নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে আমল দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করছে না মোদি সরকার। তাদের দাবি কী? যেসব আর্থিক নীতি নির্ধারণের সময় মূল্যবৃদ্ধিকে অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে তার বাইরে রাখতে হবে। কেন্দ্রের প্রশ্ন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বারবার মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এত উদ্বেগ প্রকাশ করছে কেন? কেনই বা লাগাতার মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে রেপো রেট কমানো হচ্ছে না? অর্থাৎ, মোদি সরকার ক্ষুব্ধ। বিরোধীদের সুরের সঙ্গে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সুরও মিলে যাওয়ায় মোটেই খুশি নয় সরকার। সরকারের মন্তব্য থেকেই সেটা স্পষ্ট হল। আর প্রকাশ্যে এসে গেল দু’পক্ষের ঠান্ডা লড়াই। বৃহস্পতিবার এক সেমিনারে কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে সরকারের মতান্তর গোপন রাখেননি। সরাসরি বলেছেন, ‘মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে রেপো রেটের বৃদ্ধি-হ্রাসের যে ব্যবস্থা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অনুসরণ করে, সেটা ভুল।’ গোয়েলের প্রস্তাব, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধি থেকে আলাদা রাখা উচিত। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে যখন আম জনতার সংসার চালানোই দুষ্কর, সেই সময় পীযূষ গোয়েল বলেছেন, ‘কোথায় মূল্যবৃদ্ধি? বিগত ১০ বছরে মোদিজির আমলে গড় মূল্যবৃদ্ধির হার ১৯৪৭ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন। সেই কারণেই আমি রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে অনুরোধ করব, যাতে পরবর্তী নীতি নির্ধারণ কমিটির বৈঠকে তারা রেপো রেট কমায়।’
Advertisement
এই একই অনুষ্ঠানে কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস স্পষ্ট দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি এদিনও বলেন, ‘বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলেই রেপো রেট কমিয়ে দিতে হবে, এই সিদ্ধান্ত যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।’ খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির উদ্বেগজনক প্রবণতা নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে রেপো রেট নির্ধারণের সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার যে প্রক্রিয়া রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অনুসরণ করে, সেটি সঠিক বলেও অভিমত পোষণ করেন গভর্নর। অর্থাৎ মানেটা পরিষ্কার—আরবিআইয়ের সঙ্গে ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে সরকারের। আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি কোনওভাবেই আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না। আর সেটা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বুঝছে। মানতে চাইছে না কেন্দ্র। তবে, এমন একটা বিরূপ মন্তব্য যে বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে, সেটা পরে হলেও বিলক্ষণ বুঝেছেন মন্ত্রী গোয়েল। তাই নিজের মন্তব্যকে একান্তই ব্যক্তিগত বলে ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করেছেন তিনি। কারণ এরপরই তিনি বলেন, ‘আমার এই মন্তব্য কিন্তু সরকারের নয়। এটা সরকারের অভিমত হিসেবে গণ্য করা যাবে না।’ একথা বললেও অবশ্য বিতর্ক থামছে না। কারণ মূল্যবৃদ্ধি সংক্রান্ত মাসিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে বাণিজ্য মন্ত্রকই। সেই মন্ত্রকের মন্ত্রীই যদি এভাবে খাদ্য-মূল্যবৃদ্ধিকে গুরুত্ব না দেন, তাহলে নড়েচড়ে বসতেই হবে। বিশেষ করে তিনি বলছেন, সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির হার নাকি বিগত ৭৭ বছরে সবথেকে কম। এতে অবশ্য অন্য একটি প্রশ্নও উঠছে—এভাবে সরকার আসলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে সতর্ক করে দিল না তো? খাদ্য মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে আরবিআই লাগাতার যে উদ্বেগ প্রকাশ করে যাচ্ছে, সেটা কি ভালোমতো নিচ্ছে না কেন্দ্র? তাই এই ‘হুঁশিয়ারি’?



