থেকে যাবে কানের মাধ্যমে অন্তরে। অর্থাৎ মাতা ভীমকালীর বরাভয় প্রতিষ্ঠিত হল হৃদয়ে। এই শ্রবণের মাহাত্ম্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ সতীর দেহত্যাগের পর বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র তাঁর শরীরকে খণ্ডবিখণ্ড করে যেভাবে ছড়িয়ে দিয়েছিল ভারতবর্ষ জুড়ে, সেই পুরাণকথার বিশ্বাস এখানেই পড়েছিল দেবীমাতার কান। আর তাই পাঁচতলা ভীমকালী মন্দিরে প্রবেশ করে দেবীমূর্তিকে প্রথাগতভাবে প্রণাম করলেই হল না। দেবীর গর্ভগৃহের দেওয়ালকে মনে করতে হবে দেবীর কান। অতএব মনস্কামনা, মানত, দুঃখ, সুখ এবং কামনা বাসনার কথা দেবীকে জানাতে হবে কানে কানে। দেওয়ালে মুখ রেখে। ঠিক যেভাবে হিন্দুধর্মের আচারে দেখা যায় যে কোনও শিবমন্দিরে নন্দী থাকলে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে পুণ্যার্থীরা মনস্কামনা ব্যক্ত করছে।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এখনও যেন প্রকৃতি সুস্থিতি হননি এখানে। তাই ভূমি দুলে ওঠে যখন তখন। ভয় পায় না জনপদবাসী। কারণ ভীমকালী মাতা আছেন। ১৯০৫ সালের ভূমিকম্পে প্রাচীন মন্দিরের কাঠের কাঠামো সম্পূর্ণ উপড়ে গিয়ে ডানদিকে হেলে যায়। সামান্য কিছু ঘর গ্রামবাসীই ছিল সেই সময়। তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। স্বয়ং মাতার মন্দির যদি ভাঙনকালের ইঙ্গিত দেয় তাহলে তো সারাহান বুশাহর ধ্বংস হয়ে যাবে! সেই ভাবনার মধ্যেই আবার ভূমিকম্প। গ্রামবাসী দেখতে পেল একটি ভূমিকম্পে মন্দির কাঠামোর ঠিক যেটুকু স্থানবিচ্যুতি ঘটেছিল, পরবর্তী ভূমিকম্পে অবিকল পূর্বাবস্থায় ফিরে গিয়েছে মন্দির। অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় আফটারশক-এ ফিরে এসেছে মন্দিরের পূর্বাবস্থা।
মিথ আর পুরাণ ঘিরে থাকে ভারতের প্রতিটি মন্দিরেই। ভীমকালীর মিথ কী? একাধিক। প্রথমত বনাসুর অত্যাচার চালাচ্ছে ঋষি ও দেবতাদের উপর। অতঃপর দেবতারা শরণাগত বিষ্ণুর কাছে। তিনি শ্বাস থেকে নির্মাণ করলেন অগ্নিশিখা। আর সেই অগ্নির ধুম্র থেকে আত্মপ্রকাশ করলেন আদিশক্তি। দেবতারা তাঁকে দিলেন অস্ত্র ও উপকরণ। কুবের থেকে বরুণ। কেউ মুকুট, কেউ চক্র। কেউ পোশাক। কেউ গোলাপ। আর এই আদিশক্তিই দেবী দুর্গা। তাই প্রাত্যহিক পুজোয় অন্যতম মন্ত্রোচ্চারণ দুর্গা সপ্তশতী।
দ্বিতীয় মিথে মিশে আছেন কৃষ্ণ। দুই মিথেই বোঝা গেল সারাহন বুশাহরের প্রকৃত শাসক ছিলেন সেই বনাসুরই। তাঁর কন্যা ঊষা স্বপ্নে এক আশ্চর্য সুন্দর পুরুষকে দেখতে পেয়ে হাত বাড়ায়। কিন্তু সেই পুরুষ হঠাৎ মিলিয়ে যায়। তাকে ছোঁয়া গেল না। ঊষার একান্ত প্রিয় সখী চিত্রলেখা স্বপ্নের কথা শুনে বলল, কেমন দেখতে সেটা মনে আছে? ঊষা বলল, হুবহু। চোখের সামনে যেন ভাসছে। চিত্রলেখা বলল, তাহলে আমাকে বল। ঊষার বর্ণনায় চিত্রলেখা অবিকল সেই সুন্দর পুরুষের ছবি এঁকে ফেলল। আর ঊষা বলল, হ্যাঁ, এই সেই পুরুষ। কিন্তু উপায় কী? কোথায় পাওয়া যাবে? চিত্রলেখা বলল, আমি বেরব তোমার জন্য। দেখা যাক পাই কি না। চিত্রলেখা দিন, মাস বছর ঘুরে এক নগরীতে জানতে পারল সেই পুরুষের অবস্থান। যখন সে ঘুমাচ্ছে। ঘুম না ভাঙিয়ে নিয়ে এল সেই পুরুষকে সঙ্গে করে। ঊষার কাছে। এবং ঘুম ভেঙে পুরুষ হতবাক। এসব কী? এরা কারা? ইনি ঊষা। আপনি এসেছিলেন স্বপ্নে। বলল, চিত্রলেখা।
হঠাৎ দ্বারকানরেশ শ্রীকৃষ্ণ এই সামান্য রাজ্য আক্রমণ করছেন কেন? বনাসুর তো বুঝতেই পারছেন না। তিনি পারবেন কেন যুদ্ধে? অতএব শ্রীকৃষ্ণ পরাস্ত করলেন। গোটা রাজ্য দখল করলেন কৃষ্ণ। কিন্তু অপরাধটা তো বোঝা গেল না? বনাসুর জানতে চাইলেন। শ্রীকৃষ্ণ জানালেন, আমার পুত্রকে অপহরণ? স্পর্ধা কতটা? বনাসুর অবশেষে জানতে পারলেন তাঁর কন্যা আর তার সখীর কাণ্ড। তাঁর ঘরেই যে কৃষ্ণপুত্র অনিরুদ্ধ বসে আছে সেকথা বনাসুরের জানাই ছিল না। তিনি সেকথা জানাতে এবার কৃষ্ণ বুঝলেন সত্যিই তো এই শাসকের দোষ নেই। তিনি নিজেই বিবাহ দিলেন ঊষা আর অনিরুদ্ধের। আর ফিরিয়ে দিলেন রাজ্য। যার নাম শোণিতপুর।
এই দুই মিথের মধ্যে যে দুই কাহিনি মিশে রয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে একটি কাহিনিতে শ্রীকৃষ্ণ বনাসুরের কন্যার সঙ্গে নিজের পুত্রের বিবাহ দিলেন। আবার অন্য কাহিনি বলছে, সেই বনাসুরকেই হত্যা করার জন্য বিষ্ণু নির্মাণ করেছিলেন আদিশক্তির!
