কথায় বলে মাছেভাতে বাঙালি। মাছ ছাড়া বাঙালির রসনাতৃপ্তি অচল। কবে থেকে বাঙালির আত্মার সঙ্গে মাছের নিবিড় যোগাযোগ ঘটেছে বলা মুশকিল। তবে মানুষ আগের থেকে এখন অনেক বেশি স্বাস্থ্য সচেতন। সব মাছ সকলের জন্য ঠিক নয়। পেটের রোগের পথ্য হিসাবে চারা মাছের যেমন তুলনা নেই, তেমনই সামুদ্রিক মাছের ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড অনেক রোগের জন্য ভালো। কিন্তু রোজ রোজ মাছ খাওয়া কি ভালো? খেলে কী হয়? কোন মাছের কী গুণ? কোন বয়সে কারা কতটা মাছ খাবেন? লিখেছেন পুষ্টিবিদ শম্পা চক্রবর্তী।
Advertisement
ঠিক কবে থেকে রসনাবিলাসী বাঙালির আত্মার সঙ্গে বিবিধ মাছের নিবিড় যোগাযোগ ঘটেছে তা সঠিক বলা মুশকিল। সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে শুরু করে, মনসামঙ্গল কাব্যের হাত ধরে আধুনিককাল পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্প, সাহিত্য, গান, গল্প, কবিতা, ছড়া ও লোকগাথায় বারবার মাছের আনাগোনা ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে মনসামঙ্গল কাব্যে কবি বিজয় গুপ্তের লেখা থেকে প্রাচীন বাঙালির মৎস্য প্রীতির সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
‘মৎস্য মাংস কাটিয়া থুইলা ভাগ ভাগ।
রোহিত মৎস্য দিয়া রাঁন্ধে গিমা গাচ গাচ।
ঝাঁজকটু তৈলে রাঁন্ধে খরশুলা মাছ।
ভিতরে মরিচ গুঁড়ো বাহিরে জুড়ায় সুতা।
তৈলে পাক করিয়া রাঁন্ধে চিংড়ির মাথা।
ভাজিল রোহিত আর চিতলের ঝোল।।
কৈ মৎস্য দিয়া রাঁন্ধে মরিচের ঝোল।।
ডুম ডুম করিয়া ছেঁচিয়া দিল টই।
ছাইল ঘসাইয়া বাইল মৎস্য টক।।’
অন্যদিকে প্রাচীন শ্লোকে আছে—
‘ওগগরা ভত্তা গাইকো ঘিত্তা দুগ্ধ সজুত্তা
মৌইলি মচ্ছা নালিত গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা পুনবন্তা।’
অর্থাৎ যে রমণী কলাপাতায় গরমভাত, ঘি, মৌরলা মাছ এবং পাটশাক পরিবেশন করে স্বামীকে খাওয়ায় সেই স্বামী ভাগ্যবান। এ তো গেল প্রাচীনকালের কথা, আজকের দিনেও জন্মদিন থেকে শুরু করে অন্নপ্রাশন, বিয়ে, পুজোপার্বণ এমনকী দৈনন্দিন জীবনচর্চায় মৎস্যপ্রিয় বাঙালির ভাতের থালার পাশে মাছের বাটি চাই-ই চাই। বাংলার ঐতিহ্যময় খাদ্যসংস্কৃতিতে রুই, কাতলা, পাবদা, পার্শে, গুরজালি, ল্যাটা, লোটে, কই, তেলাপিয়া, চিংড়ি, ইলিশ, ট্যাংরা, পাঙাস, মৌরলা, বেলে, ভোলা, বোয়াল, ভেটকি, পমফ্রেট, আড় ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের মাছের অবদান অসামান্য। নদ, নদী, খাল, বিল, হ্রদ, পুকুর, সমুদ্র বিভিন্ন ধরনের জলাশয় থেকে অগণিত রকমের মাছ সংগ্রহ করা হয়। যা স্বাদে, গন্ধে, গুণমানে ও রন্ধন প্রণালীর বৈচেত্র্যে স্বকীয়তার দাবি রাখে। সারা পৃথিবীতে প্রায় ৩০-৪০ হাজার মাছের প্রজাতি পাওয়া যায়। আর তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে সামুদ্রিক মাছটি খাওয়া হয় তা হল ‘টুনা’। বাঙালি ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষজনের খাদ্যতালিকায় মাছ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সম্ভবত আদিম মানুষ আগুন জ্বালাতে শেখার আগেই কাঁচা মাছ খেয়ে জীবনধারণ করতে শিখেছিল। সে সময় মানুষ সহজলভ্য ও খেলে অনেকক্ষণ পেট ভরা থাকে বলেই মাছ খেত। ক্রমে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন পরিবর্তন ও পরিমার্জনের মধ্যে দিয়ে আজকের অসাধারণ স্বাদবিশিষ্ট কই মাছের গঙ্গা-যমুনা, ডাব চিংড়ি, ভেটকি পাতুরি, দই কাতলা, সর্ষে ইলিশ বা পাবদা, মৌরলা চচ্চড়ি, রুইমাছের রেজালা, চিতল মাছের মুইঠ্যা থেকে শুরু করে চিলি ফিশ, লেমন বাটার ফিশ, গ্রিন ফিশ, ফিশস্টিউ-এর মতো অগণিত দেশি-বিদেশি রেসিপিতে যেমন রসিকরাজ বাঙালির রসনাতৃপ্ত হচ্ছে, তেমনই মাছের বিভিন্ন সুস্বাদু বাঙালি পদ বিদেশেও অত্যন্ত জনপ্রিয়।
স্বাদ ও সহজলভ্যতার পাশাপাশি মাছের এই জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ মাছ অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য। অত্যন্ত উন্নতমানের সহজপাচ্য প্রোটিন ছাড়াও মাছে থাকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ভিটামিন, আয়রন, আয়োডিন, জিঙ্ক, কপার, সেলেনিয়াম ইত্যাদি অত্যাবশ্যক মৌল উপাদান। সামুদ্রিক মাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ওমেগা-থ্রি জাতীয় এসেনশিয়াল ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যা রোগ প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেহগঠন, বৃদ্ধি, বিকাশ ও ক্ষয়পূরণের জন্য মাছ অত্যাবশ্যক। সহজপাচ্য হওয়ায় শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের জন্যই মাছ অত্যন্ত আদর্শ খাদ্য হিসেবে গণ্য হয়। তবে বিশেষ কিছু অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রে মাছ খাওয়া যাবে কি না বা খেলেও কতটা খাবেন এ ব্যাপারে ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
রোজ রোজ মাছ খাওয়া যায় কি না অথবা খেলেও কেন খাবেন— সারা পৃথিবীর পুষ্টি ও খাদ্য বিশেষজ্ঞরাই রোজ মাছ খাওয়া যে স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো সে ব্যাপারে মোটামুটি একমত।
প্রতিদিন মাছ খেলে কী কী উপকারিতা পাবেন?
