


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভার আগেই শনিবার দুপুরে কলকাতার রাজপথে বিজেপির ব্রিগেড-বাহিনীর তাণ্ডব! আক্রান্ত হলেন রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী ডাঃ শশী পাঁজা। ভাঙচুর করা হল তাঁর বাড়ি। স্থানীয় দুই থানার ওসিরা পর্যন্ত উন্মত্ত গেরুয়া সমর্থকদের হাত থেকে রেহাই পাননি। তাদের ছোড়া ইটে মারাত্মক জখম হয়েছেন বউবাজার থানার ওসি বাপ্পাদিত্য নস্কর। আরও ছ’জন পুলিশ কর্মীও আহত। মন্ত্রীর বাড়িতে হামলার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটক আরও তিনজন। সমালোচনায় সরব হয়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। মন্ত্রী শশী পাঁজার সাফ অভিযোগ, ‘ওরা শুধু গুণ্ডা নয়, ওরা খুনি। পরিকল্পিতভাবে খুন করার চেষ্টা করেছে আমায়। বিজেপির ওই কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে পুলিশকে মামলা করতে বলেছি।’ এক্স হ্যান্ডলে গর্জে উঠেছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়—‘বিজেপির গেরুয়া গুন্ডাগিরি মেনে নেবে না বাংলা!’ এই ঘটনায় রাত পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে চারজনকে। তাঁদের মধ্যে তিনজনের বাড়ি বরানগরে। নাম চরণজিৎ সিং, সানি দে ও কৃষাণু বসু। এর বিরুদ্ধে রাতে বরানগর থানা ঘেরাও করে বিজেপি।
উত্তর কলকাতার গিরিশ পার্ক মোড়ের কাছে, একেবারে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ধারেই মন্ত্রী শশী পাঁজার বাসভবন। স্থানীয়ভাবে যেটি প্রয়াত তৃণমূল নেতা অজিত পাঁজার বাড়ি হিসাবে পরিচিত। তার ঠিক সামনেই রাস্তার উপরে রাজ্যের শাসকদলের তরফে টাঙানো ছিল একাধিক বিজেপি বিরোধী পোস্টার-ফ্লেক্স। ব্রিগেডে যাওয়ার পথে তা দেখতে পেয়েই বাস থামিয়ে হুড়মুড় করে নেমে পড়ে বিজেপির একদল নেতা-কর্মী। ছিঁড়ে দেওয়া হয় ফ্লেক্স-পোস্টার। এরপরই তারা রীতিমত দুষ্কৃতী তাণ্ডব চালায় রাজ্যের মন্ত্রীর বাড়ি ঘিরে। উড়ে আসে একের পর এক ইট-পাটকেল, ফুটপাতের কংক্রিটের স্ল্যাবের টুকরো। স্থানীয় তৃণমূল কর্মীরা প্রতিবাদ জানালে এলোপাথাড়ি চালানো হয় ডান্ডা। ভেঙে যায় বাড়ির জানলার কাচ। ফেটে যায় কাঠের দরজাও।
মন্ত্রীর বাড়ির ভিতরেও ঢুকে পড়ে গেরুয়া ফতুয়া-পাঞ্জাবি পরিহিত হামলাকারীরা। সেখানেও চলে ভাঙচুর। এহেন অতর্কিত হামলা সামলানো সম্ভব হয়নি মন্ত্রী-ঘনিষ্ঠদের পক্ষে। আতঙ্কে বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করেন মন্ত্রী তথা স্থানীয় জোড়াসাঁকো বিধানসভার বিধায়ক শশী পাঁজা। অভিযোগ, তাঁকে লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু ইটবৃষ্টি শুরু হয়। ইটের আঘাতে মন্ত্রীর ডান হাতের কনুইয়ের উপরের অংশ কেটে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ঘনিষ্ঠ কর্মী-সমর্থকরা কোনোক্রমে তাঁকে ঘিরে ধরে ‘প্রাণঘাতী হামলা’ আটকান। শশীদেবীর দাবি, ‘এরা আমাকে মার্ডার করতে এসেছিল।’
পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত, তাতে ঘি ঢালেন গেরুয়া শাড়ি পরিহিত এক মাঝবয়সি মহিলা। নিজেকে ত্রিপুরার বিজেপি সহ-সভানেত্রী হিসেবে দাবি করা ওই মহিলাকেই দেখা যায়, লাঠি হাতে মন্ত্রীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তাণ্ডবকারীদের উসকানি দিতে। তার জেরেই পরপর ব্রিগেডগামী বাস থেকে নেমে হামলায় হাত লাগান বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। নিস্তার পায়নি মন্ত্রীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের বাইক-স্কুটারও। মন্ত্রীর বাড়িতে হামলার খবর চাউর হয়ে যেতেই আশপাশ থেকে ছুটে আসেন বহু তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থক। গিরিশ পার্ক মোড়েই দু’পক্ষের খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়।
হামলা খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বিশাল পুলিশ বাহিনী। চলে আসেন গিরিশ পার্ক, বড়তলা, বউবাজার, জোড়াসাঁকো, আমহার্স্ট স্ট্রিট সহ একাধিক থানার অফিসার ইন-চার্জও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান তাঁরা। কিন্তু হামলাকারীরা সংখ্যায় বেশি থাকায় বেগ পেতে হয় পুলিশকে। ভিডিয়ো ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গিয়েছে, মন্ত্রীর বাড়ির দরজা লক্ষ্য করে ইট ছুড়ছেন সাদা পাঞ্জাবি আর গলায় গেরুয়া ওড়না জড়ানো এক ব্যক্তি। পাশ থেকে আরও দু’জন কোলাপ্সিবল গেটে পরপর লাঠির ঘা দিচ্ছে। সঙ্গে দরজাতেও পরপর লাথি। বাড়ির জানালা লক্ষ্য করে নাগাড়ে ইটবৃষ্টি।
অবস্থা বেগতিক দেখে লালবাজারের নির্দেশে মোতায়েন করা হয় র্যাফ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঠানো হয় ইস্ট সাবার্বান ডিভিশন ও নর্থ ডিভিশনের রিজার্ভ ফোর্সকে। নেতৃত্ব দেন বউবাজার ও বড়তলা থানার ওসি যথাক্রমে বাপ্পাদিত্য নস্কর ও সুবর্ণ দত্ত চৌধুরী। বিরাট পুলিশবাহিনী দেখেই শশী পাঁজার বাড়ির পিছনের রাস্তায় ঢুকে যায় বিজেপির হামলাকারীরা। সেখান থেকে ছোড়া ইটের গুরুতর জখম হন বাপ্পাদিত্যবাবু। আংশিক আহত হন সুবর্ণবাবু ও আরও ছ’জন পুলিশকর্মী। তাঁদের মধ্যে মহিলা পুলিশকর্মীরাও রয়েছেন। সূত্রের খবর, মন্ত্রীর বাড়ির আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে বেশ কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাতে গ্রেপ্তার করা হয় চারজনকে। ভোটের আগে এদিনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন নির্বাচন কমিশনও। সিপির কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশের দাবি, এদিন পরিকল্পিতভাবেই হামলা চালানো হয়েছে।