আসলে কি যুদ্ধ হয়েছিল? হ্যাঁ। একটি যুদ্ধ হয়েছিল পাহাড়ি রাজ্য কুলুর সঙ্গে বুশাহরের। ঊনবিংশ শতকে। কুলুর সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দেন বুশহরের রাজার বাহিনী। কুলুর রাজা প্রাণ হারান। এবং জয়ের স্মারক হিসেবে তাঁর ছিন্নমস্তক নিয়ে আসা হয় সারাহানে। ভীমকালী মন্দিরের সামনে। তুলে নিয়ে আসা হয় কুলু রাজবংশের গৃহদেবতাকে। শ্রীরঘুনাথ। কুলুর পরাজিত প্রতিনিধিরা বুশাহর রাজার কাছে আবেদন করলেন, আমাদের রাজার ছিন্নমস্তক ফিরিয়ে না দিলে তাঁর আত্মার শান্তি হবে না। আমাদের নিজস্ব রীতির সৎকার ও অন্ত্যেষ্টি না করলে পরবর্তী বংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। মহারাজা রাজি হলেন। ফিরিয়ে দেওয়া হল পরাজিত রাজার ছিন্নশির। কিন্তু রঘুনাথ মূর্তি ফিরিয়ে দেওয়া হবে না। স্থাপিত হবে এখানেই। কুলুবাসীরা ভগ্নমনোরথে মেনে নিলেন। তবে জানালেন, রঘুনাথ আপনাদের কাছে রইলেন। তাই আপনাদের কিন্তু দশেরার উৎসব করতে হবে। বুশাহর রাজা সম্মতি দিলেন। সারাহানে তাই দশেরা উৎসব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মনস্কামনা পূরণের পর ওই সময় সীমায় শ্রদ্ধার্ঘ্য দিতে হবে ভীমকালীকে।
মনস্কামনা পূরণ হলেই কি ভক্তের সমর্পিত প্রাণের পূর্ণাঙ্গ নিবেদন সমাপ্ত হয়ে গেল? না। নবরাত্রি উৎসবে আসতে হবে। দিতে হবে উৎসর্গ। কী উৎসর্গ? পশু অথবা প্রতীকী কিছু। সিংহভাগ ক্ষেত্রেই আধুনিক সময়ে হয়ে দাঁড়িয়ে মুরগি কিংবা পাঁঠা। এই প্রথার পিছনে হেঁটে গেলে কী পাওয়া যাবে? পাওয়া যাবে এক স্তব্ধ করে দেওয়া প্রাচীন প্রথা। যা মাত্র একশো বছর আগেও ছিল। এবং সারাহানের বৃদ্ধ পুরোহিতরা জনান্তিকে বলবেন, আধুনিক কালেও ঘটেছে সেই প্রথার প্রকাশ! নরবলি!
মন্দিরের একপ্রান্তে থাকা ওই যে কুয়ো। আর পিছনে থাকা গাছ। প্রতি বছর নির্দিষ্ট তিথি ধার্য করা হতো। আর গ্রাম অথবা গ্রামের বাইরের কোনও পরিবারের এক সদস্যকে মনোনীত করা হতো। যদিও জনমনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যে, একমাত্র নিজে রাজি হলেই দেবীর চরণে আত্মবলিদান দেওয়া যায়। জোর করে নয়। কিন্তু সারাহানের প্রাচীন মানুষের বক্তব্য, কতজন আর নিজের জীবন স্বেচ্ছায় দান করে? অতএব অবশ্যই জোর করেই এই প্রথা চালানো হতো। যাকে মনোনীত করা হতো বলির জন্য, ৬ মাস ধরে সে থাকবে গর্ভগৃহের নীচে বন্দি। যা প্রাণ চাইবে সে তাই পাবে খেতে। কিন্তু একটি শক্ত দড়ি তৈরি করবে সে এই ৬ মাসে। ঠিক যেদিন দড়ি তৈরি নিখুঁতভাবে সমাপ্ত হবে, তার সাতদিনের মধ্যে হবে বলিদান!
সেই দড়ির একটি প্রান্ত বাঁধা হবে কুয়োর কাছে। যে স্থানের নাম লঙ্কা বীর। আর অন্য প্রান্ত গাছে। দড়ির দুই দিকে পা দিয়ে হাত-পা বেঁধে গাছের দিক থেকে কুয়োর দিকে সামান্য হেলে যাওয়া দড়ি ধরে ঠেলে দেওয়া হবে তাকে। আর কুয়োর কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে বলিদান! ফিনকি দিয়ে উঠবে রক্ত। বিশুদ্ধ হবে শোণিতপুর। সারাহানের যে নাম ছিল অতীতে! রক্তপুর।
আর সেই রক্ত ছড়ানো হবে মন্দির পার্শ্বস্থ অংশে।
এই নৃশংস এবং অমানবিক প্রথা ঊনবিংশ শতকেই বন্ধ করে দেন স্বয়ং রাজা ও রানি। কিন্তু সারাহানের জনশ্রুতি হল, তারপরও যখনই চার পাঁচটি গ্রামে কোনও অসুখ মহামারীর রূপ নিয়েছে, অপদেবতার আগ্রাসন ঘটেছে, তখনই গোপনে মধ্যরাতে এই নির্মম প্রথা পালিত হয়েছে। অতএব সারাহানের মানুষের নিশ্চিত বিশ্বাস, এই আত্মাদের মুক্তি হয়নি। তারা ঘুরছে আজও।
সন্ধ্যারতি শেষ। প্রসাদ গ্রহণ শেষ। সারাহান নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ক্রমেই নির্জন জনপদ আর মন্দিরে আছড়ে পড়ে বাতাস। যা স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা অগণিত দীর্ঘশ্বাস। আর তাই কিছুকাল আগে পর্যন্তও কখনওই অপ্রয়োজনে মন্দির প্রাঙ্গণে যাতায়াত করেনি কেউ। সারাহানবাসী আজও করে না। যারা আত্মবলিদান দিয়েছে, মধ্যরাত তাদের জন্য। ব্ল্যাকস্টোনের দ্বারপাল মূর্তি রয়েছে মন্দিরের প্রবেশদ্বারে। তাকে সাক্ষী রেখে বিদেহী আত্মারা কি নেমে আসে ভীমকালী মন্দিরের দ্বারপ্রান্তে? আজও রহস্যময় ভীমকালী মন্দির।
চৌষট্টি যোগিনী মন্দির, চম্বল
বটেশ্বর গ্রামের হিম্মত সিং চৌহান বললেন, ওই মন্দিরে তো সন্ধ্যার পর যাওয়া যায় না!
কেন?
রাতে ওখানে যোগিনী দেবীরা নেমে আসেন। মহাদেবের সামনে নৃত্য করেন তাঁরা।
এসব কে বলল?