১০০ গ্রাম যে কোনও ধরনের মাছে গড়ে প্রায় ১৪-২০ গ্রাম অত্যন্ত উন্নতমানের হাই বায়োলজিক্যাল ভ্যালু যুক্ত সহজপাচ্য প্রোটিন পাওয়া যায়। অর্থাৎ দেহে প্রয়োজনীয় প্রায় সবরকম অ্যামিনো অ্যাসিডের উৎকৃষ্ট ভাণ্ডার মাছ। প্রোটিন সমৃদ্ধ এই প্রাকৃতিক খাবার দেহগঠন, ক্ষয়পূরণ ও রোগ প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত আবশ্যক।
এছাড়া বিভিন্ন ধরনের মাছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ডি, ভিটামিন-ই, বি-ভিটামিন, ক্যালশিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক, আয়োডিন বিভিন্ন অবশ্য প্রয়োজনীয় ভিটামিনস ও মিনারেলস উল্লেখযোগ্য মাত্রায় থাকায় দেহের প্রয়োজন মিটিয়ে রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
ম্যাকরেল, টুনা, হেরিং, স্যামন, পমফ্রেট, ভোলা, ইলিশ ইত্যাদি মাছ এবং ফিশ লিভার অয়েলে থাকে ওমেগা-থ্রি জাতীয় এসেনশিয়াল ফ্যাটি অ্যাসিড যা ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ থেকে শুরু করে অ্যাজমা, ক্যান্সার, ডিমেনশিয়া, ডিপ্রেশন, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, স্কিন ডিজিজ, অস্টিওপোরোসিস, অ্যালার্জি ইত্যাদি বহু রোগের উত্তম দাওয়াই। অর্থাৎ ওষুধ পথ্য দুই হিসেবেই মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাছে টোটাল ফ্যাট ও কোলেস্টেরলের মাত্রা অন্যান্য প্রাণিজ খাবারের চেয়ে কম হওয়ায় হার্টের রোগী বা হাইপারলিপিডেমিয়ার রোগীরাও স্বচ্ছন্দে খেতে পারেন। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েই খাওয়া উচিত।
মাছের পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের অনুপাত ২, যেখানে রেডমিট ও চিকেনে এই অনুপাত যথাক্রমে ০.২ ও ০.৯। অর্থাৎ মাছে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা স্যাচুরেটেড ফ্যাটের তুলনায় বেশি হওয়ায় ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ, হাইপ্রেশার ও হাইপার লিপিডেমিয়াকে কন্ট্রোলে রাখতে সাহায্য করে।
শিশুদের খাবারে নিয়মিত মাছ রাখা হলে মেধা ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে এবং পরবর্তী জীবনে ক্যাটারাক্ট, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, ওবেসিটি, অ্যালার্জি, ডিপ্রেশন ইত্যাদি সমস্যা এড়ানো যায়।
মাছের ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, ব্রেস্ট-ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, ওভারি ক্যান্সার, প্রস্টেট ক্যান্সার ও ওরাল ক্যাভিটি ক্যান্সারের আশঙ্কা প্রায় ৩০-৫০ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন।
অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের ডায়েটে নিয়মিত মাছ থাকলে প্রিম্যাচিওর সন্তান জন্মানোর ঝুঁকি অনেক কম থাকে।
মাছের ক্যালশিয়াম ও ফসফরাস আমাদের হাড়ের গঠন মজবুত রাখতে সাহায্য করে ও অস্টিওপোরোসিস বা বারবার হাড় ভেঙে যাওয়ার সমস্যা কম রাখে।
সামুদ্রিক মাছ আয়োডিনের উৎকৃষ্ট উৎস যা বুদ্ধি ও বিকাশে সাহায্য করে এবং বিপাক ক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রণ করে শক্তি প্রদানে সাহায্য করে।
সাধারণত মাছে সোডিয়াম কম ও পটাশিয়াম তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় হাইপ্রেশারের রোগীদের জন্য যেমন ভালো তেমনই দেহের ইলেকট্রোলাইট ব্যালান্স ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
মাছে সংযোগ কলার পরিমাণ বেশ কম হওয়ায় রান্নাও যেমন সহজে হয়, তেমনই হজমও তাড়াতাড়ি হয়।
যাঁদের হজমের সমস্যা আছে বা কনস্টিপেশন আইবিএস-এর সমস্যা আছে, মাছ তাঁদের জন্যও অত্যন্ত উপযোগী।
একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে বাঙালিরা গড়ে প্রায় ৬০-৭০ রকমের মাছ খায়। স্বাদ ও গন্ধের বৈচিত্র্য থাকায় নানা ধরনের মাছ নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রান্না করে খেতে পারলে যেমন একঘেয়েমি আসে না তেমনই উপকারও অনেক বেশি পাওয়া যায়।
ছোট কাঁটাযুক্ত মাছে ক্যালশিয়ামের পরিমাণ বেশ বেশি। কাঁটাওলা মাছ চিবিয়ে রসটা খেলে দাঁত ও হাড়ের গঠনের পাশাপাশি রক্ত সঞ্চালন ও পেশি সংকোচনের স্বাভাবিক কাজকর্মে সাহায্য হয়।
আর্থ্রাইটিস ও বাত ব্যথার প্রকোপ কম রাখতে হলে নিয়মিত ডায়েটে কিছু পরিমাণ মাছ রাখতেই হবে।
মাছে ক্যালরির পরিমাণ কম থাকায় ডায়েটারদের ডায়েটে মাছ রাখা খুব দরকার। দীর্ঘক্ষণ পেট ভরে থাকার পাশাপাশি স্যাটাইটি ফিলিং হয় ফলে বাড়তি খেয়ে ফেলার প্রবণতাও অনেক কম থাকে রোজ ডায়েটে মাছ রাখা হলে।
রোজ মাছ খেতে হলে কোন কোন মাছ খাদ্য তালিকায় রাখবেন?
