নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাকপুর, বরানগর ও কলকাতা: শহরতলির অভিজাত আবাসনে আগ্নেয়াস্ত্রের পাহাড়! ঘটনাস্থল খড়দহের রহড়ার রিজেন্ট পার্ক এলাকা। সোমবার সকালে সেখানে যৌথ অভিযান চালায় বারাকপুর কমিশনারেটের গোয়েন্দা বিভাগ ও রহড়া থানা। সংশ্লিষ্ট আবাসনের গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটি ফ্ল্যাটে হানা দিয়ে তারা উদ্ধার করে মোট ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৯০৫ রাউন্ড গুলি। এর মধ্যে নাইন এমএম, সেভেন এমএম, সিঙ্গল শটার, দেশি রিভলভার ছাড়াও বেশ কয়েকটি লং রেঞ্জ রাইফেল রয়েছে। এছাড়া পাওয়া গিয়েছে সোনা ও রুপোর গয়না, দুষ্প্রাপ্য অ্যান্টিক কয়েন ও নগদ প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির কিছু সরঞ্জামও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ওই ফ্ল্যাটে আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি ও মেরামতের ব্যবস্থা ছিল বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের। ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে ওই ফ্ল্যাটের মালিক ৬৬ বছর বয়সি মধুসূদন ওরফে লিটন মুখোপাধ্যায়কে। গত ২০২০ সাল থেকেই তিনি রহড়ার ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। এর আগে ২০০৬ সালে আর্মস অ্যাক্টে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল খড়দহ থানা।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিসের অনুমান, উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রগুলির সঙ্গে বিহারের মুঙ্গের জেলার যোগ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, অস্ত্রভাণ্ডার এবং মজুত সোনা-রুপোর গয়নার সঙ্গে বিহারের কোনও ‘লুটেরা’ দলের সংস্রবও থাকতে পারে। সম্ভবত রহড়ার এই ফ্ল্যাটটিকে ‘ট্রানজিট ক্যাম্প’ হিসেবে ব্যবহার করত দুষ্কৃতীরা। ওই ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছে সেভেন এমএম পিস্তলের সাতটি এবং নাইন এমএম পিস্তলের ন’টি খালি ম্যাগাজিন। সেগুলি কোনও অপারেশনে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করতে চায় পুলিস। পিস্তলগুলির ফরেন্সিক ও ব্যালিস্টিক পরীক্ষা করা হবে বলে জানা গিয়েছে। রহড়ার মতো অভিজাত এলাকায় গোপনে অস্ত্রভাণ্ডার বানিয়ে ‘কারবার’ চালিয়ে যাওয়ার এই ঘটনায় রীতিমতো আতঙ্কে স্থানীয়রা।
অভিযান শেষে বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলন করেন বারাকপুর কমিশনারেটের ডিসি (ডিডি) চারু শর্মা। তিনি জানান, গোপন সূত্রে খবর পেয়েই রহড়ার ওই ফ্ল্যাটে হানা দেওয়া হয়। ওই ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছে একটি পাম্প অ্যাকশন গান, একটি বোল্ট অ্যাকশন রাইফেল, দু’টি দোনলা এবং একটি একনলা বন্দুক, একটি নাইন এমএম এবং দুটি সেভেন এমএম পিস্তল, তিনটি রিভলভার, তিনটি সিঙ্গল শটার। উদ্ধার হওয়া অত্যাধুনিক পিস্তলগুলির মধ্যে একটিতে সাইলেন্সারও লাগানো। এছাড়া মিলেছে নগদ ১ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকা, ২৪৮ গ্রাম সোনার ও ৩০ গ্রাম রুপোর গয়না এবং একাধিক অ্যান্টিক কয়েন, যার ওজন ১০.৭ কেজি। অপরাধ সংশ্লিষ্ট বেশকিছু নথিপত্রও পাওয়া গিয়েছে ফ্ল্যাট থেকে। ডিসি জানান, মধুসূদনের কাছ থেকে একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স মিলেছে। সেটিতে ঠিকানা লেখা—১৫, উমাচরণ চ্যাটার্জি রোড, পানিহাটি, সোদপুর। কী কারণে ফ্ল্যাটে অস্ত্র মজুত করা হয়েছিল, তা জানতে ধৃতকে জেরা করা হবে।
পুলিসের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই আবাসনের আবাসিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে গতবার দুর্গাপুজোর সময় আচমকাই অস্ত্রভাণ্ডারের একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন মধুসূদন। কিছুক্ষণ পরেই তা অবশ্য ডিলিট করে দেন। কিন্তু সেই খবর পৌঁছে যায় ‘উর্দিধারী’দের কাছে। তারপরই শুরু হয়ে যায় রিজেন্ট পার্কের আবাসনের উপর নজরদারি।