কেন, আমিও ছেলেবেলায় দেখেছি একবার নীল আলো জ্বলছে মন্দিরের ভিতরে। আর চম্বল জুড়ে সবাই জানে যে সত্তরশা মন্দিরে সন্ধ্যার পর ঢোকা মানেই আর ফেরা সম্ভব নয়।
বটেশ্বর তো অনেক পুরনো এক শিক্ষিত সচেতন গ্রাম। আপনারাই এরকম সংস্কার মান্য করেন। আপনাদের গ্রাম থেকে স্বয়ং অটলবিহারী বাজপেয়ীর মতো নেতা উঠে এসেছেন। আপনাদের গ্রামে হয়েছিল ভারত ছাড়ো আন্দোলন। আর আজও আপনারা একটি প্রায় পরিত্যক্ত এবং নিছক পুরাতাত্ত্বিক মন্দিরকে এরকম লোককথায় মুড়ে রেখে ভয়ের কাহিনিতে আরও প্রশ্রয় দিচ্ছেন!
গোয়ালিয়র থেকে মোরেনা। চম্বলের প্রবেশদ্বার। মোরেনা ব্লকের হাইওয়ের পিছনে কমিউনিটি হলে ছিল পিছড়ে বর্গ কল্যাণ সম্মেলন। দূরদূরান্ত থেকে এসেছে প্রতিনিধিরা।
৪৭ ডিগ্রির গরমে হিম্মত সিং চৌহান শ্বাস ফেলে বলেছিলেন, যোগিনী পুজো আর তার আচারবিচার নিয়ে আপনার কোনও ধারণা আছে? এটা কি আপনারা ছেলেখেলা মনে করেন? এটা একটা তন্ত্র। একটা থিওরি। এখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাস, লৌকিক-অলৌকিক বলে কিছু হয় না। তন্ত্রসাধনার জগতে প্রবেশ করতে হলে, এই মন্দিরের ধুলোয় না বসলে, বাতাসে ধ্যান না করলে এবং চৌষট্টি যোগিনীর আশীর্বাদ নিয়ে মহাদেবীকে সন্তুষ্ট না করলে তন্ত্রশিক্ষা অধরা থেকে যায়।
মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকে মোরেনা হয়ে মিতাওয়ালি গ্রাম। মোরেনা থেকে ৩৫ কিলোমিটার। চম্বল নদীকে বাঁদিকে রেখে ধূ ধূ প্রান্তর। গোটা দেশে চারটি মন্দির রয়েছে যার নাম চৌষট্টি যোগিনী মন্দির। সবথেকে নির্জন এবং জনহীন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরই হল এই মিতাওয়ালি গ্রাম সংলগ্ন চৌষট্টি যোগিনী মন্দির। ধরা যাক, মন্দিরের ঠিক উপরে একটি হেলিকপ্টার উড়ছে। অথবা বিমান। উপর থেকে দেখা যাচ্ছে একটি কাঠামো। এটা মধ্যপ্রদেশ। দিল্লি নয়। কিন্তু আকাশ থেকে দেখলে বিভ্রম হবে এ কী? এটা কি দিল্লি? ওই তো পুরনো পার্লামেন্ট বিল্ডিং!
অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার হল, দিল্লির কেন্দ্রস্থলে যে পুরনো পার্লামেন্ট বিল্ডিং এর সেই গোলাকৃতি এবং স্তম্ভবেষ্টিত কাঠামো কীভাবে এল এই জনহীন চম্বলে? অথচ ১৯৩২ সালে সংসদ ভবনের কাজ সমাপ্ত হয়। আর এই চৌষট্টি যোগিনী মন্দির স্থাপিত হয়েছিল রাজা দেবপালের আমলে। কচ্ছপাঘাটা রাজবংশের দেবপাল যে মন্দির নির্মাণ করেন সেকথা গ্রোথিত রয়েছে মন্দিরের অভ্যন্তরে। ১৩২৩ সালে প্রোথিত হয় ওই স্তম্ভ। তাহলে কি নতুন দিল্লির প্রধান স্থপতি এডউইন লুটিয়েন্স এবং হার্বাট বেকার সেই দিল্লি থেকে এই চম্বলের প্রত্যন্ত গ্রামে এসে দেখে গিয়েছিলেন এই যোগিনী মন্দির? তাঁরা নিজেরা কখনও একথা জানাননি। কিন্তু এটা ঠিক যে, ১৯২৭ সালে ভারতের পার্লামেন্ট ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁরা ভারত সফরে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু মধ্যপ্রদেশের চম্বলে এসে এই মন্দির দেখে অবিকল এই মন্দিরের আদলেই সংসদ ভবনের পরিকল্পনা করলেন, এরকম প্রমাণই নেই। যদিও মধ্যপ্রদেশ সরকারের নথিতে জানা যায়, ১৩০০ সাল থেকে এই চৌষট্টি যোগিনী মন্দির অন্তত পাঁচবার বড়সড় ভূমিকম্প দেখেছে। কারণ প্রমাণিত তথ্য বলছে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি ভূমিকম্পে ধুলিসাৎ হয়। কিন্তু ভূমিকম্প এই মন্দিরকে স্পর্শ করেনি। সেটা কি এই অদ্ভুত আকারের জন্য? সেই কারণেই কি এই মন্দিরের আদলেই নির্মাণ করা হয় ভারতের পার্লামেন্ট? এই হুবহু সাদৃশ্যের কারণ কী? সম্ভবত সরেজমিন পরিদর্শনে না এলেও ওই দুই স্থপতি ছবি দেখেছিলেন। যদিও তার প্রামাণ্য তথ্য নেই।
চৌষট্টি যোগিনী কেন? এই কাহিনি সর্বজনবিদিত। রক্তবীজের সঙ্গে যুদ্ধে দেবী দুর্গা চৌষট্টি যোগিনী বাহিনীকে সৃষ্টি করেছিলেন। কারণ রক্তবীজের প্রতিটি রক্তবিন্দু থেকে আবার জন্ম হবে নতুন নতুন রক্তবীজের। অতএব সেই প্রতিটি রক্তবিন্দুকে জিহ্বা দিয়ে পান করবেন ওই চৌষট্টি যোগিনী বাহিনী। যাতে এক ফোঁটা রক্তও না পড়তে পারে মাটিতে।
চৌষট্টি যোগিনী। আর তাই মন্দিরে ৬৪টি ঘর। বাইরে একশো স্তম্ভ। প্রায় দেড়শো সিঁড়ি উঠে প্রবেশদ্বারে পৌঁছানো। চারদিকে প্রান্তর। মাঝখানে একটি টিলা। কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে বিস্ময়কর দৃশ্য। প্রাচীর এবং বাইরের ওই ১০০ স্তম্ভের কাঠামো পেরিয়ে অন্দরমহলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সামনে হুবহু একইরকম গোলাকৃতি এক কাঠামো। এখানেও সেই স্তম্ভঘেরা বৃত্তাকার এক চেম্বার। অর্থাৎ একটি বৃহৎ সংসদ ভবন। তার মধ্যে আর একটি ক্ষুদ্র সংসদ ভবন। এই হল মন্দির।
