শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করার ফলে দিব্য প্রেমের অনেক লক্ষণ দেখা যায়। যেমন, শ্রীকৃষ্ণের এক সখা তাঁকে বলেন, “হে মুকুন্দ! আকাশে নীল মেঘ দেখে কমলনয়না শ্রীমতী রাধারাণী তৎক্ষণাৎ তোমাকে স্মরণ করতে থাকেন। এই মেঘ দর্শন করা মাত্রই তোমার সঙ্গলাভ করার জন্য তিনি আকুল হয়ে ওঠেন।” এটি শ্রীকৃষ্ণসদৃশ কোন বস্তু দর্শন করার ফলে প্রেমের বশে কৃষ্ণস্মৃতির একটি উদাহরণ। শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গকান্তি জলভরা মেঘের মতো ঘনশ্যাম, তাই সেই নীল মেঘ দেখে শ্রীমতী রাধারাণী শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করেছিলেন। এক ভক্ত বলেন যে, চিত্ত যথাযথভাবে একাগ্র না হলেও, উন্মত্ততার বশে কখনও কখনও তিনি হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণের চরণকমলের স্মরণ করেন। নিয়মিত অভ্যাসের ফলে কৃষ্ণস্মৃতির এটি একটি দৃষ্টান্ত। অর্থাৎ, যে সমস্ত ভক্ত নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণের চরণকমলের ধ্যান করছেন। তাঁরা যদি ক্ষণিকের জন্যও অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন, তবুও তাঁরা তাঁদের হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণের দিব্যরূপ দর্শন করতে পারেন।
বিতর্ক
শ্রীকৃষ্ণের এক অতি অন্তরঙ্গ সখা মধুমঙ্গল ছিলেন ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত। শ্রীকৃষ্ণের অধিকাংশ সখাই ছিলেন বৈশ্য বংশোদ্ভূত গোপবালক, তবে অন্য কয়েকজন ছিলেন ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত। প্রকৃতপক্ষে, বৃন্দাবনে বৈশ্য ও ব্রাহ্মণদেরই প্রাধান্য। এই মধুমঙ্গল একদিন শ্রীকৃষ্ণকে বলতে থাকেন, “হে সখে! তোমার মাথার ময়ূরের পালক মাটিতে পড়ে যাচ্ছে এবং তোমাকে অর্পণ করা হয়েছে যে ফুলমালা, সেই সম্বন্ধেও তোমার কোন হুঁশ নেই। আমার মনে হয় তোমার এই অন্যমনস্কতার কারণ হচ্ছে, তোমার নেত্ররূপী ভ্রমর শ্রীমতী রাধারাণীর নেত্ররূপ কমলের দিকে ধাবিত হচ্ছে।” এটি বিমর্ষজনিত বিতর্কের একটি দৃষ্টান্ত। একদিন শ্রীকৃষ্ণ যখন ভ্রমণ করছিলেন, তখন শ্রীমতী রাধারাণীর এক সখা তাঁকে বলেন, “হে সখী! এটি কি একটি গমনশীল তমাল তরু? না, কেন না এতে গতি ও সৌন্দর্য দেখা যাচ্ছে। তা হলে এটি কি মেঘ? না, এটি যদি মেঘ হয়, তা হলে সুন্দর চন্দ্র কোথায়? তাই আমার মনে হচ্ছে যে, ইনি নিশ্চয়ই ভুবন-মনোহর পরমেশ্বর ভগবান, যাঁর মধুর মুরলীধ্বনিতে ত্রিভুবন মোহিত হয়েছে। ইনি নিশ্চয়ই গিরি-গোবর্ধনের সম্মুখে দণ্ডায়মান মুকুন্দ।” এটি সংশয়জনিত বিতর্কের একটি দৃষ্টান্ত।
চিন্তা
শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণ যখন সমস্ত গোপিকাদের গৃহে ফিরে যেতে বলেন, তখন তাঁদের সেই প্রস্তাব ভাল লাগেনি। তার ফলে মর্মাহত হয়ে তাঁরা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করছিলেন এবং তাঁদের সুন্দর মুখমণ্ডল শুষ্ক হয়ে গিয়েছিল। সেই অবস্থায় তাঁরা নিঃশব্দে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
শ্রীল রূপ গোস্বামী বিরচিত ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’ থেকে