সাধারণত আঞ্চলিক সহজলভ্যতা, পারিবারিক সংস্কৃতি, মাছের দাম ও ব্যক্তি বিশেষের স্বাদের তারতম্যের ওপর মাছ খাওয়াটা ভীষণভাবে নির্ভরশীল। যদিও এখন গ্লোবালাইজেশনের যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের মাছ পাওয়া যায়, তবুও আঞ্চলিক সহজলভ্যতাকে অস্বীকার করা যায় না। যেমন সমুদ্রের উপকূলবর্তী এলাকায় পমফ্রেট, স্যালমন, টুনা, ম্যাকরেল, সার্ডিন, বিশেষ প্রজাতির কিছু চিংড়ি ইত্যাদি বেশি পাওয়া যায়। তেমনই খাল, বিল, নদী, পুকুর, ডোবা, ঝিল বা ভেড়ির মাছ হিসেবে রুই, কাতলা, বাটা, মৃগেল, ল্যাটা, মৌরলা, শিঙ্গি, মাগুর, তেলাপিয়া, পাবদা, পার্শে, ট্যাঙরা, বেলে, কই, পুঁটি ইত্যাদি সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ মাছ আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার এক অপরিহার্য অংশ। আবার বিশেষ বিশেষ স্থানে বিশেষ কিছু স্থানীয় মাছ অত্যন্ত জনপ্রিয়, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। যেমন নর্থবেঙ্গলে থাকার সময়ে আমি যে বোরলি মাছ খেয়েছিলাম তা আর এখানে পাই না। আবার বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত সব ধরনের মাছের ওপরেই যে প্রভূত গবেষণা হয়েছে এমনটাও নয়।
রোজ খাওয়া হলে কোন কোন মাছের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এইসব মাছের পুষ্টিগুণ কী? অথবা কোন কোন অসুখে চলতে পারে এইসব মাছ—সে সব দেখে নেওয়া যাক একনজরে।
রুই মাছ: কথাতেই আছে মাছের সেরা রুই, শাকের সেরা পুঁই। শুধু যে স্বাদের নিরিখেই রুই মাছকে এমন তালিকার শীর্ষে রাখা হয়েছে তা নয়। অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এই মাছে পাওয়া যায় হাই-বায়োলজিক্যাল ভ্যালুর উন্নতমানের প্রোটিন, বি-ভিটামিনস, আয়রন, জিঙ্ক, ক্যালশিয়াম, ভিটামন সি, ভিটামিন-ডি এবং কিছু পরিমাণ ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড। অত্যন্ত সহজপাচ্য হওয়ায় শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের জন্যই রুই মাছ আদর্শ।
কারা খাবেন এই মাছ—ডায়াবেটিস, হাই ব্লাডপ্রেশার, অ্যাথেরোস্ক্লেরসিস, হার্টের অসুখ, অস্টিওপোরোসিস, অ্যাজমা, নার্ভের অসুখ, ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম, ওবেসিটি ইত্যাদি সমস্যা থাকলেও সহজেই খাওয়া যাবে রুই মাছ। এছাড়া বিভিন্ন বয়সি সুস্থ মানুষদের জন্য এই মাছ উপযুক্ত।
২) কাতলা মাছ: রুই মাছের পরেই অত্যন্ত সুস্বাদু ও জনপ্রিয় এই মাছে ফ্যাট ও প্রোটিন কনটেন্ট রুইমাছের তুলনায় সামান্য বেশি। পাশাপাশি ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও বি-ভিটামিনের উৎকৃষ্ট উৎস কাতলা মাছ। কাতলা মাছে সামান্য পরিমাণে ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে বলে রোগ প্রতিরোধে সাহায্যকারী।
কারা কারা খেতে পারেন কাতলা মাছ—অ্যানিমিয়া, আর্থ্রাইটিস, অ্যালঝেইমার্স, অস্টিওপোরোসিস, নিউরাল ডিস-অর্ডার, ডায়াবেটিস, আন্ডারওয়েট ও প্রেগনেন্সিতে দারুণ উপকারী এই মাছ।
কারা খাবেন না—বদহজম, অ্যাসিডিটি ও লিভারের সমস্যা বা কিডনির সমস্যা থাকলে চলবে না এই মাছ।
৩) মৃগেল মাছ: মৃগেল মাছে ক্যালরি ও ফ্যাট কনটেন্ট কম এবং ক্যালশিয়াম যথেষ্ট বেশি, ১০০ গ্রামে প্রায় ৬৮০ মিগ্রা। এছাড়া আছে ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড।
কারা মৃগেল মাছ খেতে পারেন: যাঁদের হজম সংক্রান্ত সমস্যা আছে। আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস, হার্টের রোগ, লিভারের অসুখ, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম, ডায়াবেটিস বা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি তাঁরা স্বচ্ছন্দে এই মাছ খেতে পারেন, তবে অবশ্যই মাত্রা মতো।
৪) পাবদা মাছ: অত্যন্ত সুস্বাদু কুলীন গোত্রীয় এই মাছ নিয়মিত খাদ্য তালিকার পাশাপাশি উৎসব অনুষ্ঠানেও দিব্যি স্থান করে নিয়েছে। প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন সমৃদ্ধ এই মাছে ক্যালশিয়াম, ফসফরাস ও আয়রন থাকে। ১০০ গ্রাম পাবদা মাছ থেকে প্রায় ১০৬ কিলোক্যালরি শক্তি এবং ২.৪ গ্রাম ফ্যাট থাকে।
কাদের জন্য পাবদা মাছ অত্যন্ত উপকারী—হাইব্লাড প্রেশার, আন্ডার ওয়েট, অস্টিওপোরোসিস, কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যালঝেইমার্স, পারকিনসন্স ডিজিজ, কোলাইটিস, ডিসপেপসিয়া, অ্যানেমিয়া ইত্যাদি রোগ এমনকী ক্যান্সার রোগীর পথ্যেও রাখা যায় এই মাছ। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই খেতে পারেন এই মাছ।
৫) পার্শে মাছ: জিরে বাটা দিয়ে বাংলার পার্শে মাছের ঝোল শুধু যে লোকসংস্কৃতিতে স্থান করে নিয়েছে তাইই নয়, সুস্বাদু এই মাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ইত্যাদি থাকে। পার্শে মাছে ফ্যাট ও ক্যালরির মাত্রা সাধারণ রুই মাছের তুলনায় সামান্য বেশি হলেও অত্যন্ত উপকারী।
কোন কোন অসুখে চলতে পারে পার্শে মাছ—আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস, অ্যানেমিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, টিউবারকুলোসিস, হাইফিভার ও ক্যান্সারেও চলতে পারে তাজা পার্শে মাছের হালকা পাতলা ঝোল। সুস্থ মানুষেরা নিয়মিত এই মাছ খেতে পারেন।
৬) বাটা মাছ: কম ক্যালরি যুক্ত ক্যালশিয়াম সমৃদ্ধ এই মাছে খুব সহজপাচ্য উন্নত মানের প্রোটিন থাকায় সুস্থ-অসুস্থ, শিশু-বৃদ্ধ সকলের জন্যই অত্যন্ত উপকারী।
কোন কোন অসুখে পথ্য বাটা মাছ—হার্টের অসুখ, হাই ব্লাডপ্রেশার, ডায়াবেটিস, হাইপারলিপিডেমিয়া, ক্যান্সার, আর্থ্রাইটিস, হাইফিভার, জন্ডিস, টাইফয়েড, কোলাইটিস, অ্যানিমিয়া, ডায়েরিয়া, ওবেসিটি ইত্যাদি অসুখে চলতে পারে এই মাছ।