মন্দিরের তো একটি চূড়া থাকবে। এরকম বৃত্তাকার মন্দির কেন? যা বৌদ্ধস্তূপকে মনে করিয়ে দেয়? যোগিনী মূর্তি প্রায় সবই উধাও। হয় চুরি হয়ে গিয়েছে। অথবা কোনও কারণে মিশে গিয়েছে মাটিতে। মহাদেবের তন্ত্রসিদ্ধ যোগিনীদের ঘরে তারা নেই। রয়েছে বেশ কিছু শিবলিঙ্গ। জানা গেল এই হল উচ্ছিষ্ট লিঙ্গ। অর্থাৎ যে লিঙ্গে নেই গৌরীপট। যে শিবলিঙ্গকে আদিলিঙ্গের নামকরণ করা হয়।
চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরে কী হতো অতীতে? তন্ত্রসাধনা। ভারতের অন্যতম বিখ্যাত ও জনপ্রিয় তন্ত্রশিক্ষা এবং জ্যোতিষবিদ্যার শিক্ষাকেন্দ্র ছিল
এই সত্তরশা মহাদেব তথা চৌষট্টি যোগিনী মন্দির। বস্তুত এই ছিল তন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়।
মহাদেবী ছিলেন। মহাদুর্গা। আজ নেই। মহাদেবী এবং যোগিনীরা রয়েছে মধ্যপ্রদেশের জাদুঘরে। সুরক্ষিত। তন্ত্রশিক্ষার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এবং উপচার কী ছিল? কলসলিঙ্গ। কলসীর মতো দেখতে একটি আধার। তারই মধ্যে প্রোথিত লিঙ্গ। কলসীকে গর্ভাধারের সঙ্গে তুলনা করা হয় প্রাচীন শাস্ত্রে। ব্যাসল্ট আর গ্রানাইট পাথরের প্রাঙ্গণে রয়েছে পাথরে তৈরি পায়ের ছাপ! কার? কেউ জানে না। শোনা যায় এই হল বিষ্ণুর পাদপদ্ম!
মহাদেবী শক্তির মূর্তি না থাকলেও এই সেই মন্দির যেখানে গোটা ভারতের তীর্থ, আশ্রম এবং গোপন তন্ত্রসাধনার কেন্দ্রগুলি থেকে সবথেকে বেশি আসে তন্ত্রশিক্ষায় আগ্রহীরা। কোনও নির্দিষ্ট উৎসব নেই। নেই ভিড়। নেই গণ উন্মাদনা। এই মন্দির নির্জন সাধনার মহাপীঠ। মিতাওয়ালির চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরে প্রবেশ করার পর প্রতিটি যোগিনী স্থল এবং লিঙ্গের সামনে নির্দিষ্ট রীতির ধ্যান এবং পুজো করতে হয়। যা একমাত্র তন্ত্রসাধকদের জানা রয়েছে। কেন এই মাহাত্ম্য? কারণ ভারতীয় তন্ত্রসাধনায় সর্বোত্তম শিক্ষক হল যোগিনীতত্ত্ব। যোগিনীদের প্রকৃত অধিকার ছিল সিদ্ধা তান্ত্রিকের শিক্ষাদান। আজও অলৌকিক শক্তির সর্বোচ্চ স্তরে আরোহণ করতে পারেন একমাত্র যোগিনীতন্ত্র। এমনকী মনুষ্যরূপ ছেড়ে যে কোনও মুহূর্তে তাঁরা ধারণ করতে সিদ্ধহস্ত পশুপাখির রূপও। কামাখ্যা থেকে মহাকালেশ্বর। মহাদর্শনের পর চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরে কলসলিঙ্গ স্পর্শ করে মহাদেবীর আহ্বান ধ্যানে ব্রতী হওয়া। এক অলৌকিক অনুভবের সঞ্চার হয় একথা শোনা যায় তন্ত্রসাধকদের মুখেই। আড়ম্বরহীন এই সাধনার ভরকেন্দ্র চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরে দিনের আলোয় ছাড়া প্রবেশ ও থাকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। থাকলে কী হবে? একাধিকবার মানুষ হারিয়ে গিয়েছে। নিকটবর্তী গ্রামবাসীদের অনুমান, তারা গোপনে থেকে গিয়েছিল মন্দিরে। সন্ধ্যার পর। তারপর আর খোঁজ মেলেনি। কতটা সত্যি? বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দোলাচলে যেতে চায় না চম্বল। স্থানীয় মানুষ তন্ত্রমন্ত্র জানে না। তারা জানে বছরের বিশেষ কয়েকটি দিনে হঠাৎ করে শোনা যায় নৃত্যের ঝঙ্কার। দেখা যায় মধ্যরাতে আলোকশিখা। এমনকী দিবালোকে জ্বালিয়ে আসা প্রদীপ ২৪ ঘণ্টাতেও প্রজ্বলিত থেকেছে, এরকম ঘটনাও জনশ্রুতিতে প্রচলিত। প্রতিটি ফসল আসার আগে শস্যবীজ রেখে আসে কৃষিজীবী বিশ্বাসী। কেন? মহাদেবী আবির্ভূত হয়ে সেই শস্য গ্রহণ করেন। যোগিনী মন্দিরের মহাদেবী তাই অদৃশ্য অন্নপূর্ণারূপেও পূজিতা হন! কে না জানে, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ঈশ্বরের আশীর্বাদ হল অন্নসংস্থান!
ভীমকালী মন্দির
হিমাচল প্রদেশ
পৌঁছতে কি সন্ধ্যা হয়ে গেল? কানে আসছে না কোনও ঘণ্টাধ্বনি? বাতাসে মিশে নেই উগ্র ধূপের সুবাস? তাহলে এখনও সারাহান আসেনি? কারণ সারাহানে প্রবেশ করা হলে এই মাহেন্দ্রক্ষণে এতক্ষণে নিশ্চিত কানে আসবে ঘণ্টা আর কাঁসরের মিলিত ধ্বনি। যা প্রতিধ্বনিত হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে পাহাড় আর অরণ্যের নিস্তব্ধ রহস্যময়তায়। উৎস কী ওই ধ্বনি এবং প্রতিধ্বনির? সারাহানে প্রবেশের পর ক্ষুদ্র নির্জন একাকী জনপদের কেন্দ্রস্থলের প্যাগোডা আকৃতির ওই মন্দিরই হল সারাহান, বুশাহর রানওয়ানের মতো গ্রামগুলির আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় চালিকাশক্তি। ভীমকালী মন্দির। দেবী দুর্গার আদিরূপ আদিশক্তির প্রকাশের স্থানই কি ছিল এই পাহাড় আর অরণ্যবেষ্টিত হিমাচলের প্রান্তিক এক পার্বত্য উপত্যকায়? হিমাচলপ্রদেশ তো বটেই, উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন গাড়োয়ালের পাহাড়ি সভ্যতায় এরকমই বিশ্বাস। সিমলা থেকে ১৮৪ কিলোমিটার দূরের সারাহানে এক চিরন্তন রহস্য নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভীমকালী মন্দির!
