নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: গুরু নানক থেকে শ্রীচৈতন্যদেব। কবীর অথবা মীরাবাঈ। মধ্যযুগের ভারতে ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে হয়েছিল এক নতুন জনজাগরণ। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ছিল প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন। ১৮৯৩ সালের শিকাগো ধর্মমহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দের একটি বক্তৃতাই হয়ে উঠেছে ভারতীয় অধ্যাত্ম চেতনার বিশ্বজয়ের মুহূর্ত। এছাড়া ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম তো আছেই। এই প্রতিটি ঘটনার মাধ্যমে ভারতের ইতিহাস এক গৌরবজনক অধ্যায়ের অভিমুখে নতুন বাঁক নিয়েছে। আর তা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে ভারতের ইতিহাসে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মনে করেন, এসবের সঙ্গেই একাসনে বসার মতো গৌরবোজ্জ্বল এক অধ্যায় হল, ২০২৫ সালে প্রয়াগের পূর্ণকুম্ভ। এমনকী তাঁর শাসনকালের একমাত্র পূর্ণকুম্ভকে মোদি ভগৎ সিংয়ের শহিদ হওয়া কিংবা মহাত্মা গান্ধীর ডান্ডি অভিযানের সঙ্গেও তুলনা করে ফেলেছেন। আর সেটাও সংসদে দাঁড়িয়ে। বিরোধীদের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কালে হওয়া কুম্ভমেলাকে ইতিহাসে অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করতে মরিয়া হয়ে এরকম বিস্ময়কর সব তুলনা টেনেছেন।
লোকসভায় মঙ্গলবার মোদি বলেন, ‘ভারতে এক জনজাগরণের প্রমাণ এই মহাকুম্ভ।’ অথচ সংসদে প্রধানমন্ত্রীর এই বিবৃতির মধ্যে একটি শব্দও রইল না পদপিষ্টের ঘটনা নিয়ে। একবারও শোক প্রকাশ শোনা গেল না হারিয়ে যাওয়া অগুনতি প্রাণগুলির জন্য। বিরোধীদের বক্তব্য, কুম্ভমেলা আবহমানকাল ধরেই ভারতের ধর্মীয় সংস্কৃতির অঙ্গ। হঠাৎ এই কুম্ভকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে মোদি নিজের কৃতিত্ব জাহির করতে তৎপর। অথচ, কুম্ভমেলা প্রাঙ্গণ এবং নয়াদিল্লি রেল স্টেশন—উভয় ক্ষেত্রেই অব্যবস্থার শিকার হয়ে নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই উদাসীনতা যে শুধু তাঁর নয়, গোটা সরকারেরই, সেই প্রমাণও অবশ্য মিলেছে লোকসভায়। কারণ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কুম্ভে পদপিষ্টের ঘটনা নিয়ে কেন্দ্র কোনও তদন্ত করেনি। মৃত্যু নিয়ে আমাদের কাছে কোনও তথ্যও নেই। তাঁর সাফাই কী? ‘রাজ্য এই ধরনের ঘটনা সামাল দিতে যথেষ্ট দক্ষ। আর বিপর্যয়, পদপিষ্টের মতো ঘটনার তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টা রাজ্যেরই এক্তিয়ারে পড়ে।’
মঙ্গলবার আচমকাই লোকসভায় এলেন মোদি। তার জন্য জিরো আওয়ার বাতিলই করে দিলেন স্পিকার। আর কুম্ভমেলা নিয়ে বিবৃতি দিতে শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী। আগাম আভাস না দিয়ে এভাবে আচমকা এসে মোদি কুম্ভ নিয়ে বলতে থাকায় প্রতিবাদ করলেন বিরোধীরা। কিন্তু মোদি এলেন, বললেন, চলে গেলেন। বেলা ১২টা ২০। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হতেই উঠে দাঁড়ালেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। কিন্তু তাঁকে বলতে দিলেন না স্পিকার ওম বিড়লা। প্রতিবাদে ফেটে পড়ল বিরোধীরা। বিরোধিতায় নেতৃত্ব দিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর স্লোগানে গলা মেলাল কংগ্রেস, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টি, এনসিপির (শারদ পাওয়ার) মতো দল। সম্মিলিত বিরোধীদের স্লোগানে উত্তাল হল সংসদ—‘তানাশাহি নেহি চলেগা। ড্রামাবাজি নেহি চলেগা।’ ওয়েলে টানা ওই স্লোগানের জেরে ৩১ মিনিটের জন্য সভা মুলতুবি করে দিলেন স্পিকার। পরে সংসদ চত্বরে দাঁড়িয়ে রাহুল বললেন, ‘মোদিজি কুম্ভ নিয়ে বলেছেন। আমি তো তাঁকে সমর্থন করতেই উঠেছিলাম। কিন্তু বলতেই দেওয়া হল না। এটাই মোদির নতুন ভারত।’ তাঁর সেই সুর টেনে তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েনের তোপ, ‘আমেরিকার শুল্ক চাপানো, হাতকড়া পরিয়ে ভারতীয়দের ফেরানোর মতো ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী ব্যাপক চাপে রয়েছেন। কয়েকদিন পর আরএসএসের সদর দপ্তর নাগপুর যাচ্ছেন। তাই সঙ্ঘকর্তাদের কাছে নিজের ইমেজ বদলাতেই আচমকা এই নাটক।’