৭) বেলে মাছ: ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও বি-ভিটামিনস সমৃদ্ধ এই মাছে ক্যালরি ও ফ্যাটের পরিমাণ বেশ কম হলেও উন্নত মানের প্রোটিন আছে।
কোন কোন অসুখে চলতে পারে এই মাছ—ডায়াবেটিস, ওবেসিটি, হজম ও বিপাক সংক্রান্ত সমস্যা, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম-এর সমস্যা থাকলে স্বচ্ছন্দে চলতে পারে এই মাছ। সুস্থ মানুষেরাও রোজই খেতে পারেন এই মাছ।
৮) কই মাছ: অত্যন্ত সুস্বাদু এই মাছে ক্যালরি ও ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালশিয়াম, ফসফরাস ও আয়রন থাকে। তবে উপকার পেতে হলে অত্যন্ত সহজপাচ্য উপায়ে কম তেল মশলাসহ রান্না করাই শ্রেয়।
কোন কোন রোগে চলতে পারে—অ্যানেমিয়া, আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস, আন্ডারওয়েট ইত্যাদি রোগে চলতে পারে এই মাছ।
তবে হজমের সমস্যা থাকলে এই ফ্যাট যুক্ত মাছ অ্যাভয়েড করাই ভালো।
৯) ফলুই মাছ: ফলুই মাছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও সহজপাচ্য প্রোটিন থাকে। কাঁটা সমৃদ্ধ এই মাছ যেমন সুস্বাদু তেমনই সুস্থ-অসুস্থ সবার জন্যই উপযুক্ত।
ফলুই মাছের উপকারিতা— অ্যানিমিয়া, মাংসপেশির দুর্বলতা, হজমের গোলমাল, অরুচি, অস্টিওপোরোসিসসহ বহু অসুখেই চলতে পারে এই মাছ।
১০) শিঙ্গি মাছ: অনেকেই শিশুদের খাওয়ানোর জন্য অনেক দাম দিয়েও আয়রন, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস ও হাইপ্রোটিন যুক্ত সহজপাচ্য শিঙ্গি মাছ কিনে থাকেন। এই মাছে ফ্যাটের পরিমাণ বেশ কম। তবে শিঙ্গি মাছের বদলে অন্যান্য অনেক সহজপাচ্য মাছও বাচ্চাদের জন্য আদর্শ।
বহু-রোগের পথ্য শিঙ্গি মাছ। আলসার, জন্ডিস, জ্বর-জারি, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস, আইবিএস, কোলাইটিস, এজ রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, অ্যানিমিয়া, টিউবারকুলোসিস, অ্যাজমা থেকে শুরু করে বহু রোগের পথ্য হতে পরে এই মাছ।
১১) মাগুর মাছ: অসুস্থ রোগীর পথ্য হিসেবে মাগুর মাছের হালকা ঝোল খাওয়ার প্রচলন আছে। এই মাছে ক্যালরির পরিমাণ কিছুটা কম হলেও ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম, সেলেনিয়াম ও ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
কোন কোন রোগে পথ্য মাগুর মাছ—হাইপ্রেশার, হার্টের অসুখ, ডায়াবেটিস, আলসার, হজমের সমস্যা, অ্যাথেরোস্ক্লেরসিস, ক্রনিক ফিভার, অ্যানেমিয়া, জন্ডিস, শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের ডায়েটে অনায়াসেই রাখা যায় এই মাছ।
১২) পোয়া মাছ: বাংলাদেশের মোহনা এবং বঙ্গোপসাগরে প্রাপ্ত এই মাছকে অনেকেই পামা, কই ভোলা বা পোয়া বলে। উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ এই মাছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ডি, ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকায় হৃদরোগ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
কোন কোন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে— হার্ট অ্যাটাক, হাইপারলিপিডেমিয়া, আর্থ্রাইটিস, ক্যাটারাক্ট, অ্যালঝেইমার্স, ডিমেনশিয়া, অস্থি সংক্রান্ত কিছু সমস্যা ইত্যাদি রোগে চলতে পারে এই ভোলা মাছ।
১৩) শোল মাছ: শোল মূলা, আমশোল, শোল মাছের রসা বা কালিয়ার বিভিন্ন অতি উপাদেয় রেসিপির সঙ্গে বহু বাঙালিই বিশেষভাবে পরিচিত। মিষ্টি জলের এই মাছের ক্যালরির পরিমাণ বেশ কম, অন্যদিকে ক্যালশিয়াম, আয়রন, ভিটামিন ডি ও উন্নত মানের প্রোটিন যথেষ্ট মাত্রায় থাকায় বিভিন্ন অসুখের মোকাবিলায় সাহায্য করে। শোল মাছে এছাড়াও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে।
কোন কোন রোগে শোল মাছ উপযুক্ত— হজম সংক্রান্ত অসুখ, ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ, ডিসপেপসিয়া, গ্যাসট্রাইটিস, জ্বরজারি, ফুসফুসের সংক্রমণ, জন্ডিস, টাইফয়েড, কনস্টিপেশন, অ্যানেমিয়া, টিউবারকুলোসিস ইত্যাদি বহু রোগে চলতে পারে শোল মাছ।
১৪) বোয়াল মাছ: মিষ্টি জলের অত্যন্ত সুস্বাদু এই মাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ছাড়াও ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে। ১০০ গ্রাম বোয়াল মাছের ক্যালরি মাত্রা প্রায় ১০৪ কিলোক্যালরি অর্থাৎ অতিরিক্ত তৈলাক্ত হলেও ক্যালরিমাত্রা সম ওজনের রুই মাছের সঙ্গে তুল্যমূল্য।
কারা এই মাছ খেতে পারেন— আন্ডারওয়েট মানুষজন, অ্যানিমিয়া ও স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম তাদের ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে চলতে পারে এই মাছ। সুস্থ মানুষজনের ক্ষেত্রে কোনও অসুবিধা নেই।
কারা খাবেন না বোয়াল মাছ— এই মাছে ফ্যাটের পরিমাণ একটু বেশি থাকায় শিশু, গর্ভবতী মা ও দুর্বল হজমশক্তি সম্পন্ন মানুষজন, ইনফ্লুয়েঞ্জা, অ্যালার্জি ও ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের সমস্যা থাকলে মোটেই খাবেন না এই মাছ।
১৫) ভেটকি মাছ: অত্যন্ত সুস্বাদু ভেটকি মাছের পাতুরি, ফিশফ্রাই, তেলঝাল, ভাপা বা কালিয়ার সঙ্গে বাঙালিমাত্র সবারই প্রায় কমবেশি পরিচয় আছে। উন্নত মানের প্রোটিন, ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড ছাড়াও ভেটকি মাছে ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও জিঙ্ক ইত্যাদি বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। উপরন্তু ভেটকি মাছে টোটাল ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশ কম হওয়ায় পকেট পারমিট করলে নিয়মিত ডায়েটে রাখলে বেশ উপকার পাবেন।