প্রথমেই কেন ঘণ্টাধ্বনির প্রসঙ্গ উত্থাপন? কারণ ভীমকালী মন্দিরের সন্ধ্যারতির শব্দ সারাহানের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে যায়। আর জনশ্রুতি হল, মন্দিরে আরতি হচ্ছে, অথচ মন্দির থেকে অনেকটা দূরে থাকলেও কেউ সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছে না, তাহলে সেটি এক বিপজ্জনক পূর্বাভাস। সেই মানুষটির মধ্যে অপদেবতা ভর করেছে। অথবা সে অসুস্থ হবে। শীঘ্রই। অতএব দিতে হবে পুজো। শ্রবণশক্তির ইন্দ্রিয়ই তো ভীমকালীর সর্বোচ্চ আশীর্বাদ। এই বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে মিশে থাকা উৎকৃষ্ট অংশ যেন কর্ণকুহরে প্রবেশ করে। সন্ধ্যারতির মাধুর্য চিরকাল থেকে যাবে কানের মাধ্যমে অন্তরে। অর্থাৎ মাতা ভীমকালীর বরাভয় প্রতিষ্ঠিত হল হৃদয়ে। এই শ্রবণের মাহাত্ম্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ সতীর দেহত্যাগের পর বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র তাঁর শরীরকে খণ্ডবিখণ্ড করে যেভাবে ছড়িয়ে দিয়েছিল ভারতবর্ষ জুড়ে, সেই পুরাণকথার বিশ্বাস এখানেই পড়েছিল দেবীমাতার কান। আর তাই পাঁচতলা ভীমকালী মন্দিরে প্রবেশ করে দেবীমূর্তিকে প্রথাগতভাবে প্রণাম করলেই হল না। দেবীর গর্ভগৃহের দেওয়ালকে মনে করতে হবে দেবীর কান। অতএব মনস্কামনা, মানত, দুঃখ, সুখ এবং কামনা বাসনার কথা দেবীকে জানাতে হবে কানে কানে। দেওয়ালে মুখ রেখে। ঠিক যেভাবে হিন্দুধর্মের আচারে দেখা যায় যে কোনও শিবমন্দিরে নন্দী থাকলে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে পুণ্যার্থীরা মনস্কামনা ব্যক্ত করছে।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এখনও যেন প্রকৃতি সুস্থিতি হননি এখানে। তাই ভূমি দুলে ওঠে যখন তখন। ভয় পায় না জনপদবাসী। কারণ ভীমকালী মাতা আছেন। ১৯০৫ সালের ভূমিকম্পে প্রাচীন মন্দিরের কাঠের কাঠামো সম্পূর্ণ উপড়ে গিয়ে ডানদিকে হেলে যায়। সামান্য কিছু ঘর গ্রামবাসীই ছিল সেই সময়। তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। স্বয়ং মাতার মন্দির যদি ভাঙনকালের ইঙ্গিত দেয় তাহলে তো সারাহান বুশাহর ধ্বংস হয়ে যাবে! সেই ভাবনার মধ্যেই আবার ভূমিকম্প। গ্রামবাসী দেখতে পেল একটি ভূমিকম্পে মন্দির কাঠামোর ঠিক যেটুকু স্থানবিচ্যুতি ঘটেছিল, পরবর্তী ভূমিকম্পে অবিকল পূর্বাবস্থায় ফিরে গিয়েছে মন্দির। অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় আফটারশক-এ ফিরে এসেছে মন্দিরের পূর্বাবস্থা।
মিথ আর পুরাণ ঘিরে থাকে ভারতের প্রতিটি মন্দিরেই। ভীমকালীর মিথ কী? একাধিক। প্রথমত বনাসুর অত্যাচার চালাচ্ছে ঋষি ও দেবতাদের উপর। অতঃপর দেবতারা শরণাগত বিষ্ণুর কাছে। তিনি শ্বাস থেকে নির্মাণ করলেন অগ্নিশিখা। আর সেই অগ্নির ধুম্র থেকে আত্মপ্রকাশ করলেন আদিশক্তি। দেবতারা তাঁকে দিলেন অস্ত্র ও উপকরণ। কুবের থেকে বরুণ। কেউ মুকুট, কেউ চক্র। কেউ পোশাক। কেউ গোলাপ। আর এই আদিশক্তিই দেবী দুর্গা। তাই প্রাত্যহিক পুজোয় অন্যতম মন্ত্রোচ্চারণ দুর্গা সপ্তশতী।
দ্বিতীয় মিথে মিশে আছেন কৃষ্ণ। দুই মিথেই বোঝা গেল সারাহন বুশাহরের প্রকৃত শাসক ছিলেন সেই বনাসুরই। তাঁর কন্যা ঊষা স্বপ্নে এক আশ্চর্য সুন্দর পুরুষকে দেখতে পেয়ে হাত বাড়ায়। কিন্তু সেই পুরুষ হঠাৎ মিলিয়ে যায়। তাকে ছোঁয়া গেল না। ঊষার একান্ত প্রিয় সখী চিত্রলেখা স্বপ্নের কথা শুনে বলল, কেমন দেখতে সেটা মনে আছে? ঊষা বলল, হুবহু। চোখের সামনে যেন ভাসছে। চিত্রলেখা বলল, তাহলে আমাকে বল। ঊষার বর্ণনায় চিত্রলেখা অবিকল সেই সুন্দর পুরুষের ছবি এঁকে ফেলল। আর ঊষা বলল, হ্যাঁ, এই সেই পুরুষ। কিন্তু উপায় কী? কোথায় পাওয়া যাবে? চিত্রলেখা বলল, আমি বেরব তোমার জন্য। দেখা যাক পাই কি না। চিত্রলেখা দিন, মাস বছর ঘুরে এক নগরীতে জানতে পারল সেই পুরুষের অবস্থান। যখন সে ঘুমাচ্ছে। ঘুম না ভাঙিয়ে নিয়ে এল সেই পুরুষকে সঙ্গে করে। ঊষার কাছে। এবং ঘুম ভেঙে পুরুষ হতবাক। এসব কী? এরা কারা? ইনি ঊষা। আপনি এসেছিলেন স্বপ্নে। বলল, চিত্রলেখা।
হঠাৎ দ্বারকানরেশ শ্রীকৃষ্ণ এই সামান্য রাজ্য আক্রমণ করছেন কেন? বনাসুর তো বুঝতেই পারছেন না। তিনি পারবেন কেন যুদ্ধে? অতএব শ্রীকৃষ্ণ পরাস্ত করলেন। গোটা রাজ্য দখল করলেন কৃষ্ণ। কিন্তু অপরাধটা তো বোঝা গেল না? বনাসুর জানতে চাইলেন। শ্রীকৃষ্ণ জানালেন, আমার পুত্রকে অপহরণ? স্পর্ধা কতটা? বনাসুর অবশেষে জানতে পারলেন তাঁর কন্যা আর তার সখীর কাণ্ড। তাঁর ঘরেই যে কৃষ্ণপুত্র অনিরুদ্ধ বসে আছে সেকথা বনাসুরের জানাই ছিল না। তিনি সেকথা জানাতে এবার কৃষ্ণ বুঝলেন সত্যিই তো এই শাসকের দোষ নেই। তিনি নিজেই বিবাহ দিলেন ঊষা আর অনিরুদ্ধের। আর ফিরিয়ে দিলেন রাজ্য। যার নাম শোণিতপুর।
এই দুই মিথের মধ্যে যে দুই কাহিনি মিশে রয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে একটি কাহিনিতে শ্রীকৃষ্ণ বনাসুরের কন্যার সঙ্গে নিজের পুত্রের বিবাহ দিলেন। আবার অন্য কাহিনি বলছে, সেই বনাসুরকেই হত্যা করার জন্য বিষ্ণু নির্মাণ করেছিলেন আদিশক্তির!
