বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: যে যাই বলুন, সাহিত্য থেকে বিজ্ঞান—বাঙালির মেধার ধার কমেনি। ৪০ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গবেষণা পত্রিকাগুলির অন্যতম ‘নেচার ন্যানোটেকনোলজি’তে সদ্য প্রকাশিত হয়েছে বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণা। তার নেপথ্য কারিগরদের অন্যতম একজন বাঙালি চিকিৎসা বিজ্ঞানী। কী ভাবে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসক-গবেষকদের নাকানিচোবানি খাওয়ানো স্নায়ু সমস্যা পার্কিনসনসকে গোড়াতেই শনাক্ত করা সম্ভব সেই পদ্ধতি বের করে ফেলেছেন তাঁরা!
যাদবপুরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান সিএসআইআর-ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল বায়োলজি ও কেরলের রাজীব গান্ধী সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি’র বিজ্ঞানীরা সম্মিলিতভাবে এই গবেষণায় অংশ নেন। বিজ্ঞানীমহল সূত্রে খবর, হাত-পা কাঁপা, গতি স্লথ হয়ে যাওয়া, বারবার পড়ে যাওয়া, অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়া, গন্ধ না পাওয়া সহ অসংখ্য উপসর্গ রয়েছে পার্কিনসনস রোগের। এ রোগকে কাবু করতে কয়েক লক্ষ কোটি টাকার গবেষণা হয়েছে ও চলছে। মস্তিষ্কের একটি প্রোটিনকেই ভিলেন হিসাবে চিহ্নিত করে তাকে নিকেশ করবার ওষুধ বের করার চেষ্টা চলেছে এতদিন। কিন্তু গবেষকরা দেখেছেন, এত খরচ ও পরিশ্রমের পরও তাতে পার্কিনসনস সারছে না।
তারপর বিজ্ঞানীরা দেখলেন, গলদ রয়েছে গোড়াতেই। স্নায়ুকোষে আলফা সিনুক্লিন নামের প্রোটিনের বড়ো বড়ো জমাট বাঁধা অংশকে এতদিন এই রোগের কারণ বা ভিলেন ধরা হত। কিন্তু দেখা গেল, সেটি আসল ভিলেনই নয়। বরং আলফা সিনুক্লিন প্রোটিনের এক ধরনের ক্ষুদ্র জমাট বাঁধা (আর্লি অলিগোমার) অংশই রোগটির প্রধান কারণ। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, রোগ লক্ষণ প্রকাশের অনেক আগে এই প্রোটিন মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গায় জমতে থাকে। কিন্তু সেটিকে চিহ্নিত করা হবে কীভাবে? লাখ টাকার প্রশ্ন তো এটাই।
এই দু’টি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা একধরনের বিশেষ ছাঁকনি (পেপটাইড বেসড ন্যানোপোর) প্রস্তুত করে তা দিয়ে দেখলেন ওই ক্ষুদ্র জমাট বাঁধা প্রোটিনের অস্তিত্ব। কিন্তু এতে দেশের-দশের কী উপকার হবে? সিএসআইআর-আইআইসিবি’র মুখ্য বিজ্ঞানী ও এই গবেষণার অন্যতম কুশীলব ডঃ কৃষ্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘পারকিনসন নিয়ে এতদিনের ধ্যান ধারনাই যে পাল্টে গেল! উপসর্গ প্রকাশের আগেই যদি এই রোগকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় তাহলে রোগ নির্মূল করার ওষুধ বের করাও সহজ হবে। কে বলতে পারে ভবিষ্যতে এই রোগটির আর অস্তিত্বই থাকবে না আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে।’ বিশিষ্ট নিউরোলজিস্ট ডাঃ বিমানকান্তি রায় বলেন, ‘নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী গবেষণা। কারণ আমরা এখন উপসর্গ প্রকাশের পর পার্কিনসনস রোগীদের দেখি এবং উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা করি। রোগ নির্মূল হয় না। তবে নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই গবেষণার ফল যদি বাস্তবের মাটিতে আনা সম্ভব হয় পার্কিনসনস শুরুর সময় বা আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। বাকি উত্তর দেবে সময়।’
বিশ্বে এই স্নায়ুরোগে আক্রান্ত প্রায় এক কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। গত ৩০ বছরে পার্কিনসনস বেড়েছে ২৭৪ শতাংশ। বাঙুর ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস সূত্রে খবর, স্নায়ুরোগের বিভিন্ন সমস্যায় যত মানুষ আউটডোরে আসেন, তার অন্তত ২০ শতাংশই পার্কিনসনসের রোগী।