কোন কোন শারীরিক সমস্যায় চলতে পারে ভেটকি মাছ— বিভিন্ন অসুখ-বিসুখের প্রতিরোধ ও প্রতিকার উভয়ক্ষেত্রেই ভেটকি মাছের বিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। ভেটকি মাছের ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধে বিশেষ কার্যকরী। এছাড়াও ভেটকি মাছের বিশেষ অ্যান্টি থ্রম্বোটিক প্রপার্টি থাকায় রক্তনালীর মধ্যে রক্তজমাট বাঁধার প্রবণতা কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। ডায়াবেটিস, অ্যানেমিয়া, নিউরাল ডিসঅর্ডার, অস্টিওপোরোসিস, অপুষ্টি, টিউবারকুলোসিস, ক্যাটারাক্ট, ইনফ্ল্যামেটারি বাওয়েল ডিসঅর্ডার, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, ডিপ্রেশন ইত্যাদি রোগের পথ্য হিসেবেও চলতে পারে ভেটকি মাছ।
১৬) ইলিশ মাছ: বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হলেও বাংলা ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন স্থানে ইলিশ মাছ অত্যন্ত জনপ্রিয়। স্বাদ, গন্ধ ও রূপে অতুলনীয় এই মাছকে যে কত রকমভাবে রান্না করা যায় তা এককথায় বলে বোঝানো যায় না। কাঁটাযুক্ত হলেও অত্যন্ত সুস্বাদু এই মাছ। জীবনের বেশকিছুটা সময় সমুদ্রে কাটানোর ফলে ওমেগা-থ্রি জাতীয় অত্যন্ত উপকারী পলি-আনস্যাচুরেডেট ফ্যাটি অ্যাসিডের গুণে সমৃদ্ধ। উন্নতমানের প্রোটিন, ফ্যাট, ক্যালশিয়াম, আয়রন, বি-ভিটামিনস, জিঙ্ক ইত্যাদি পুষ্টি উপাদানের গুণে সমৃদ্ধ সুস্বাদু এই মাছ।
কোন কোন রোগে চলতে পারে ইলিশ মাছ— হার্টের রোগ থেকে ডায়াবেটিস, অ্যানেমিয়া থেকে হাইপারটেনশন অথবা আর্থ্রাইটিস, অ্যাজমা, অ্যারিদমিয়া, সোরিয়াসিস, অস্টিওপোরোসিস, অ্যালঝেইমার্স, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, ডিপ্রেশন, অ্যাকনে, সিওপিডি, ডিমেনশিয়া, অ্যানোরেক্সিয়া নার্ডোসা ইত্যাদি রোগে যেমন মাত্রা মাফিক ইলিশ মাছ চলতে পারে, তেমনই সুস্থ মানুষদের জন্যে এই মাছ অত্যন্ত উপকারী।
কারা কারা খাবেন না ইলিশ মাছ: ডায়েরিয়া, গাউট, আর্থ্রাইটিস, হাইপারলিপিডেমিয়া বা লিভারের অসুখের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ইলিশ মাছ না খাওয়াই ভালো। যাঁদের হার্টের রোগ বা ফ্যাট রেস্ট্রিকশন আছে তাঁরাও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো মাসে ১০০-২০০ গ্রামের বেশি ইলিশ মাছ খাবেন না। খুব বয়স্ক মানুষজন যাঁদের হজমের গোলমাল আছে তাঁদের জন্যেও উপযুক্ত নয় এই হাইক্যালরি, হাইফ্যাটযুক্ত মাছ।
১৭) পমফ্রেট মাছ: সুস্বাদু সামুদ্রিক এই মাছ সারাবছরই জনপ্রিয় তবে শীতকালে পমফ্রেটের স্বাদই আলাদা। এই মাছে ফ্যাট ও ক্যালরির পরিমাণ বেশ কম হলেও যথেষ্ট পরিমাণে প্রোটিন, আয়োডিন, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস ও বি-ভিটামিনস থাকে। পমফ্রেট মাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হার্টহেলদি ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
কোন কোন রোগে চলতে পারে এই মাছ— সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ সপ্তাহে ২-৩ দিন এই মাছ খেতে পারেন। বয়স, কার্যক্ষমতা ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী কতটা মাছ খাবেন, তা ডায়েটিশিয়ানের থেকে জেনে নিন। টাইপ টু ডায়াবেটিস, কার্ডিয়াক ডিজিজ, হাইপার লিপিডেমিয়া, ওবেসিটি, সোরিয়াসিস, অস্টিওপোরোসিস, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম, পারকিনসন্স, ডিপ্রেশন, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন ইত্যাদি রোগে এই মাছ অত্যন্ত উপকারী।
১৮) চিংড়ি মাছ: নদী, পুকুর, সমুদ্র ইত্যাদি উৎসস্থান থেকে প্রায় কয়েকশো প্রজাতীর চিংড়ি মাছ বা এই বিশেষ জলজ প্রাণী সারা পৃথিবীতেই অত্যন্ত জনপ্রিয়। মোটামুটি ১০০ গ্রাম চিংড়ি মাছে প্রায় ৮৯ কিলোক্যালরি শক্তি এবং ১৯.১ গ্রাম প্রোটিন থাকে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয়রন, ফসফরাস, সেলেনিয়াম, ক্যালশিয়াম, ভিটামিন বি১২ ইত্যাদি ছাড়াও সামুদ্রিক চিংড়িতে থাকে অ্যাসথাজ্যানথিন নামক বিশেষ এক ধরনের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস, যা চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে দারুণ উপকারী। এর সেলেনিয়াম ও জিঙ্ক বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে, বিপাক ক্রিয়া ভালো রাখে। পর্যাপ্ত আয়রন থাকায় অ্যনিমিয়া বা রক্তহীনতায় যাঁরা ভুগছেন তাঁদের জন্যেও উপকারী এই মাছ। হাইপোথাইরয়েডিজম এবং ওবেসিটিতেও উপকারী এই মাছ। টাইপ-টু ডায়াবেটিসেও চলবে এই মাছ। আমাদের নখ, দাঁত, চুল, হাড় ও রক্তসঞ্চালন ভালো রাখতে সাহায্য করে চিংড়ি মাছ এবং ওমেগা-থ্রি থাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
কাদের জন্য উপযুক্ত নয়— অ্যালার্জি যাঁদের আছে তাঁরা মোটেই এই মাছ খাবেন না। এতে হিস্টামিন জাতীয় যৌগ থাকায় সামান্য পরিমাণে শরীরে ঢুকলেও হতে পারে শ্বাসকষ্ট, ত্বকের প্রদাহ, চোখের সমস্যা ইত্যাদি। অ্যানাফাইলেটিক শকের মতো মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও হাইপারলিপিডেমিয়া, হার্টের অসুখ, হাইপ্রেশার বা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে চিংড়ি মাছ খেতে হলে অবশ্যই ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ মেনে খাবেন।
১৯) চিতল মাছ: চিতল মাছের ‘মুইঠ্যা’ বাঙালির রসনাবিলাসকে পরিতৃপ্ত করে। স্বাদের পাশাপাশি পুষ্টিগুণের বিচারেও এই মাছ অনন্য। ১০০ গ্রাম চিতল মাছে প্রায় ১০৮ কিলোক্যালরি শক্তি, ১৮.৬ গ্রাম উন্নত মানের প্রোটিন ও ২.৩ গ্রাম ফ্যাট থাকে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয়রন, ক্যালশিয়াম পটাশিয়াম ছাড়াও এই মাছে কোলিনের পরিমাণ বেশ বেশি থাকায় স্বাস্থ্যকর।
কোন কোন রোগে উপযুক্ত এই মাছ— অ্যানিমিয়া, প্রোটিন এনার্জি ম্যালনিউট্রিশন, অ্যালঝেইমার্স, হাই ব্লাডপ্রেশার, হার্টের অসুখ, মনোযোগের অভাব, ডিপ্রেশন, ক্যান্সার ইত্যাদি বিভিন্ন রোগে যেমন উপযুক্ত তেমনই বিভিন্ন বয়সি সুস্থ মানুষজনও নিয়মিত ডায়েটে রাখতে পারেন এই মাছ।
