সিনেমার সমালোচনা
সিনেমার সমালোচনা
দিল্লি ক্রাইম: সিজন থ্রি
শেফালি শাহ • হুমা কুরেশি
রসিকা দুগ্গল • রাজেশ তইলাং
ভারতের মতো দেশে মেয়েরা বেড়ে ওঠে আগাছার মতো। গর্ভে থাকাকালীন অনেক কন্যাভ্রূণ মেরে ফেলা হয় বিভিন্ন রাজ্যে। যারা বেঁচে গিয়ে জন্ম নেওয়ার মতো ভুল করে বসে, তাদেরও নিস্তার নেই বিশেষ। রোজ বেঁচে থাকাই নিত্য যুদ্ধ। হয় পরিবারেই তারা নির্যাতিত, আবার কখনও তাদের বিক্রি করে দেওয়া হয় স্বল্প কিছু টাকার বিনিময়ে। তারপর হয় তাদের আস্তানা পতিতালয় বা শহরের কোনও বাড়িতে ফরমায়েশ খাটার কাজ।
‘দিল্লি ক্রাইম’-এর এবারের সিজনে উঠে এসেছে এই মেয়ে পাচার চক্রের গল্পই। সঙ্গে রয়েছে ২০১২-এর ‘বেবি ফলক কেস’-এর কিছু ঝলক। যে দেশে প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজ খুললেই শিশুর নিরুদ্দেশ, মেয়েদের যৌন-নির্যাতন বা গৃহবধূদের পুড়িয়ে মারার খবর— সেখানে এই সিরিজ তার প্রতিটা সিজনেই নিয়ে আসে এমন কিছু বাস্তব ঘটনার বিবরণ যা দর্শককে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, এই আতঙ্ক আমরা যেন স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ বলেই ধরে নিয়েছি।
ডিআইজি বর্তিকা চতুর্বেদী (শেফালি শাহ) কাজের সূত্রে ভারতের উত্তরপূর্ব অঞ্চলে বদলি হয়ে গিয়ে থাকলেও নাবালিকা পাচার চক্রের তদন্ত করতে তাকে ফিরে আসতে হয় দিল্লিতে। রাজধানীতে ফিরে রহস্যের জট ছাড়াতে গিয়ে সে বুঝতে পারে এসআই নীতি (রসিকা দুগ্গল) যে বিষয়ে তদন্ত করছে– দুটোই এক সূত্রে বাঁধা। সহায়ক ভূপি (রাজেশ তইলাং) আর নীতিকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় অপরাধী দলের অনুসন্ধান। এবারের গল্প শুধু দিল্লিতে আটকে থাকেনি। মিজোরাম, গুয়াহাটি থেকে শুরু করে রোহতাক, সুরাত এমনকী মুম্বইজুড়ে অপরাধ চক্রের আনাগোনা। পরিচালক তনুজ চোপড়া বোঝাতে চেয়েছেন, মেয়ে পাচার শুধু কোনও একটা শহর বা রাজ্যে নয়, তার জাল সারা দেশজুড়ে ছড়িয়ে।
যাঁরা ‘দিল্লি ক্রাইম’-এর আগের সিজনগুলো দেখেছেন, তাঁরা জানেন এই সিরিজ ‘হু ডান ইট’ নয়, বরং ‘হোয়াই ডান ইট’-এ বেশি মনযোগী। এখানেও তার অন্যথা হয়নি। তবে আগের সিজনগুলোর তুলনায় এখানে ঘটনার তীব্রতা একটু কম বলেই মনে হয়েছে। একসঙ্গে একাধিক ঘটনা তুলে ধরতে গিয়ে ছয় এপিসোডে সময় কম হওয়াতে অপরাধের জট ছাড়ানোয় বেশ কিছু সরলীকরণ ও ফাঁক নজরে আসে।
এই সিজনে ভিলেন গ্যাং-এর ‘মাথা’ বড়ি দিদি মিনার (হুমা কুরেশি) উপস্থিতি গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। তাঁর দলের সঙ্গী হিসেবে সায়নী গুপ্ত এবং মিতা বশিষ্ট বেশ বিশ্বাসযোগ্য। এই সিরিজের সব গল্পই বাস্তবের ঘটনা ঘিরে। কিন্তু শেফালি শাহের চরিত্রটি সাধারণ মানুষের কাছে মানবতার প্রতীক। যে দেশে পুলিশি অত্যাচারও প্রচলিত, সেখানে বর্তিকা চতুর্বেদীর মতো পুলিশ আশার আলো জোগায়। আবার ভয় হয় মিনার মতো মানুষ দেখলে। মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু? কারণ সকলেই আসলে কোনও না কোনও পরিস্থিতির শিকার। সমাজের উঁচু হোক বা নীচু যে কোনও স্তরেই তাদের কাজের, বেঁচে থাকার জবাবদিহি করতে হয় পুরুষের কাছে। কারণ মেয়ে হয়ে জন্মানো একধরনের অপরাধ ছাড়া তো আর কিছু নয়।
অন্য সিজনগুলোর থেকে খানিক দুর্বল হলেও এই সিজন প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলো করতে ভোলেনি। সেখানেই ‘দিল্লি ক্রাইম’ ভারতের সেরা সিরিজগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে থেকে যায়।
দেবত্রী ঘোষ