


কলকাতা ময়দানের দুই ভটচায। বাবলু এবং মনা। পোশাকি নাম সুব্রত ও মনোরঞ্জন। বড়ো ম্যাচের আগে এক টেবিলে মুখোমুখি বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের দুই নক্ষত্র। তাঁদের আড্ডার সাক্ষী সোমনাথ বসু ও শিবাজী চক্রবর্তী।
অভিজাত বেঙ্গল ক্লাব থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে সাজানো-গোছানো এক নিরামিষ রেস্তরাঁ। শনিবার দুপুরে দরজা ঠেলে ঢুকেই কানে ভেসে এল ‘বারে বারে কে যেন ডাকে...’। ডানদিকের শেষপ্রান্তে এক চেয়ারে বসে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গান ধরেছেন সুব্রত ভট্টাচার্য। সামনে চায়ের কাপ থেকে উঠছে ধোঁয়া। প্লেটের ঠিক পাশে গাড়ির চাবি আর দামি সিগারেটের বাক্স। আমাদের দেখে ইশারাতেই বসার অনুরোধ। কিন্তু পাশের চেয়ারে নয়। ওটা বরাদ্দ আদরের মনার জন্য। প্রায় দু’দশকেরও বেশি সময় একে অপরের উলটোদিকে খেললেও ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র খামতি নেই। মিনিট দশেক পরেই হাজির মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন নয়, এক্কেবারে জড়িয়ে ধরলেন ময়দানের বাবলু। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখিয়ে সামনে দাঁড়ানো ওয়েটারকে বললেন, ‘চিনিস? কত বড়ো ফুটবলার ছিল জানিস? ছবি তুলে রেখে দে।’ বিব্রত মনোরঞ্জনের উত্তর, ‘ছাড়ো না বাবলুদা। ওরা তোমায় চিনলেই হবে।’
পরের দু’ঘণ্টা যেন হুউউউশ করে কেটে গেল। রবিবার মর্যাদার ডার্বি। আর এই ম্যাচের পালস বাবলু-মনার থেকে ভালো বোঝেন, এমন দাবি করার লোক এই মুহূর্তে বাংলায় নেই। দুই ক্লাবের ‘ঘরের ছেলে’ নিজেদের উজাড় করে দিলেন।
প্রসঙ্গ: বড়ো ম্যাচে কে এগিয়ে?
সুব্রত: কেউ এগিয়ে নয়। এই ম্যাচ সবসময় ফিফটি-ফিফটি। দিনের দিন যে দল ভালো খেলবে সেই জিতবে।
মনোরঞ্জন: মানসিকভাবে অবশ্যই এগিয়ে ইস্ট বেঙ্গল। তবে মাঝমাঠে সাউলের না থাকাটা ফ্যাক্টর। অন্যবারের তুলনায় আমাদের আপফ্রন্ট অনেক শক্তিশালী। কিন্তু দুই উইং-ব্যাক নড়বড় করছে। রক্ষণ অটুট রাখতে হলে ওদের আরও দায়িত্ব নিয়ে খেলতে হবে।
প্রসঙ্গ: প্রিয় দল আইএসএল জিতলে আপনারা কতটা খুশি হবেন?
সুব্রত: আমার রক্তের রং সবুজ-মেরুন। বাঙাল হলেও মোহন বাগানই আমার জীবন। চাইব, বড়ো ম্যাচ জিতে খেতাবের আরও কাছে পৌঁছে যাক লোবেরার দল। মিস্টার গোয়েঙ্কা এত খরচ করে দল গড়েছেন। না জিতলে তো অর্থের অপচয়। (তারপরই আবার গেয়ে উঠলেন, ‘একটা কাপ, একটা শিল্ড, মেডেল একটাও ছাড়ব না...’।
মনোরঞ্জন: ছেলেবেলা থেকেই ইস্ট বেঙ্গলের সমর্থক। পরিবারের প্রত্যেকেই। সুতরাং, প্রথমবার আইএসএল জিতলে শুধু খুশি নয়, মানসিক শান্তি পাব। এখনও ইস্ট বেঙ্গল জিতলে ঘুম ভালো হয়। না হলে ছটফট করি। আর এবার আমাদের দলে ভারসাম্য অনেক বেশি।
প্রসঙ্গ: বড়ো ম্যাচ এখন ডার্বি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে বদলেছে এই মর্যাদার লড়াই?
