


পি চিদম্বরম: ২ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে এবং তার পরবর্তী দিনগুলিতে, আমরা জানতে পারব যে বিশ্ব আধুনিক পাইড পাইপারের সুরে নাচবে কি না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি অন্যান্য টার্গেট করা বা চিহ্নিত দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের উপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করে, তাহলে তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লুটিও) নিয়ম, বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন ও রীতির পরিপন্থী হবে। তবে, আইন আমেরিকান হোক বা অন্যকোনও, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনও কিছুরই তোয়াক্কা করেন না। তিনিই স্বয়ং একটি আইন! ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘টার্গেট’ দেশগুলিকে চিহ্নিত করেছেন। সেই দেশগুলি থেকে আমদানি করা নির্বাচিত পণ্যের উপর শুল্ক আরোপের ইচ্ছাও পোষণ করেছেন তিনি। আমাদের ভারতও রয়েছে ওই তালিকায়। বিদেশি পণ্যকে দেশীয় বাজারে প্রবেশ এবং দেশীয় পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে শুল্ক বাধার সৃষ্টি করে। ট্যারিফ (অর্থাৎ কাস্টমস ডিউটি) ছাড়াও অন্যান্য শুল্ক রয়েছে—যেমন ‘অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি’ এবং ‘সেফগার্ড ডিউটি’। এগুলি আরোপ করা হয় বিশেষ পরিস্থিতিতে। তবে এটি একটি অভ্যন্তরীণ অনুশীলন (ডোমেস্টিক এক্সারসাইজ) মাত্র। এগুলি কেবল স্থানীয় আদালতেই চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। সাধারণত বিদেশি রপ্তানিকারকের বিরুদ্ধে বিবাদে দেশীয় শিল্পই সমর্থন পেয়ে থাকে। এছাড়া গুণগত মান, প্যাকেজিং নীতি, পরিবেশ বিষয়ক নির্দেশিকা প্রভৃতির আড়ালে শুল্ক-বহির্ভূত কিছু বাধাও রয়েছে। এই স্বার্থপরতার একটি নাম হল ‘প্রোটেকশনিজম’ বা সুরক্ষাবাদ।
সুরক্ষাবাদ দেশপ্রেম নয়
‘স্বয়ংসম্পূর্ণতা’ বা ‘আত্মনির্ভরতা’ অর্জনের বর্মেরই অংশ ছিল সুরক্ষাবাদ। সুরক্ষাবাদকে দেশপ্রেমের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছিল। আধুনিক অর্থনৈতিক তত্ত্ব এবং অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণাদি ‘স্বয়ংসম্পূর্ণতা’র তত্ত্বকে খারিজ করেছে। স্বয়ংসম্পূর্ণতা একটি মিথ মাত্র। কোনও দেশই তার বাসিন্দাদের পছন্দের এবং ব্যবহার্য সমস্ত পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদন করতে পারে না। একটি সংরক্ষণবাদী দেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার মধ্যে থাকে—নিম্ন বৃদ্ধি ও নিম্ন বিনিয়োগের সমস্যা। তাদের পণ্য উৎপাদনের মান নেমে যায়। তাদের পছন্দ-অপছন্দ ভীষণই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাদের গ্রাহক পরিষেবাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। গত ৫০ বছরের ইতিহাস চূড়ান্তভাবে এটাই প্রমাণ করেছে যে, সংরক্ষণবাদ নয় একটি মুক্ত অর্থনীতি (ওপেন ইকনমি) এবং মুক্ত বাণিজ্যই (ফ্রি ট্রেড) অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। বিশ্বের সেই দেশগুলিই সবচেয়ে ধনী যারা বাণিজ্য এবং প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদের উন্মুক্ত রেখেছে। ভারত প্রায় চার দশক যাবৎ সুরক্ষাবাদের অনুশীলন করেছিল। ভীষণভাবে সীমিত ছিল আমদানি। তার ফলে রপ্তানিও সীমিত হয়ে পড়েছিল। আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রকে একটি ডিভিশন এবং চিফ কন্ট্রোলার অফ ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্টসের অধীনে অফিসারদের একটি বাহিনী ছিল। কেউই পরিষ্কার প্রশ্ন তোলেনি যে, ‘আমরা বুঝতে পারছি কেন আপনি আমদানির প্রধান নিয়ন্ত্রক, কিন্তু দয়া করে ব্যাখ্যা করুন কেন আপনি রপ্তানিরও প্রধান নিয়ন্ত্রক?’ যে-দেশে বৈদেশিক মুদ্রার ভীষণ প্রয়োজন ছিল, সেখানে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিড়ম্বনা কারও কাছেই বোধগম্য ছিল না।
প্রহরী বদল