২০) কাজলি মাছ: অত্যন্ত সুস্বাদু ঝকমকে রুপোলি রঙা মিষ্টি জলের এই মাছের প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ১৮ গ্রাম প্রোটিন ও ৪.১ গ্রাম ফ্যাট থাকে। আয়রন, ক্যালশিয়াম, ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ হয় এই মাছ।
কাজলি মাছের উপকারিতা— উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, অস্টিওপোরোসিস, বাতের ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, চোখের বিভিন্ন অসুখে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এই মাছ। সুস্থ-অসুস্থ সবার জন্যেই উপযুক্ত এই মাছ। তবে এই মাছে যেহেতু ফ্যাটের পরিমাণ সামান্য বেশি তাই কম তেলে রান্না করা উচিত।
২১) মৌরলা মাছ: খাল, বিল, ডোবা, নদী, পুকুর ইত্যাদি স্থানে পাওয়া যায় বাঙালির অতিপ্রিয় সুস্বাদু এই মাছ। ক্যালশিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন-এ ও ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যুক্ত এই মাছ নিয়মিত খেলে হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্য মজবুত হয়, দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকে, রক্তাল্পতা দূর হয় ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
২২) পুঁটি মাছ: অত্যন্ত সুস্বাদু কাঁটাওলা, মিষ্টিজলের এই মাছের ১০০ গ্রামে প্রায় ১১০ কিলোক্যালরি শক্তি ও ১৮.১ গ্রাম প্রোটিন থাকে। সরপুঁটি মাছে ফ্যাট ও ক্যালরির পরিমাণ অবশ্য কিছু বেশি।
কারা খেতে পারেন এই মাছ— আন্ডার ওয়েট, প্রোটিন এনার্জি ম্যালনিউট্রিশন, বাড়ন্ত বাচ্চা, গর্ভবতী মায়েদের জন্যে উপযুক্ত এই মাছ।
২৩) আমোদি মাছ: প্রোটিন সমৃদ্ধ এই মাছ ছোটবড় সকলের জন্যেই বেশ উপযুক্ত। দেহের বৃদ্ধি, বিকাশ, ক্ষয়পূরণ ও রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে এই ছোট মাছ।
ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ: সার্ডিন, স্যামন, টুনা, হেরিং কড ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছে প্রোটিন, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়োডিন, সালফার, সেলেনিয়াম, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ডি, ভিটামিন-বি১২ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণে পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-থ্রি জাতীয় পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে ম্যাজিক্যাল হেলথ বেনিফিট আছে।
কোন কোন রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সাহায্য করে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ— হার্ট ডিজিজ, হাইপারলিপিডেমিয়া, কিডনি, ব্রেস্ট-ব্লাডার-স্টমাক-প্রস্টেট ক্যান্সার, বিভিন্ন ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ, টাইপ-টু ডায়াবেটিস, অ্যালঝাইমার্স, ইনসমনিয়া, ডিপ্রেশন, পারকিনসন্স, মালটিপল স্কুলেরসিস, সোরিয়াসিস, এজরিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, স্নায়বিক অসুস্থতা, ফুসফুসের প্রদাহ এবং ত্বক ও চুলের বিভিন্ন সমস্যা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সাহায্য করে সামুদ্রিক মাছ।
এইসব উপকারী সামুদ্রিক মাছ সপ্তাহে ২-৩ দিন মাত্র ৫০ গ্রাম করে ডায়েটে রাখা গেলেই উপকার পাওয়া যাবে। তবে এক্ষেত্রে খুব বড় মাছ অথবা দীর্ঘদিন ধরে বরফে সংরক্ষিত মাছ খাবেন না।
কোন বয়সে কতটা মাছ খাওয়া ভালো?
মাছ অত্যন্ত উপকারী প্রোটিন জাতীয় খাবার, যা সুষম আহারের একটা অত্যাবশ্যক উপাদান। কিন্তু কোন বয়স থেকে শিশুদের মাছ খাওয়ানো যেতে পারে অথবা কোন বয়সের মানুষজন কতটা মাছ খেতে পারেন সে ব্যাপারে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক।
১-৩ বছর বয়সি শিশুদের কতটা মাছ খাওয়াবেন?
আইসিএমআর (ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিক্যাল রিসার্চ)-এর পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে শিশুর ৭-৮ মাস বয়স থেকেই ওজন অনুযায়ী দৈনিক ১ চা চামচ করে কাঁটা বাছা সুসিদ্ধ মাছ দেওয়া যায়। আস্তে আস্তে সেই পরিমাণ বেড়ে শিশুর তিন বছর বয়স হলে দৈনিক ৪০-৫০ গ্রাম কাঁটা বাছা/ কাঁটাবিহীন সুস্বাদু, সহজপাচ্য মাছ দেওয়া উচিত।
৪-১০ বছর বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে কতটা মাছ প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন: এই বয়সি শিশুদের বিভিন্ন পুষ্টিদ্রব্য বিশেষত প্রোটিন ও ভিটামিন-এ এর অভাবজনিত অসুস্থতা দূর করার জন্যে সাধারণ ভাত, ডাল, শাকসব্জি, ফলমূল, দুধযুক্ত ব্যালান্স ডায়েটে ৫০-৭৫ গ্রাম পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের মাছ রাখা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি এই বয়সি বাড়ন্ত বাচ্চাদের যদি সপ্তাহে ২ দিন অন্তত ৫০ গ্রাম মাত্রায় বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ খাওয়ানো হয় তাহলে বাচ্চাদের স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে, বাড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
১১-১৮ বছর বয়সিরা রোজ কতটা মাছ খেতে পারেন:
শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়সে পৌঁছনোর মাহেন্দ্রক্ষণ এই বয়ঃসন্ধিতে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিগত চাহিদারও বিশেষ পরিবর্তন ঘটে। শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা। এইসময় ছেলেমেয়েদের ক্যালশিয়াম, প্রোটিন, আয়রন, ক্যালরি, আয়োডিন, জিঙ্ক, বি-ভিটামিনস ইত্যাদি পুষ্টি উপাদানের চাহিদা মেটানোর জন্যে ব্যালান্সড ডায়েটের এক অন্যতম উপাদান মাছ। দৈনিক ৪৫-৬৫ গ্রাম প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্যে প্রতিদিনের ডায়েটে ৭০-৭৫ গ্রাম মাত্রায় রুই, কাতলা, মৃগেল, শোল, বাটা, বেলে, মৌরলা, কাজলি, ট্যাংরা, পাবদা, গুরজালি, চাপলা, চেলা, কাচকি, ভেটকি, সুরমাই, চিতল, ফলুই, পমফ্রেট, ইলিশ, আড়, ভাঙর ইত্যাদি যে কোনও মাছই বয়সন্ধিতে উপযুক্ত।
