কোনওটার বয়স ৪০০ বছর, কোনটা ৫০০, কোনও-টার হয়তো তারও বেশি। কারও গায়ে ‘ন্যাশনাল মনুমেন্ট’-এর তকমা, কেউ ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে পরিচিত, অনেকেই প্রাচীন প্রত্নতত্ত্ব ও চোখ ধাঁধানো স্থাপত্য নিদর্শনের গুণে যুগ যুগ ধরে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে টানছে চুম্বকের মতো। কিন্তু তাতে কী! ভাবনাটা এমন যেন এদের এক এবং একমাত্র পরিচয় মসজিদ, যাদের জন্ম হয়েছে হয়তো বা কোনও মন্দিরের গর্ভে। অতএব ‘মন্দির ওয়াহি বনায়েঙ্গে’। ঠিক ৩২ বছর আগে অযোধ্যায় এই আওয়াজ তুলেই বাবরি মসজিদ ভেঙেচুরে ধ্বংস করে দিয়েছিল কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীরা। পরবর্তীকালে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে সেই ভূমিতেই গড়ে ওঠে রামমন্দির। অযোধ্যার সেই দেখানো পথেই গত তিন দশক ধরে হাঁটছে আরএসএস-বিজেপি। বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ, মথুরার শ্রীকৃষ্ণ জন্মভূমি শাহি ইদগা, মধ্যপ্রদেশের কামাল-মওলা মসজিদ, উত্তরপ্রদেশের সম্ভল মসজিদ। তালিকায় নবতম সংযোজন রাজস্থানের আজমির শরিফ। চিত্রনাট্য মোটামুটি এক। মসজিদের জায়গায় মন্দিরের দাবি তুলে আদালতে যাও। মামলা হলে আইনি জটিলতায় দীর্ঘ সময় কেটে যাবে, সেই সময়টাতে মেরুকরণের তাস খেলে হিন্দু-আবেগ জাগিয়ে তোলা, কাজে লাগাও। তিন দশক আগে এই মন্দির-রাজনীতির ‘ট্রেলার’ দেখিয়ে অযোধ্যায় ‘সাফল্য’ এসেছে। বিতর্ক জিইয়ে রাখলে এমন ফসল আরও তোলা যাবে। আসলে গত লোকসভা ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে গেরুয়াবাহিনী বুঝতে পেরেছে, উন্নয়নের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আর জনগণের মন জেতা যাবে না। ‘আচ্ছে দিন’-এর স্বপ্ন দেখা আম জনতার মোহভঙ্গ হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির ‘ম্যাজিক’ ইমেজ আর কাজ করছে না। ক্ষমতা ধরে রাখতে গেলে হিন্দুত্বই একমাত্র ভরসা। এই ভরসাতেই সম্প্রতি হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রে সাফল্য মিলেছে। অতএব ‘মন্দির রাজনীতির’ গতি বাড়িয়ে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন কৌশলকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রাখতে চাইছেন মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদিরা। অথচ কে না জানে সর্বধর্ম সমন্বয়েই ভারতের ঐতিহ্য। প্রশ্নটা তাই, শুধু একটা মসজিদের চরিত্র বদলে মন্দির তৈরি করা নয়, দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার চরিত্র বদলের।
Advertisement
অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। বাবরি-বিতর্কের আবহে ১৯৯১ সালে উপাসনাস্থল (বিশেষ ব্যবস্থা) আইনে পরিষ্কার বলা ছিল, ১৯৪৭-এ স্বাধীনতার সময়ে যেখানে যেমনটা ছিল তেমনই রাখতে হবে। কোনও উপাসনাস্থলের চরিত্র বদল করা যাবে না। একমাত্র রাম জন্মভূমি বাবরি মসজিদ ছিল এই আইনের বাইরে। যদিও জ্ঞানবাপী মসজিদে সমীক্ষার অনুমতি দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত। মহামান্য আদালতের যুক্তি ছিল, এই রায়ে চরিত্র বদলের অনুমতি দেওয়া হয়নি। হয়েছে চরিত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। কিন্তু এই সমীক্ষা চালানোর অনুমতি পাওয়ার পরই অতি উৎসাহী হয়ে উঠল গেরুয়াবাহিনী! তার প্রমাণ সম্ভল। সেখানে বিতর্কের কারণ দেখিয়ে, সমীক্ষার রাস্তা খুলে দেয় নিম্ন আদালত। দেখা গেল, হিন্দুত্ববাদীদের উস্কানি, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সমীক্ষার কাজ শুরু করা এবং পুলিসের ভূমিকায় গণ্ডগোলের জেরে প্রাণ হারান চার জন। ওই রায়কে হাতিয়ার করেই আজমির শরিফসহ নতুন নতুন জায়গায় সমীক্ষার দাবি উঠতে শুরু করেছে। আইনজীবীদের একটি বড় অংশের দাবি, জ্ঞানবাপী সমীক্ষার অনুমতির পরই যেন প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গেল। প্রশ্ন হল, এর শেষ কোথায়? কারণ মসজিদের চরিত্র বদলে মন্দিরের দাবি দিন দিন বেড়েই চলেছে। আজমির শরিফ যার নবতম উদাহরণ। অথচ আজমিরের দরগায় মানত করে বহু হিন্দুও চাদর চড়িয়ে আসেন। লোকসভা ভোটের আগে এই দরগায় চাদর চড়াতে দেখা গিয়েছে হিন্দুত্বের অন্যতম প্রধান উপাসক নরেন্দ্র মোদিকেও। অথচ সেই আজমির শরিফ আজ বিতর্কের মুখে!
ঘটনা হল, আরএসএসের অধীন বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এবং তাদের হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি ইতিমধ্যে গোটা দেশের ৩০ হাজার মুসলিম উপাসনা স্থলকে চিহ্নিত করে সেখানে সমীক্ষা চালানোর জোরালো সওয়াল শুরু করেছে। এই নজির বিশ্বের কোথাও আছে কি? যেখানে ধর্মান্ধতা কয়েকশো বছরের পুরনো স্থাপত্য ঐতিহ্যকে টেনে নামাতে চাইছে। এই মধ্যযুগীয় ভাবনাই নাকি ‘সনাতনী হিন্দুত্বের’ পরম্পরা! কোনও সভ্য দেশে (বাংলাদেশে অবশ্য নানা ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটছে) এমনটা হতে পারে কি না তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। এই ভারতকে কি আর আধুনিক বলা যাবে?
ঘটনা হল, আরএসএসের অধীন বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এবং তাদের হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি ইতিমধ্যে গোটা দেশের ৩০ হাজার মুসলিম উপাসনা স্থলকে চিহ্নিত করে সেখানে সমীক্ষা চালানোর জোরালো সওয়াল শুরু করেছে। এই নজির বিশ্বের কোথাও আছে কি? যেখানে ধর্মান্ধতা কয়েকশো বছরের পুরনো স্থাপত্য ঐতিহ্যকে টেনে নামাতে চাইছে। এই মধ্যযুগীয় ভাবনাই নাকি ‘সনাতনী হিন্দুত্বের’ পরম্পরা! কোনও সভ্য দেশে (বাংলাদেশে অবশ্য নানা ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটছে) এমনটা হতে পারে কি না তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। এই ভারতকে কি আর আধুনিক বলা যাবে?



