নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: ভোট আসে, ভোট যায়। জনসভায় উন্নয়নের খতিয়ান নিয়ে শুরু হয় শাসক-বিরোধী তরজা। কিন্তু খোদ বিধায়কদের হাতে থাকা এলাকার উন্নয়ন তহবিলের টাকা খরচের বাস্তব চিত্রটা ঠিক কী? সম্প্রতি বীরভূম জেলা প্রশাসনের তরফে প্রকাশিত গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান সেই অস্বস্তিকর সত্যকেই সামনে এনে দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, জেলার অধিকাংশ বিধায়কই তাঁদের বরাদ্দ অর্থের সিংহভাগ খরচ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। খোদ রাজ্যের মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার, তালিকার নীচের দিকে নাম রয়েছে জেলার তাবড় সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের। শতাংশের নিরিখে উন্নয়নের দৌড়ে জেলায় প্রথম হয়েছেন লাভপুরের বিধায়ক অভিজিৎ সিংহ। তালিকার একেবারে শেষে রয়েছেন নলহাটির বিধায়ক রাজেন্দ্রপ্রসাদ সিংহ।
জেলা প্রশাসনের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২০২১সাল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বীরভূমের ১১টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটিতে ৩ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এই টাকা স্থানীয় ছোটখাট রাস্তা, পানীয় জল, পথবাতি বা স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো জরুরি কাজে ব্যয় করার কথা। পরিসংখ্যান বলছে, জেলার ১১টি আসনের মধ্যে ১০টি শাসকদল তৃণমূলের দখলে থাকলেও কাজের নিরিখে ১০০ শতাংশের ধারেকাছে পৌঁছাতে পারেননি প্রায় কেউই। তালিকায় সবচেয়ে হতাশাজনক পারফরমেন্স নলহাটির তৃণমূল বিধায়ক রাজেন্দ্রপ্রসাদের। গত পাঁচ বছরে তিনি তাঁর তহবিলের মাত্র ১কোটি ৩৪ লক্ষ ৮৪ হাজার ২৬৯ টাকা খরচ করতে পেরেছেন, যা শতাংশের হিসেবে মাত্র ৪০.৮৬। অর্থাৎ বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি টাকা এখনও অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। লাভপুরে ২কোটি ৫৯ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে। যা বরাদ্দের ৭৮.৫৪ শতাংশ। বিধায়ক অভিজিৎবাবু বলেন, এলাকার উন্নয়নকে আমি বরাবর গুরুত্ব দিয়ে থাকি। গত পাঁচ বছরে মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার দিক থেকে কোনও খামতি রাখিনি। মার্চের মধ্যে আশা করছি বাকি কাজও সম্পন্ন হয়ে যাবে। লাভপুরের পর কাজ হয়েছে হাসনে। বিধায়ক অশোককুমার চট্টোপাধ্যায় ৭৩.৫০ শতাংশ টাকার কাজ করেছেন।
তবে হেভিওয়েটদের অবস্থা তথৈবচ। বোলপুরের বিধায়ক তথা রাজ্যের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহের এলাকায় খরচের পরিমাণ ১কোটি ৮২ লক্ষ ৫৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ ৫৫.৩৩ শতাংশ টাকা খরচ করেছেন। কেন অর্ধেক বরাদ্দ খরচ হল না, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। পিছিয়ে রয়েছেন খোদ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার তথা রামপুরহাটের বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ৫৯.৮২টাকা খরচ করতে পেরেছেন তিনি। জেলার একমাত্র বিরোধী বিধায়ক, দুবরাজপুরের অনুপ সাহার রিপোর্ট কার্ডও খুব একটা উজ্জ্বল নয়। তিনি খরচ মাত্র ৪৭.৩৭ শতাংশ টাকা খরচ করেছেন। ১কোটি ৭৩ লক্ষ টাকারও বেশি কাজ তাঁর এলাকায় এখনও শুরুই করা যায়নি।
উন্নয়নের কাজে টাকা না খরচ হওয়ায় রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। কেন খরচ হল না টাকা? নলহাটির বিধায়ক রাজেন্দ্রপ্রসাদ প্রশাসনিক জটিলতাকেই ঢাল করেছেন। তাঁর দাবি, স্কিম সব জমা দেওয়া আছে। আসলে এসআইআর সহ একাধিক সরকারি প্রকল্পে ব্যস্ততার কারণে প্রশাসনিক কর্তারা সময় দিতে পারেননি। আশা করছি দ্রুত কাজ শেষ হবে। দুবরাজপুরের বিধায়ক বিজেপির অনুপ সাহার দাবি, বিরোধী বিধায়ক হওয়ার অকারণে পদে পদে প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও আমি কাজ করার চেষ্টা করছি। ভোটের আগে বাকি টাকা খরচ হয়ে যাবে। কোনও অর্থ ফেরত যাবে না।