নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও বর্ধমান: মন্ত্রিপুত্রকে অপহরণই ছিল টার্গেট। নির্দেশ এসেছিল পাকিস্তানি মেন্টরদের কাছ থেকে। সেই নির্দেশমতো রাজ্যের পুর প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাইয়ের ছেলেকে ‘হানিট্র্যাপ’-এ ফেলতে চেয়েছিল বর্ধমানে ধৃত জয়েশ-ই-মহম্মদ জঙ্গি হামিম মণ্ডল। তার জন্য সে কাজে লাগিয়েছিল নিজের সুন্দরী বান্ধবী অর্পিতা সরকারকে। শুক্রবার রাতে ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জে, বেহবাতপুর গ্রাম থেকে হামিমের সেই বান্ধবীকে গ্রেপ্তার করেছে এসটিএফ। তার বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। শনিবার বর্ধমান আদালতের বিচারক অর্পিতাকে ১৩ দিনের এসটিএফ হেপাজতে পাঠিয়েছেন। গোয়েন্দারা বলছেন, হামিম এবং তার বান্ধবী দু’জনেই গ্যাংস্টার থেকে জঙ্গিতে পরিণত হওয়া পাকিস্তানের কুখ্যাত শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্কে যুক্ত। প্রথমে ইনস্টাগ্রামে পরিচয়, পরে হামিমের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে অর্পিতা। চার বছর ধরে চলছে দু’জনের সেই সম্পর্ক।
পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের নির্দেশে জঙ্গি সংগঠন জয়েশ-ই-মহম্মদ, লস্কর-ই-তোইবা এবং হিজবুল মুজাহিদিন এক ছাতার নীচে এসেছে। আইএসআইয়ের প্রত্যক্ষ মদতে ওই তিন জঙ্গি সংগঠনের ভারত বিরোধী যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও নাশকতার ছক রূপায়নের দায়িত্ব এখন শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্কের। চোরাপথে এদেশে মাদক ও অস্ত্রপাচারকারী এই নেটওয়ার্ক এখন নিরাপত্তা এজেন্সির মাথাব্যথার প্রধান কারণ। গোয়েন্দারা বলছেন, পাঞ্জাব, দিল্লি, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, অসমের পর এবার বাংলায় নিজেদের নেটওয়ার্ক তৈরি করছে ভাট্টি গ্যাং। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যমে মগজধোলাই করে ভারত বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত করা হত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের যুবকদের। শুধু এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নন, ভাট্টি গ্যাং টার্গেট করেছিল অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুকেও। এমনকি ককরোচ আন্দোলন পর্বে যন্তরমন্তরে ‘নাশকতা’র ছকও সাজিয়েছিল এই নেটওয়ার্ক। হামিম ও অর্পিতার আগে ভাট্টি গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০ জন অল্পবয়সি যুবক-যুবতিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
হামিম ও অর্পিতার গ্রেপ্তার এবং তাদের জঙ্গি নেটওয়ার্ক নিয়ে এদিন সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন এসটিএফের আইজি গৌরব শর্মা। তিনি বলেন, ‘রাজ্যের পুর প্রতিমন্ত্রীকে হুমকি দিয়ে মোটা অর্থ আদায়ের ছক কষা হয়। পাক হ্যান্ডলাররা হামিমকে নির্দেশ দেয়, মন্ত্রিপুত্রকে হানিট্র্যাপে ফেলে অপহরণ করতে হবে। এরপর চাওয়া হবে মোটা মুক্তিপণ। এই ইনপুট আসার পর আমরা কাজ শুরু করি। তদন্তে ইনস্টাগ্রামে একটি প্রোফাইলের খোঁজ মেলে। দেখা যায়, সেটি অর্পিতা সরকার নামে এক মহিলার। হানিট্র্যাপে ফেলতে সে চ্যাট করছে মন্ত্রিপুত্রের সঙ্গে। এই মহিলার প্রোফাইল ঘেঁটেই হদিশ মেলে হামিম মণ্ডলের। এরপর হামিমের হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম, এলিমেন্ট চেক এনক্রিপটেড যোগাযোগ মাধ্যম খতিয়ে জানা যায়, তার সঙ্গে পাকিস্তানের শাহজাদ ভাট্টি গ্যাংয়ের যোগাযোগ রয়েছে। ‘রানা’, ‘আবিদ’, ‘হাবিব’ ও ‘৩৩৩’ নামে খোলা বিভিন্ন প্রোফাইলের গ্রুপে রয়েছে হামিম। এই সবক’টি প্রোফাইল ভাট্টি গ্যাংয়ের সদস্যদের।’ গোয়েন্দারা বলছেন, পাক হ্যান্ডলারদের কাছে ভারতীয় সিম কার্ডের ওটিপি পাঠিয়েছিল হামিম। এছাড়াও ব্রিটেন এবং মেক্সিকোর সিমকার্ডও যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করছিল হ্যান্ডলাররা। শাহজাদ ভাট্টির অনুচর রানা হুসেন, আবিদ জাঠ, হাসান গুজ্জর সহ কয়েকজনের সঙ্গে হামিমের যোগাযোগ বাড়ছিল।