এর মধ্যে সপ্তাহে ২-৩ দিন অন্তত সার্ডিন, স্যামন, ম্যাকরেল, টুনা, লোটে, পমফ্রেট ইত্যাদি মাছ অন্তত ৫০-৬০ গ্রাম মতো খাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ইকোসাপেন্টানোয়িক অ্যাসিড এবং ডোকোসাহেক্সানোয়িক অ্যাসিডের অভাব হয় না। ফলে দেহে এনার্জি লেভেল বাড়ে, মনঃসংযোগ, বুদ্ধিবৃত্তি ও দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটে। সক্রিয় থাকে থাইরয়েড গ্রন্থিও। বেসাল মেটাবলিক রেট ঠিক থাকায় ওজন বাড়ার প্রবণতাও কম থাকে।
প্রাপ্তবয়স্ক (১৯-৬০ বছর) মানুষদের দৈনিক কতটা মাছ খাওয়া উচিত: ১৮ বছর বয়সের পর থেকে দেহের বৃদ্ধি ও বিকাশ সেভাবে না হলেও দেহের অভ্যন্তরীণ ও শারীরবৃত্তীয় কাজকর্ম, রোগপ্রতিরোধ ও ক্ষয়পূরণের জন্য প্রতি কেজি আদর্শ দেহভারের ১ গ্রাম/ কেজি হিসেবে ৬০-৭৫ গ্রাম প্রোটিন দরকার। আর এই প্রোটিনের অতি উৎকৃষ্ট উৎস হল মাছ। স্বভাবতই এই পুরুষ বা মহিলারা যদি হেভি ওয়ার্কআউট বা স্পোর্টস এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন তবে ব্যক্তি বিশেষের বয়স, ওজন, উচ্চতা, শারীরিক অবস্থা এবং কর্মক্ষমতা অনুযায়ী প্রোটিন চাহিদাও বেড়ে ৭৫-১০০ গ্রাম হতে পারে। ইয়াং অ্যাডাল্টরা এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ সাপেক্ষে দৈনিক সর্বাধিক ১২৫ গ্রাম পর্যন্ত প্রোটিন নিতে পারেন। গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের জন্যেও প্রোটিন চাহিদা বাড়ে। এক্ষেত্রে সামুদ্রিক, নদী, পুকুর বা অন্যান্য জলাশয়ের বিভিন্ন মাছই অত্যন্ত উপকারী। সাধারণ অবস্থায়
‘মৎস্য মাংস কাটিয়া থুইলা ভাগ ভাগ।
রোহিত মৎস্য দিয়া রাঁন্ধে গিমা গাচ গাচ।
ঝাঁজকটু তৈলে রাঁন্ধে খরশুলা মাছ।
ভিতরে মরিচ গুঁড়ো বাহিরে জুড়ায় সুতা।
তৈলে পাক করিয়া রাঁন্ধে চিংড়ির মাথা।
ভাজিল রোহিত আর চিতলের ঝোল।।
কৈ মৎস্য দিয়া রাঁন্ধে মরিচের ঝোল।।
ডুম ডুম করিয়া ছেঁচিয়া দিল টই।
ছাইল ঘসাইয়া বাইল মৎস্য টক।।’
অন্যদিকে প্রাচীন শ্লোকে আছে—
‘ওগগরা ভত্তা গাইকো ঘিত্তা দুগ্ধ সজুত্তা
মৌইলি মচ্ছা নালিত গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা পুনবন্তা।’
অর্থাৎ যে রমণী কলাপাতায় গরমভাত, ঘি, মৌরলা মাছ এবং পাটশাক পরিবেশন করে স্বামীকে খাওয়ায় সেই স্বামী ভাগ্যবান। এ তো গেল প্রাচীনকালের কথা, আজকের দিনেও জন্মদিন থেকে শুরু করে অন্নপ্রাশন, বিয়ে, পুজোপার্বণ এমনকী দৈনন্দিন জীবনচর্চায় মৎস্যপ্রিয় বাঙালির ভাতের থালার পাশে মাছের বাটি চাই-ই চাই। বাংলার ঐতিহ্যময় খাদ্যসংস্কৃতিতে রুই, কাতলা, পাবদা, পার্শে, গুরজালি, ল্যাটা, লোটে, কই, তেলাপিয়া, চিংড়ি, ইলিশ, ট্যাংরা, পাঙাস, মৌরলা, বেলে, ভোলা, বোয়াল, ভেটকি, পমফ্রেট, আড় ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের মাছের অবদান অসামান্য। নদ, নদী, খাল, বিল, হ্রদ, পুকুর, সমুদ্র বিভিন্ন ধরনের জলাশয় থেকে অগণিত রকমের মাছ সংগ্রহ করা হয়। যা স্বাদে, গন্ধে, গুণমানে ও রন্ধন প্রণালীর বৈচেত্র্যে স্বকীয়তার দাবি রাখে। সারা পৃথিবীতে প্রায় ৩০-৪০ হাজার মাছের প্রজাতি পাওয়া যায়। আর তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে সামুদ্রিক মাছটি খাওয়া হয় তা হল ‘টুনা’। বাঙালি ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষজনের খাদ্যতালিকায় মাছ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সম্ভবত আদিম মানুষ আগুন জ্বালাতে শেখার আগেই কাঁচা মাছ খেয়ে জীবনধারণ করতে শিখেছিল। সে সময় মানুষ সহজলভ্য ও খেলে অনেকক্ষণ পেট ভরা থাকে বলেই মাছ খেত। ক্রমে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন পরিবর্তন ও পরিমার্জনের মধ্যে দিয়ে আজকের অসাধারণ স্বাদবিশিষ্ট কই মাছের গঙ্গা-যমুনা, ডাব চিংড়ি, ভেটকি পাতুরি, দই কাতলা, সর্ষে ইলিশ বা পাবদা, মৌরলা চচ্চড়ি, রুইমাছের রেজালা, চিতল মাছের মুইঠ্যা থেকে শুরু করে চিলি ফিশ, লেমন বাটার ফিশ, গ্রিন ফিশ, ফিশস্টিউ-এর মতো অগণিত দেশি-বিদেশি রেসিপিতে যেমন রসিকরাজ বাঙালির রসনাতৃপ্ত হচ্ছে, তেমনই মাছের বিভিন্ন সুস্বাদু বাঙালি পদ বিদেশেও অত্যন্ত জনপ্রিয়।
স্বাদ ও সহজলভ্যতার পাশাপাশি মাছের এই জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ মাছ অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য। অত্যন্ত উন্নতমানের সহজপাচ্য প্রোটিন ছাড়াও মাছে থাকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ভিটামিন, আয়রন, আয়োডিন, জিঙ্ক, কপার, সেলেনিয়াম ইত্যাদি অত্যাবশ্যক মৌল উপাদান। সামুদ্রিক মাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ওমেগা-থ্রি জাতীয় এসেনশিয়াল ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যা রোগ প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেহগঠন, বৃদ্ধি, বিকাশ ও ক্ষয়পূরণের জন্য মাছ অত্যাবশ্যক। সহজপাচ্য হওয়ায় শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের জন্যই মাছ অত্যন্ত আদর্শ খাদ্য হিসেবে গণ্য হয়। তবে বিশেষ কিছু অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রে মাছ খাওয়া যাবে কি না বা খেলেও কতটা খাবেন এ ব্যাপারে ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
রোজ রোজ মাছ খাওয়া যায় কি না অথবা খেলেও কেন খাবেন— সারা পৃথিবীর পুষ্টি ও খাদ্য বিশেষজ্ঞরাই রোজ মাছ খাওয়া যে স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো সে ব্যাপারে মোটামুটি একমত।
প্রতিদিন মাছ খেলে কী কী উপকারিতা পাবেন?