আসলে কি যুদ্ধ হয়েছিল? হ্যাঁ। একটি যুদ্ধ হয়েছিল পাহাড়ি রাজ্য কুলুর সঙ্গে বুশাহরের। ঊনবিংশ শতকে। কুলুর সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দেন বুশহরের রাজার বাহিনী। কুলুর রাজা প্রাণ হারান। এবং জয়ের স্মারক হিসেবে তাঁর ছিন্নমস্তক নিয়ে আসা হয় সারাহানে। ভীমকালী মন্দিরের সামনে। তুলে নিয়ে আসা হয় কুলু রাজবংশের গৃহদেবতাকে। শ্রীরঘুনাথ। কুলুর পরাজিত প্রতিনিধিরা বুশাহর রাজার কাছে আবেদন করলেন, আমাদের রাজার ছিন্নমস্তক ফিরিয়ে না দিলে তাঁর আত্মার শান্তি হবে না। আমাদের নিজস্ব রীতির সৎকার ও অন্ত্যেষ্টি না করলে পরবর্তী বংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। মহারাজা রাজি হলেন। ফিরিয়ে দেওয়া হল পরাজিত রাজার ছিন্নশির। কিন্তু রঘুনাথ মূর্তি ফিরিয়ে দেওয়া হবে না। স্থাপিত হবে এখানেই। কুলুবাসীরা ভগ্নমনোরথে মেনে নিলেন। তবে জানালেন, রঘুনাথ আপনাদের কাছে রইলেন। তাই আপনাদের কিন্তু দশেরার উৎসব করতে হবে। বুশাহর রাজা সম্মতি দিলেন। সারাহানে তাই দশেরা উৎসব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মনস্কামনা পূরণের পর ওই সময় সীমায় শ্রদ্ধার্ঘ্য দিতে হবে ভীমকালীকে।
মনস্কামনা পূরণ হলেই কি ভক্তের সমর্পিত প্রাণের পূর্ণাঙ্গ নিবেদন সমাপ্ত হয়ে গেল? না। নবরাত্রি উৎসবে আসতে হবে। দিতে হবে উৎসর্গ। কী উৎসর্গ? পশু অথবা প্রতীকী কিছু। সিংহভাগ ক্ষেত্রেই আধুনিক সময়ে হয়ে দাঁড়িয়ে মুরগি কিংবা পাঁঠা। এই প্রথার পিছনে হেঁটে গেলে কী পাওয়া যাবে? পাওয়া যাবে এক স্তব্ধ করে দেওয়া প্রাচীন প্রথা। যা মাত্র একশো বছর আগেও ছিল। এবং সারাহানের বৃদ্ধ পুরোহিতরা জনান্তিকে বলবেন, আধুনিক কালেও ঘটেছে সেই প্রথার প্রকাশ! নরবলি!
মন্দিরের একপ্রান্তে থাকা ওই যে কুয়ো। আর পিছনে থাকা গাছ। প্রতি বছর নির্দিষ্ট তিথি ধার্য করা হতো। আর গ্রাম অথবা গ্রামের বাইরের কোনও পরিবারের এক সদস্যকে মনোনীত করা হতো। যদিও জনমনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যে, একমাত্র নিজে রাজি হলেই দেবীর চরণে আত্মবলিদান দেওয়া যায়। জোর করে নয়। কিন্তু সারাহানের প্রাচীন মানুষের বক্তব্য, কতজন আর নিজের জীবন স্বেচ্ছায় দান করে? অতএব অবশ্যই জোর করেই এই প্রথা চালানো হতো। যাকে মনোনীত করা হতো বলির জন্য, ৬ মাস ধরে সে থাকবে গর্ভগৃহের নীচে বন্দি। যা প্রাণ চাইবে সে তাই পাবে খেতে। কিন্তু একটি শক্ত দড়ি তৈরি করবে সে এই ৬ মাসে। ঠিক যেদিন দড়ি তৈরি নিখুঁতভাবে সমাপ্ত হবে, তার সাতদিনের মধ্যে হবে বলিদান!
সেই দড়ির একটি প্রান্ত বাঁধা হবে কুয়োর কাছে। যে স্থানের নাম লঙ্কা বীর। আর অন্য প্রান্ত গাছে। দড়ির দুই দিকে পা দিয়ে হাত-পা বেঁধে গাছের দিক থেকে কুয়োর দিকে সামান্য হেলে যাওয়া দড়ি ধরে ঠেলে দেওয়া হবে তাকে। আর কুয়োর কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে বলিদান! ফিনকি দিয়ে উঠবে রক্ত। বিশুদ্ধ হবে শোণিতপুর। সারাহানের যে নাম ছিল অতীতে! রক্তপুর।
আর সেই রক্ত ছড়ানো হবে মন্দির পার্শ্বস্থ অংশে।
এই নৃশংস এবং অমানবিক প্রথা ঊনবিংশ শতকেই বন্ধ করে দেন স্বয়ং রাজা ও রানি। কিন্তু সারাহানের জনশ্রুতি হল, তারপরও যখনই চার পাঁচটি গ্রামে কোনও অসুখ মহামারীর রূপ নিয়েছে, অপদেবতার আগ্রাসন ঘটেছে, তখনই গোপনে মধ্যরাতে এই নির্মম প্রথা পালিত হয়েছে। অতএব সারাহানের মানুষের নিশ্চিত বিশ্বাস, এই আত্মাদের মুক্তি হয়নি। তারা ঘুরছে আজও।
সন্ধ্যারতি শেষ। প্রসাদ গ্রহণ শেষ। সারাহান নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ক্রমেই নির্জন জনপদ আর মন্দিরে আছড়ে পড়ে বাতাস। যা স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা অগণিত দীর্ঘশ্বাস। আর তাই কিছুকাল আগে পর্যন্তও কখনওই অপ্রয়োজনে মন্দির প্রাঙ্গণে যাতায়াত করেনি কেউ। সারাহানবাসী আজও করে না। যারা আত্মবলিদান দিয়েছে, মধ্যরাত তাদের জন্য। ব্ল্যাকস্টোনের দ্বারপাল মূর্তি রয়েছে মন্দিরের প্রবেশদ্বারে। তাকে সাক্ষী রেখে বিদেহী আত্মারা কি নেমে আসে ভীমকালী মন্দিরের দ্বারপ্রান্তে? আজও রহস্যময় ভীমকালী মন্দির।
চৌষট্টি যোগিনী মন্দির, চম্বল
বটেশ্বর গ্রামের হিম্মত সিং চৌহান বললেন, ওই মন্দিরে তো সন্ধ্যার পর যাওয়া যায় না!