সুব্রত: এখন তো মোহন বাগানে বাঙালি ফুটবলার হাতে গোনা। ভিনরাজ্যের ফুটবলারদেরও আবেগ চোখে পড়ে না। আর বিদেশিরা অত্যন্ত পেশাদার। আমাদের সময়ে দুই প্রধানেই বাঙালি ফুটবলারদের ভিড়। হাবিবদা, আকবর, পায়াসরা অবাঙালি হলেও আবেগে আমাদের টেক্কা দেবে। তাছাড়া অতীতে বড়ো দলের কোচের দায়িত্বে প্রদীপদা, অমলদা, অরুণদারা থাকতেন। তাঁদের থেকে কতকিছুই যে শিখেছি।
মনোরঞ্জন: জেলা লিগ ক্রমশ গুরুত্বহীন হচ্ছে। তাই প্লেয়ার উঠছে না। দুই প্রধানে বাঙালির সংখ্যা কম। আমাদের সময়ে এই ম্যাচ জিতলে সমর্থকদের কাঁধে চেপে তাঁবুতে ফিরতাম। আর হারলে তো কথাই নেই। পথেঘাটে, অফিসে মুখ লুকিয়ে থাকতে হত।
প্রসঙ্গ:১৯৭৭ সালে লিগের বড়ো ম্যাচ নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। অবিসংবাদিত ফেভারিট হিসেবে নেমে হার মানতে হয়েছিল মোহন বাগানকে? সেই ম্যাচের স্মৃতি কি মনের কোণে উঁকি দেয়?
সুব্রত: (মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নাড়িয়ে) অঘটন তো হতেই পারে। সেদিন ভালো খেলতে পারিনি। তাই হেরেছি। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে সেবার আমরা ত্রিমুকুট পেয়েছি। ওই ম্যাচ ছাড়া ওরা (ইস্ট বেঙ্গল) আমাদের হারাতে পারেনি।
মনোরঞ্জন: সংবাদমাধ্যম তো ম্যাচের আগেই আমাদের হারিয়ে দিয়েছিল। সেটাই অজান্তে জেদ বাড়িয়ে দেয়। ম্যাচের শুরুতে হাবিবদার সিটার রুখে দেয় ভাস্কর। আমরা চেগে উঠি। আর মিহিরের গোলের পর ম্যাচের রাশ ছিল আমাদেরই হাতে। আসলে, ইস্ট বেঙ্গল হারার আগে কোনোদিন হারতে জানে না।
এতক্ষণ কথা বলার পর দু’জনেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। এবার বাইরে যাওয়ার পালা। সিগারেটে টান না দিতে পেরে উসখুশ করছেন বাবলুদা। তাই রেস্তরাঁর বাইরে পাতা চেয়ারে শুরু হল আড্ডার দ্বিতীয় পর্ব। মনোরঞ্জনের চায়ের কাপে চিনি গুলিয়ে দিলেন বাবলু। সেইসময় মনার মন্তব্য, ‘সিগারেটটা এবার ছেড়ে দাও বাবলুদা। বয়স হচ্ছে তো...’।
প্রসঙ্গ: ফুটবলার ও কোচ হিসেবে একে অপরের সম্পর্কে কী ধারণা?
সুব্রত: মনার আরেক নাম লড়াই। রাফ অ্যান্ড টাফ ডিফেন্ডার ছিল। শুধু তাই নয়, পিছন থেকে দলকে নেতৃত্ব দিত। ওর মত ক’জন ইস্ট বেঙ্গল রক্ষণকে নির্ভরতা দিয়েছে? আর কোচ হিসেবেও মনার সাফল্য ঈর্ষণীয়।
মনোরঞ্জন: বাবলুদা মোহন বাগানের স্তম্ভ। টানা ১৭ বছর যে লোকটা পালতোলা নৌকার দাঁড় সামলেছে তাঁর সম্পর্কে নতুন করে কিছুই বলার নেই। শুধু ফুটবলার নয়, কোচ হিসেবে বাবলুদা অনেকের থেকে এগিয়ে। পরিসংখ্যানে চোখ বোলালেই তা বোঝা যাবে।