শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: চিত্র-১: সুতাহাটার শুকদেব পন্ডা পেশায় অ্যাম্বুলেন্স চালক। অথচ, নামের আগে ডাক্তার লিখে রোগী দেখছেন তিনি! নিজেকে জেনারেল ফিজিশিয়ান বলে রীতিমতো পোস্টার সাঁটিয়ে প্র্যাক্টিস করছেন। গলায় ঝুলছে সুতাহাটা ব্লকের চৈতন্যপুর গ্রামের ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে ওই যুবক অ্যাম্বুলেন্স চালকের কাজ করেছেন। এখন তমলুক পুরসভার ১৮নম্বর ওয়ার্ডে একটি নার্সিংহোমের মার্কেটিং এগজিকিউটিভ। দীর্ঘদিন রোগীর সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে তা নাকি ডাক্তারের চেয়ে কম নয়। শুকদেবের দাবি অন্তত এমনটাই! আর এই দাবিতেই তিনি নিজেকে ‘জেনারেল ফিজিশিয়ান’ দাবি করছেন। রোগীও দেখছেন। ভরতি করার মতো অবস্থা হলে অ্যাম্বুলেন্সে চাপিয়ে তমলুকের নার্সিংহোমে পৌঁছে দিচ্ছেন।
চিত্র-২: নন্দীগ্রাম-২ ব্লকের সাঁইবাড়ি গ্রাম। ব্লক সদর রেয়াপাড়া থেকে মাত্র ছ’কিলোমিটার দূরে এই সাঁইবাড়িতেই প্রসব এবং গর্ভপাত করানোর জন্য আস্ত হাসপাতাল চালান এলাকার হাতুড়ে দেবকুমার দাস ওরফে নাড়ু ডাক্তার। দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতাল চলছে। কখনো কখনো প্রাণহানিও ঘটছে। স্বাস্থ্যদপ্তরের টিম এলাকায় গেলেও বাধার কারণে সেই হাসপাতালে ঢুকতেই পারে না। এরকম প্রভাব নিয়েই নাড়ু ডাক্তার নিজের বাড়ি সংলগ্ন এলাকায় আস্ত হাসপাতাল চালাচ্ছেন। সম্প্রতি একটি গর্ভপাত করানোর সময় নাড়িভুঁড়ি, খাদ্যনালি ও পায়ুপথ ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনায় আপাতত হাসপাতাল বন্ধ। হাসপাতালের নামের উপর চুন ঘষে দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যদপ্তরের উদাসীনতা এবং নজরদারিতে চূড়ান্ত গাফিলতির কারণেই পূর্ব মেদিনীপুরের অনেক গ্রামেগঞ্জে এভাবে ভুয়ো ডিগ্রি লিখে প্র্যাক্টিস চলছে। মাঝেমধ্যেই বিপদ আপদ ঘটছে। কিন্তু, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে সেসব চাপা পড়ছে। সংবাদ মাধ্যমের খবর প্রকাশিত হলেও স্বাস্থ্যদপ্তরের এসবের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশেষ হেলদোল চোখে পড়ে না।
সুতাহাটার বাজিতপুর গ্রামের শুকদেব বলেন, আমি পেশায় ডাক্তার নই। তবে, দীর্ঘদিন মেডিকেল লাইনে রয়েছি। এলাকার লোকজন অসুস্থ হলে হাসপাতাল কিংবা নার্সিংহোমে নিয়ে যাই। নিজে বসার জন্য একটা জায়গা করেছি। সেখানে নামের আগে ডাক্তার শব্দটা লেখা ঠিক হয়নি।
সাঁইবাড়ির নাড়ুডাক্তার বলেন, আমি দীর্ঘদিন গ্রামীণ চিকিৎসক হিসাবে কাজ করি। নিজের চেম্বার রয়েছে। সেটা হসপিটাল নয়।
নন্দকুমার থানার বাবলপুর গ্রামে কেউ মাধ্যমিক, কেউ উচ্চ মাধ্যমিক আবার কেউ মাধ্যমিক ডিঙাতে পারেনি। কিন্তু, নামের আগে গৃহকর্তা, গৃহকর্ত্রী, বাড়ির ছেলে মেয়ে সকলে ডাক্তার লিখে অর্শ, বলি, গভন্দরের চিকিৎসা করেন। অপারেশনও চলে। এককথায় ঘরে ঘরে ডাক্তার। গোটা পাড়াটাই ডাক্তার পাড়া হিসাবে পরিচিত। চিকিৎসা বিজ্ঞান না মেনে সার্জারি করা হচ্ছে। কিন্তু, প্রশাসনের নজর পড়েনি। আজ থেকে ৬০-৭০বছর আগে ওই গ্রামের বাসিন্দা হারাধন সামন্ত বাড়িতে চেম্বার করে এধরনের চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। হারাধনবাবুর তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের অধিকাংশই আজ ‘ডাক্তার’। বাড়ি দেখলে চোখ কপালে উঠবে। গুরুঠাকুর হারাধনবাবুর নাতি ব্যোমকেশ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করে ডাক্তার। তাঁর দুই ছেলেও এবং স্ত্রী শেফালি সকলেই ডাক্তার লিখছেন। এখানকার চার বারের পঞ্চায়েত সদস্য নারায়ণচন্দ্র সামন্ত, সুবল সামন্ত, খোকন জানা, সকলেই অ্যালোপ্যাথি পদ্ধতিতে চিকিৎসা করে ‘গ্যারান্টি সহকারে’ অর্শ, বিল ভগন্দর রোগ সারান। অথচ, ডাক্তারি ডিগ্রি কারও নেই। তবুই সকলেই ডাক্তার। গোটা পাড়া ডাক্তার। নামের আগে প্রত্যেকেই ডাক্তার শব্দ লিখছেন।