কেন?
রাতে ওখানে যোগিনী দেবীরা নেমে আসেন। মহাদেবের সামনে নৃত্য করেন তাঁরা।
এসব কে বলল?
কেন, আমিও ছেলেবেলায় দেখেছি একবার নীল আলো জ্বলছে মন্দিরের ভিতরে। আর চম্বল জুড়ে সবাই জানে যে সত্তরশা মন্দিরে সন্ধ্যার পর ঢোকা মানেই আর ফেরা সম্ভব নয়।
বটেশ্বর তো অনেক পুরনো এক শিক্ষিত সচেতন গ্রাম। আপনারাই এরকম সংস্কার মান্য করেন। আপনাদের গ্রাম থেকে স্বয়ং অটলবিহারী বাজপেয়ীর মতো নেতা উঠে এসেছেন। আপনাদের গ্রামে হয়েছিল ভারত ছাড়ো আন্দোলন। আর আজও আপনারা একটি প্রায় পরিত্যক্ত এবং নিছক পুরাতাত্ত্বিক মন্দিরকে এরকম লোককথায় মুড়ে রেখে ভয়ের কাহিনিতে আরও প্রশ্রয় দিচ্ছেন!
গোয়ালিয়র থেকে মোরেনা। চম্বলের প্রবেশদ্বার। মোরেনা ব্লকের হাইওয়ের পিছনে কমিউনিটি হলে ছিল পিছড়ে বর্গ কল্যাণ সম্মেলন। দূরদূরান্ত থেকে এসেছে প্রতিনিধিরা।
৪৭ ডিগ্রির গরমে হিম্মত সিং চৌহান শ্বাস ফেলে বলেছিলেন, যোগিনী পুজো আর তার আচারবিচার নিয়ে আপনার কোনও ধারণা আছে? এটা কি আপনারা ছেলেখেলা মনে করেন? এটা একটা তন্ত্র। একটা থিওরি। এখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাস, লৌকিক-অলৌকিক বলে কিছু হয় না। তন্ত্রসাধনার জগতে প্রবেশ করতে হলে, এই মন্দিরের ধুলোয় না বসলে, বাতাসে ধ্যান না করলে এবং চৌষট্টি যোগিনীর আশীর্বাদ নিয়ে মহাদেবীকে সন্তুষ্ট না করলে তন্ত্রশিক্ষা অধরা থেকে যায়।
মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকে মোরেনা হয়ে মিতাওয়ালি গ্রাম। মোরেনা থেকে ৩৫ কিলোমিটার। চম্বল নদীকে বাঁদিকে রেখে ধূ ধূ প্রান্তর। গোটা দেশে চারটি মন্দির রয়েছে যার নাম চৌষট্টি যোগিনী মন্দির। সবথেকে নির্জন এবং জনহীন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরই হল এই মিতাওয়ালি গ্রাম সংলগ্ন চৌষট্টি যোগিনী মন্দির। ধরা যাক, মন্দিরের ঠিক উপরে একটি হেলিকপ্টার উড়ছে। অথবা বিমান। উপর থেকে দেখা যাচ্ছে একটি কাঠামো। এটা মধ্যপ্রদেশ। দিল্লি নয়। কিন্তু আকাশ থেকে দেখলে বিভ্রম হবে এ কী? এটা কি দিল্লি? ওই তো পুরনো পার্লামেন্ট বিল্ডিং!
অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার হল, দিল্লির কেন্দ্রস্থলে যে পুরনো পার্লামেন্ট বিল্ডিং এর সেই গোলাকৃতি এবং স্তম্ভবেষ্টিত কাঠামো কীভাবে এল এই জনহীন চম্বলে? অথচ ১৯৩২ সালে সংসদ ভবনের কাজ সমাপ্ত হয়। আর এই চৌষট্টি যোগিনী মন্দির স্থাপিত হয়েছিল রাজা দেবপালের আমলে। কচ্ছপাঘাটা রাজবংশের দেবপাল যে মন্দির নির্মাণ করেন সেকথা গ্রোথিত রয়েছে মন্দিরের অভ্যন্তরে। ১৩২৩ সালে প্রোথিত হয় ওই স্তম্ভ। তাহলে কি নতুন দিল্লির প্রধান স্থপতি এডউইন লুটিয়েন্স এবং হার্বাট বেকার সেই দিল্লি থেকে এই চম্বলের প্রত্যন্ত গ্রামে এসে দেখে গিয়েছিলেন এই যোগিনী মন্দির? তাঁরা নিজেরা কখনও একথা জানাননি। কিন্তু এটা ঠিক যে, ১৯২৭ সালে ভারতের পার্লামেন্ট ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁরা ভারত সফরে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু মধ্যপ্রদেশের চম্বলে এসে এই মন্দির দেখে অবিকল এই মন্দিরের আদলেই সংসদ ভবনের পরিকল্পনা করলেন, এরকম প্রমাণই নেই। যদিও মধ্যপ্রদেশ সরকারের নথিতে জানা যায়, ১৩০০ সাল থেকে এই চৌষট্টি যোগিনী মন্দির অন্তত পাঁচবার বড়সড় ভূমিকম্প দেখেছে। কারণ প্রমাণিত তথ্য বলছে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি ভূমিকম্পে ধুলিসাৎ হয়। কিন্তু ভূমিকম্প এই মন্দিরকে স্পর্শ করেনি। সেটা কি এই অদ্ভুত আকারের জন্য? সেই কারণেই কি এই মন্দিরের আদলেই নির্মাণ করা হয় ভারতের পার্লামেন্ট? এই হুবহু সাদৃশ্যের কারণ কী? সম্ভবত সরেজমিন পরিদর্শনে না এলেও ওই দুই স্থপতি ছবি দেখেছিলেন। যদিও তার প্রামাণ্য তথ্য নেই।
চৌষট্টি যোগিনী কেন? এই কাহিনি সর্বজনবিদিত। রক্তবীজের সঙ্গে যুদ্ধে দেবী দুর্গা চৌষট্টি যোগিনী বাহিনীকে সৃষ্টি করেছিলেন। কারণ রক্তবীজের প্রতিটি রক্তবিন্দু থেকে আবার জন্ম হবে নতুন নতুন রক্তবীজের। অতএব সেই প্রতিটি রক্তবিন্দুকে জিহ্বা দিয়ে পান করবেন ওই চৌষট্টি যোগিনী বাহিনী। যাতে এক ফোঁটা রক্তও না পড়তে পারে মাটিতে।