১৯৯১ সালে ডঃ মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর অর্থনৈতিক নীতি সংরক্ষণবাদকে বিসর্জন দিয়ে অর্থনীতিকে মুক্ত করে দেওয়ার পথ প্রশস্ত করে। ১৯৯১-৯২ সালে ঘোষিত নতুন বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি ভয়ঙ্কর ‘ডেড বুক’ ছিঁড়ে ফেলার পাশাপাশি ঘোষণা করে দিয়েছিল যে, ভারতের দুয়ার মুক্ত বাণিজ্যের জন্য খুলে গেল। সুরক্ষাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যাগ করা হয়েছিল। বাতিল করা হয়েছিল রেগুলেশনস বা বিধিনিষেধমূলক নিয়মকানুন। কিছু ট্যারিফ বা শুল্ক ধীরে ধীরে কমানো হয়েছিল। এইভাবে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হন ভারতীয় প্রস্তুতকারকরা। অর্থনীতি উন্মুক্ত করার স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুবিধাগুলি ছিল বিরাট। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির সরকার তৈরি হতেই ভারত তার নীতি বদল করে এবং ফের প্রোটেকশনিজম বা সুরক্ষাবাদের পথে ফিরে যায়। স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য ‘আত্মনির্ভর’ নামক এক একটি অভিনব নামও দেওয়া হয়েছে। সরকার এই সত্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে যে, পৃথিবীটা বদলে গিয়েছে! দেশগুলি তাদের ‘তুলনামূলক সুবিধা’ আবিষ্কার করে নিয়েছে। ফলত, তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজ নিজ সুবিধাগুলিকেই হাতিয়ার করেছে প্রত্যেকে। উদ্ভাবন করা হয়েছিল ‘সাপ্লাই চেইন’। মোবাইল ফোনের মতো একটি পণ্য একটি দেশে নয়, বরং বেশ কয়েকটি দেশ মিলে ‘তৈরি’ করা হয়েছিল। ‘মেড ইন জার্মানি’ বা ‘মেড ইন জাপান’-এর সদর্প ঘোষণার বিপরীতে অনেক পণ্যই হয়ে ওঠে ‘মেড ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’। বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়ম, বিধান, লাইসেন্স, অনুমতি, বিধিনিষেধ এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, শুল্ক পুনর্বহালের দিকেই দেশকে পরিচালিত করেছিল মোদিযুগের ‘আত্মনির্ভর’। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লুটিও) অনুসারে, ভারতের তরফে আরোপিত শুল্কের সর্বোচ্চ গড় ৫০.৮ শতাংশ। মোস্ট ফেভার্ড নেশন (এমএফএন) বা সর্বাধিক সুবিধাপ্ত দেশের ক্ষেত্রে অবশ্য ট্রেড ওয়েটেড ট্যারিফের গড় ১২ শতাংশ। ভারত কতটা ‘প্রোটেকশনিস্ট’ বা সংরক্ষণবাদী এই দুটি সংখ্যা তারই একটি পরিমাপ।
বৈধ বনাম সংকীর্ণ স্বার্থ
অন্যদিকে, অন্যান্য দেশের মতো ভারতেরও কৃষি, মৎস্য শিকার, খনি, তাঁত, হস্তশিল্প এবং কিছু ঐতিহ্যবাহী পেশা রক্ষার স্বার্থ বৈধ বলেই মানতে হবে। অতএব তাদের সুরক্ষা প্রাপ্য। কারণ লক্ষ লক্ষ নাগরিকের জীবন ও জীবিকা এগুলির উপর নির্ভরশীল। এই বৈধ স্বার্থের প্রতি বিশ্বের সংবেদনশীলতার অভাব নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম গুলি চালিয়ে দিয়েছেন। অ্যালুমিনিয়াম এবং ইস্পাত আমদানির উপর শুল্ক আরোপ দিয়ে শুরু করেছিলেন তিনি, পিছিয়ে এসে অবশ্য একটি নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। অটোমোবাইল এবং অটো-পার্টসের উপর গত ২৬ মার্চ তিনি উচ্চ হারে শুল্ক চাপিয়ে দেন। আমার সন্দেহ, ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন স্নাইপারের মতোই আচরণ করবেন। একবারে একটি লক্ষ্যবস্তু তুলে সেটিকে গুলিতে বিঁধে শেষ করে দেবেন। ভারতের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত গোপন এবং প্রতিক্রিয়াশীল। সরকার ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে শুল্ক হ্রাসের ঘোষণা করেছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতেও খুশি নন। নরেন্দ্র মোদি তোষামোদ করার চেষ্টা করেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতেও সন্তুষ্ট হননি। অর্থ বিল পাস করার মাধ্যমে ডিজিটাল পরিষেবা কর (‘গুগল কর’) প্রত্যাহার করা হয়। আরও কিছু কনসেশন বা ছাড় নিয়ে আলোচনা জারি আছে। এটি একটি অসন্তোষজনক পদ্ধতি। এসব ছেড়ে, যেসমস্ত শুল্ক নিয়ে উভয় পক্ষেরই কিছু উদ্বেগ রয়েছে, এখন সেসব নিয়েই বিশদ আলোচনা এবং চুক্তি হওয়া প্রয়োজন। দৃশ্যত, নরেন্দ্র মোদি হেলে পড়েছেন কিন্তু এই যুদ্ধে তিনি জিতবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ভারতের লড়াইয়ে বন্ধু দেশগুলির সমর্থন প্রয়োজন, ঠিক যেমন অন্যান্য দেশগুলির লড়াইয়ে প্রয়োজন ভারতের সমর্থন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে শুল্ক-যুদ্ধ আরম্ভ করেছে, তাতে ভারতের সেরা মিত্র দেশগুলি হল—কানাডা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ। বুদ্ধিমানের কাজটি মনে হচ্ছে এই দেশগুলিকে ঐক্যবদ্ধ হতে রাজি করানো। অতঃপর তাদের সঙ্গে আমেরিকাকে আলোচনায় বসার জন্য চাপ দেওয়া। এইভাবে একটি বিশদ চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া, যাতে বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধি নিশ্চিত এবং সুস্থায়ী হতে পারে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত