


শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: বাংলা বললেই সন্দেহ! পরিচয়পত্র দেখালেও অবিশ্বাস! কাজের জায়গা থেকে থানা—গত কয়েক মাসে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনে এমন সব ঘটনাই ঘটেছে বারবার। বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হেনস্তা, অপমান, কখনও আটক করে ‘পুশ ব্যাক’—এমন সব তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়েই এবার ভোট দিতে বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্য থেকে বাড়ি ফিরছেন তাঁরা। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে বাঙালি হওয়ার জন্য তাঁদের উপর অত্যাচার, অপমানের জবাব ইভিএমে দিতেই অনেক কষ্ট সহ্য করেও দলে দলে ফিরছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা।
উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমা। হিঙ্গলগঞ্জ, হাসনাবাদ, বসিরহাট, মাটিয়া, সন্দেশখালি, মিনাখাঁ—বিস্তীর্ণ এলাকার বহু পরিবার আজও ভিন রাজ্যে কাজ করে আনা উপার্জনের উপর নির্ভরশীল। মূলত বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, বিহার, অসমে ‘বাঙালি খেদাও’-এর ঘটনা বেশি ঘটে। কেউ নির্মাণ ক্ষেত্রে, কেউ ইটভাটায়, কেউ বা ছোটো কারখানায় কাজ করে এঁরা। কিন্তু জীবিকার জন্য দেশেরই এক প্রান্তে গিয়ে পরিচয় সংকটে পড়তে হবে, এমনটা কেউ ভাবেননি। শ্রমিকদের একাংশের অভিযোগ, বাংলা বললেই কাগজ দেখতে চাওয়া হত। কাগজ দেখালেও সেটি ‘নকল’ বলে দেগে দিত। তারপর থানায় নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। স্থানীয় দুষ্কৃতীদের নজরে পড়লেই শুরু হত হয়রানি। কেউ আবার বলছেন, কাজ করতে গিয়ে অপরাধীর মতো দাঁড় করিয়ে জেরা করা হয়েছে শুধু ভাষার জন্য। গত বছরের কয়েকটি ঘটনায় পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। কাজের জায়গা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া, কয়েকদিন আটকে রাখা, তারপর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে ছাড়া—এই ধারাবাহিকতা অনেকের স্মৃতিতে এখনও তাজা। বসিরহাট মহকুমার একাধিক পরিবারের কাছে ফোনে আসা সেই আতঙ্কের খবর আজও কাঁপিয়ে দেয়। ছেলেটা ফিরবে তো? এই প্রশ্নে কেটেছে রাত। সেই স্মৃতি এখনও দগদগে। ইতিমধ্যে বহু শ্রমিক কাজ থেকে ফিরেছেন। আসতে হচ্ছে ট্রেনে ঠাসাঠাসি করে। বাসেও অস্বাভাবিক ভিড়। হাসনাবাদের সমীর শিকদারের কথায়, ‘কাজ পরে হবে, আগে ভোট। অপমানের জবাব দিতে হবে। আমরা ৪০ জন একটা বাস ভাড়া করে উত্তরপ্রদেশ থেকে ফিরেছি। আমাদের রাজুকে পুলিশ বাংলাদেশি বলে তিনদিন থানায় আটকে রেখেছিল। পরে ছেড়েছে। হিঙ্গলগঞ্জে চরের ধারে, হাসনাবাদের ঘাটে, মিনাখাঁর গ্রামে তাই একটাই সুর। পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মধ্যেও ক্ষোভ তীব্র। বসিরহাটের শাঁকচূড়ার বাসিন্দা সুরোজ মোল্লা থাকেন হায়দরাবাদে। তিনি বলছেন, ‘রোজগারের জন্য বাইরে যেতে হবে, কিন্তু সেখানে গিয়ে এভাবে অপমান হতে হবে, ভাবিনি কোনোদিন। এর জবাব তো হবেই!’
দেগঙ্গার শাহানুর খান প্রধানমন্ত্রীর রাজ্য গুজরাতে সোনার কাজ করেন। তিনি বলছেন, ‘ওখানে বাংলা ভাষায় কথা বলতেই ভয় হয়। কয়েকমাস আগেও এনিয়ে অশান্তি হয়েছে। আমরা বাইরে বেরলে কেবল হিন্দিই বলতাম।’ ভোট কাকে দেবেন? সটান জবাব, ‘বাঙালি হেনস্তার বদলা হবে এবার ভোটে।’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বসিরহাট মহকুমার মতো এলাকায় এই অভিজ্ঞতা নিছক ব্যক্তিগত ক্ষোভে আটকে নেই। ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরেও। একই ছবি বনগাঁ থেকে বারাসত সর্বত্র। পরিযায়ী শ্রমিকদের বড়ো অংশের এই অভিজ্ঞতা ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে। অপমানের স্মৃতি, অনিশ্চয়তার ভয় আর সম্মানের দাবি—এই তিনের মিশ্রণেই তৈরি হচ্ছে এক নতুন সুর। আর সেই সুরের প্রতিধ্বনি এবার শোনা যাবে ভোটবাক্সে—মনে করছেন অনেকে।