চৌষট্টি যোগিনী। আর তাই মন্দিরে ৬৪টি ঘর। বাইরে একশো স্তম্ভ। প্রায় দেড়শো সিঁড়ি উঠে প্রবেশদ্বারে পৌঁছানো। চারদিকে প্রান্তর। মাঝখানে একটি টিলা। কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে বিস্ময়কর দৃশ্য। প্রাচীর এবং বাইরের ওই ১০০ স্তম্ভের কাঠামো পেরিয়ে অন্দরমহলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সামনে হুবহু একইরকম গোলাকৃতি এক কাঠামো। এখানেও সেই স্তম্ভঘেরা বৃত্তাকার এক চেম্বার। অর্থাৎ একটি বৃহৎ সংসদ ভবন। তার মধ্যে আর একটি ক্ষুদ্র সংসদ ভবন। এই হল মন্দির।
মন্দিরের তো একটি চূড়া থাকবে। এরকম বৃত্তাকার মন্দির কেন? যা বৌদ্ধস্তূপকে মনে করিয়ে দেয়? যোগিনী মূর্তি প্রায় সবই উধাও। হয় চুরি হয়ে গিয়েছে। অথবা কোনও কারণে মিশে গিয়েছে মাটিতে। মহাদেবের তন্ত্রসিদ্ধ যোগিনীদের ঘরে তারা নেই। রয়েছে বেশ কিছু শিবলিঙ্গ। জানা গেল এই হল উচ্ছিষ্ট লিঙ্গ। অর্থাৎ যে লিঙ্গে নেই গৌরীপট। যে শিবলিঙ্গকে আদিলিঙ্গের নামকরণ করা হয়।
চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরে কী হতো অতীতে? তন্ত্রসাধনা। ভারতের অন্যতম বিখ্যাত ও জনপ্রিয় তন্ত্রশিক্ষা এবং জ্যোতিষবিদ্যার শিক্ষাকেন্দ্র ছিল
এই সত্তরশা মহাদেব তথা চৌষট্টি যোগিনী মন্দির। বস্তুত এই ছিল তন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়।
মহাদেবী ছিলেন। মহাদুর্গা। আজ নেই। মহাদেবী এবং যোগিনীরা রয়েছে মধ্যপ্রদেশের জাদুঘরে। সুরক্ষিত। তন্ত্রশিক্ষার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এবং উপচার কী ছিল? কলসলিঙ্গ। কলসীর মতো দেখতে একটি আধার। তারই মধ্যে প্রোথিত লিঙ্গ। কলসীকে গর্ভাধারের সঙ্গে তুলনা করা হয় প্রাচীন শাস্ত্রে। ব্যাসল্ট আর গ্রানাইট পাথরের প্রাঙ্গণে রয়েছে পাথরে তৈরি পায়ের ছাপ! কার? কেউ জানে না। শোনা যায় এই হল বিষ্ণুর পাদপদ্ম!
মহাদেবী শক্তির মূর্তি না থাকলেও এই সেই মন্দির যেখানে গোটা ভারতের তীর্থ, আশ্রম এবং গোপন তন্ত্রসাধনার কেন্দ্রগুলি থেকে সবথেকে বেশি আসে তন্ত্রশিক্ষায় আগ্রহীরা। কোনও নির্দিষ্ট উৎসব নেই। নেই ভিড়। নেই গণ উন্মাদনা। এই মন্দির নির্জন সাধনার মহাপীঠ। মিতাওয়ালির চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরে প্রবেশ করার পর প্রতিটি যোগিনী স্থল এবং লিঙ্গের সামনে নির্দিষ্ট রীতির ধ্যান এবং পুজো করতে হয়। যা একমাত্র তন্ত্রসাধকদের জানা রয়েছে। কেন এই মাহাত্ম্য? কারণ ভারতীয় তন্ত্রসাধনায় সর্বোত্তম শিক্ষক হল যোগিনীতত্ত্ব। যোগিনীদের প্রকৃত অধিকার ছিল সিদ্ধা তান্ত্রিকের শিক্ষাদান। আজও অলৌকিক শক্তির সর্বোচ্চ স্তরে আরোহণ করতে পারেন একমাত্র যোগিনীতন্ত্র। এমনকী মনুষ্যরূপ ছেড়ে যে কোনও মুহূর্তে তাঁরা ধারণ করতে সিদ্ধহস্ত পশুপাখির রূপও। কামাখ্যা থেকে মহাকালেশ্বর। মহাদর্শনের পর চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরে কলসলিঙ্গ স্পর্শ করে মহাদেবীর আহ্বান ধ্যানে ব্রতী হওয়া। এক অলৌকিক অনুভবের সঞ্চার হয় একথা শোনা যায় তন্ত্রসাধকদের মুখেই। আড়ম্বরহীন এই সাধনার ভরকেন্দ্র চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরে দিনের আলোয় ছাড়া প্রবেশ ও থাকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। থাকলে কী হবে? একাধিকবার মানুষ হারিয়ে গিয়েছে। নিকটবর্তী গ্রামবাসীদের অনুমান, তারা গোপনে থেকে গিয়েছিল মন্দিরে। সন্ধ্যার পর। তারপর আর খোঁজ মেলেনি। কতটা সত্যি? বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দোলাচলে যেতে চায় না চম্বল। স্থানীয় মানুষ তন্ত্রমন্ত্র জানে না। তারা জানে বছরের বিশেষ কয়েকটি দিনে হঠাৎ করে শোনা যায় নৃত্যের ঝঙ্কার। দেখা যায় মধ্যরাতে আলোকশিখা। এমনকী দিবালোকে জ্বালিয়ে আসা প্রদীপ ২৪ ঘণ্টাতেও প্রজ্বলিত থেকেছে, এরকম ঘটনাও জনশ্রুতিতে প্রচলিত। প্রতিটি ফসল আসার আগে শস্যবীজ রেখে আসে কৃষিজীবী বিশ্বাসী। কেন? মহাদেবী আবির্ভূত হয়ে সেই শস্য গ্রহণ করেন। যোগিনী মন্দিরের মহাদেবী তাই অদৃশ্য অন্নপূর্ণারূপেও পূজিতা হন! কে না জানে, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ঈশ্বরের আশীর্বাদ হল অন্নসংস্থান!



