নিজস্ব প্রতিনিধি, বিধাননগর: ‘মা খুব অসুস্থ। আমি বাড়ি না ফিরলে তাঁকে ওষুখ খাওয়ানোর কেউ নেই!’ বিক্ষোভকারীদের সামনে এসে বারবার এই কথাগুলো বলছিলেন তরুণী। কিন্তু স্লোগান, চিৎকারে চাপা পড়ে যাচ্ছিল তাঁর করুণ আকুতি! সারাদিন অতিক্রান্ত। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যে। যানজট কাটিয়ে সল্টলেক থেকে ঠাকুরপুকুরে কখন ফিরতে পারবেন কে জানে! অসুস্থ মায়ের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বিকাশ ভবনের দোতলা থেকে সোজা ঝাঁপ দিলেন নীচে! কার্নিশ বেয়ে বাইরে পড়লেও বের হতে পারলেন না। কেন বিকাশ ভবনে এসেছিলেন, তাঁর প্রমাণ চাইলেন বিক্ষোভকারীরা! জখম অবস্থায় তরুণীকে ‘বন্দি’ করে রাখা হল দীর্ঘক্ষণ!
তরুণীর বাড়ি বেহালার ঠাকুরপুকুর। তিনি একটি চাকরির পরীক্ষায় বসেছিলেন। সেই বিষয়েই বৃহস্পতিবার খোঁজ নিতে এসেছিলেন বিকাশ ভবনে। বাইরে তখন চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু তার ফল এমনভাবে ভুগতে হবে বুঝতে পারেননি তিনি। ঢুকে পড়েছিলেন অফিসের ভিতর। তখন থেকেই আটক। সন্ধ্যা হয়ে এলে তিনি দোতলা থেকে বাধ্য হয়ে নীচে ঝাঁপ দেন। বিক্ষোভকারীরা তাঁকে গেটের সামনেই বসিয়ে রাখেন। কেন? এক বিক্ষোভকারী বলেন, কীসের কাজে এসেছিলেন, তার প্রমাণ দেখাতে হবে! তরুণীর কোনও কথা শোনা হয়নি! অনেকেই বলছেন, বিক্ষোভকারীরা তরুণীর প্রমাণ দেখার কে? তাঁদের এই ক্ষমতা কে দিল? সেই উত্তর অবশ্য মেলেনি। দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখার পর ছাড়া হয় জখম তরুণীকে।
ততক্ষণে বিকাশ ভবন চত্বর উত্তাল। ভিতরে আটকে রাখা হয়েছে সরকারি কর্মীদের। সন্ধ্যার পর বিক্ষোভকারীদের হটিয়ে অফিসের কর্মীদের বাইরে বের করার চেষ্টা চালায় পুলিস। তখনই বেঁধে যায় খণ্ডযুদ্ধ। আক্রান্ত হন বিক্ষোভকারীরা। মারধর করা হয়েছে পুলিসকর্মীদেরও। বেশ কয়েকজন পুলিসকর্মী জখম। একজন পুলিসকর্মীকে অচৈতন্য অবস্থায় চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। কোনও অনুনয়, কোনও অনুরোধ, কোনও আর্তিই শুনতে রাজি ছিলেন না আন্দোলনকারীরা। সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ, কেন রিভিউ পিটিশনে তাঁদের মতামত নেওয়া হয়নি। পরীক্ষা তাঁরা আর দেবেন না। এইসব দাবিতে ঘেরাও-বিক্ষোভ কর্মসূচিই চরম আকার ধারণ করে তাঁদের আগ্রাসনে। প্রকাশ্যে মহিলা পুলিসকর্মীদেরও মারধর করেছেন আন্দোলনকারী ‘শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী’রা। কারণ, তাঁরা সাধারণ মানুষের স্বার্থে সরে যেতে বলেছিলেন। পরিস্থিতি এমন দিকে যায় যে, ঠাকুরপুকুরের ওই তরুণীর মতো দোতলা থেকে এক পুলিসকর্মীও ঝাঁপও দেন। মূল গেট দিয়ে বেরতে বাধা পেয়ে পুরুষ-নারী নির্বিশেষে বহু সরকারি কর্মী অফিসের পাঁচিল ডিঙিয়ে বাইরে বেরনোর চেষ্টা করেন। প্রথম কয়েকজন পেরে গেলেও বিক্ষোভকারীরা গেট থেকে পাঁচিলের দিকে তেড়ে যাওয়ায় অনেকেই আটকে যান। বিক্ষোভকারীদের মুখে শোনা যায় হুঙ্কার, ‘আমরা কাউকে ছাড়ব না’।
সিটি সেন্টারের পর থেকে করুণাময়ী মোড়গামী রাস্তা দিনভর বন্ধ। অটো, বাস চলেছে ঘুরপথে। বিক্ষোভ-অশান্তির জেরে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। পথচলতি মানুষের কথায়, এখন যেদিনই সল্টলেকে আসছি, দেখছি রাস্তা বন্ধ! সাধারণ মানুষকে হয়রান করা হচ্ছে কেন?
প্রশ্ন করছেন ওই তরুণীও... আমার অপরাধটা কী ছিল?