১০০ গ্রাম যে কোনও ধরনের মাছে গড়ে প্রায় ১৪-২০ গ্রাম অত্যন্ত উন্নতমানের হাই বায়োলজিক্যাল ভ্যালু যুক্ত সহজপাচ্য প্রোটিন পাওয়া যায়। অর্থাৎ দেহে প্রয়োজনীয় প্রায় সবরকম অ্যামিনো অ্যাসিডের উৎকৃষ্ট ভাণ্ডার মাছ। প্রোটিন সমৃদ্ধ এই প্রাকৃতিক খাবার দেহগঠন, ক্ষয়পূরণ ও রোগ প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত আবশ্যক।
এছাড়া বিভিন্ন ধরনের মাছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ডি, ভিটামিন-ই, বি-ভিটামিন, ক্যালশিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক, আয়োডিন বিভিন্ন অবশ্য প্রয়োজনীয় ভিটামিনস ও মিনারেলস উল্লেখযোগ্য মাত্রায় থাকায় দেহের প্রয়োজন মিটিয়ে রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
ম্যাকরেল, টুনা, হেরিং, স্যামন, পমফ্রেট, ভোলা, ইলিশ ইত্যাদি মাছ এবং ফিশ লিভার অয়েলে থাকে ওমেগা-থ্রি জাতীয় এসেনশিয়াল ফ্যাটি অ্যাসিড যা ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ থেকে শুরু করে অ্যাজমা, ক্যান্সার, ডিমেনশিয়া, ডিপ্রেশন, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, স্কিন ডিজিজ, অস্টিওপোরোসিস, অ্যালার্জি ইত্যাদি বহু রোগের উত্তম দাওয়াই। অর্থাৎ ওষুধ পথ্য দুই হিসেবেই মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাছে টোটাল ফ্যাট ও কোলেস্টেরলের মাত্রা অন্যান্য প্রাণিজ খাবারের চেয়ে কম হওয়ায় হার্টের রোগী বা হাইপারলিপিডেমিয়ার রোগীরাও স্বচ্ছন্দে খেতে পারেন। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েই খাওয়া উচিত।
মাছের পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের অনুপাত ২, যেখানে রেডমিট ও চিকেনে এই অনুপাত যথাক্রমে ০.২ ও ০.৯। অর্থাৎ মাছে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা স্যাচুরেটেড ফ্যাটের তুলনায় বেশি হওয়ায় ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ, হাইপ্রেশার ও হাইপার লিপিডেমিয়াকে কন্ট্রোলে রাখতে সাহায্য করে।
শিশুদের খাবারে নিয়মিত মাছ রাখা হলে মেধা ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে এবং পরবর্তী জীবনে ক্যাটারাক্ট, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, ওবেসিটি, অ্যালার্জি, ডিপ্রেশন ইত্যাদি সমস্যা এড়ানো যায়।
মাছের ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, ব্রেস্ট-ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, ওভারি ক্যান্সার, প্রস্টেট ক্যান্সার ও ওরাল ক্যাভিটি ক্যান্সারের আশঙ্কা প্রায় ৩০-৫০ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন।
অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের ডায়েটে নিয়মিত মাছ থাকলে প্রিম্যাচিওর সন্তান জন্মানোর ঝুঁকি অনেক কম থাকে।
মাছের ক্যালশিয়াম ও ফসফরাস আমাদের হাড়ের গঠন মজবুত রাখতে সাহায্য করে ও অস্টিওপোরোসিস বা বারবার হাড় ভেঙে যাওয়ার সমস্যা কম রাখে।
সামুদ্রিক মাছ আয়োডিনের উৎকৃষ্ট উৎস যা বুদ্ধি ও বিকাশে সাহায্য করে এবং বিপাক ক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রণ করে শক্তি প্রদানে সাহায্য করে।
সাধারণত মাছে সোডিয়াম কম ও পটাশিয়াম তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় হাইপ্রেশারের রোগীদের জন্য যেমন ভালো তেমনই দেহের ইলেকট্রোলাইট ব্যালান্স ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
মাছে সংযোগ কলার পরিমাণ বেশ কম হওয়ায় রান্নাও যেমন সহজে হয়, তেমনই হজমও তাড়াতাড়ি হয়।
যাঁদের হজমের সমস্যা আছে বা কনস্টিপেশন আইবিএস-এর সমস্যা আছে, মাছ তাঁদের জন্যও অত্যন্ত উপযোগী।
একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে বাঙালিরা গড়ে প্রায় ৬০-৭০ রকমের মাছ খায়। স্বাদ ও গন্ধের বৈচিত্র্য থাকায় নানা ধরনের মাছ নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রান্না করে খেতে পারলে যেমন একঘেয়েমি আসে না তেমনই উপকারও অনেক বেশি পাওয়া যায়।
ছোট কাঁটাযুক্ত মাছে ক্যালশিয়ামের পরিমাণ বেশ বেশি। কাঁটাওলা মাছ চিবিয়ে রসটা খেলে দাঁত ও হাড়ের গঠনের পাশাপাশি রক্ত সঞ্চালন ও পেশি সংকোচনের স্বাভাবিক কাজকর্মে সাহায্য হয়।
আর্থ্রাইটিস ও বাত ব্যথার প্রকোপ কম রাখতে হলে নিয়মিত ডায়েটে কিছু পরিমাণ মাছ রাখতেই হবে।
মাছে ক্যালরির পরিমাণ কম থাকায় ডায়েটারদের ডায়েটে মাছ রাখা খুব দরকার। দীর্ঘক্ষণ পেট ভরে থাকার পাশাপাশি স্যাটাইটি ফিলিং হয় ফলে বাড়তি খেয়ে ফেলার প্রবণতাও অনেক কম থাকে রোজ ডায়েটে মাছ রাখা হলে।
রোজ মাছ খেতে হলে কোন কোন মাছ খাদ্য তালিকায় রাখবেন?
সাধারণত আঞ্চলিক সহজলভ্যতা, পারিবারিক সংস্কৃতি, মাছের দাম ও ব্যক্তি বিশেষের স্বাদের তারতম্যের ওপর মাছ খাওয়াটা ভীষণভাবে নির্ভরশীল। যদিও এখন গ্লোবালাইজেশনের যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের মাছ পাওয়া যায়, তবুও আঞ্চলিক সহজলভ্যতাকে অস্বীকার করা যায় না। যেমন সমুদ্রের উপকূলবর্তী এলাকায় পমফ্রেট, স্যালমন, টুনা, ম্যাকরেল, সার্ডিন, বিশেষ প্রজাতির কিছু চিংড়ি ইত্যাদি বেশি পাওয়া যায়। তেমনই খাল, বিল, নদী, পুকুর, ডোবা, ঝিল বা ভেড়ির মাছ হিসেবে রুই, কাতলা, বাটা, মৃগেল, ল্যাটা, মৌরলা, শিঙ্গি, মাগুর, তেলাপিয়া, পাবদা, পার্শে, ট্যাঙরা, বেলে, কই, পুঁটি ইত্যাদি সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ মাছ আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার এক অপরিহার্য অংশ। আবার বিশেষ বিশেষ স্থানে বিশেষ কিছু স্থানীয় মাছ অত্যন্ত জনপ্রিয়, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। যেমন নর্থবেঙ্গলে থাকার সময়ে আমি যে বোরলি মাছ খেয়েছিলাম তা আর এখানে পাই না। আবার বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত সব ধরনের মাছের ওপরেই যে প্রভূত গবেষণা হয়েছে এমনটাও নয়।
রোজ খাওয়া হলে কোন কোন মাছের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এইসব মাছের পুষ্টিগুণ কী? অথবা কোন কোন অসুখে চলতে পারে এইসব মাছ—সে সব দেখে নেওয়া যাক একনজরে।
রুই মাছ: কথাতেই আছে মাছের সেরা রুই, শাকের সেরা পুঁই। শুধু যে স্বাদের নিরিখেই রুই মাছকে এমন তালিকার শীর্ষে রাখা হয়েছে তা নয়। অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এই মাছে পাওয়া যায় হাই-বায়োলজিক্যাল ভ্যালুর উন্নতমানের প্রোটিন, বি-ভিটামিনস, আয়রন, জিঙ্ক, ক্যালশিয়াম, ভিটামন সি, ভিটামিন-ডি এবং কিছু পরিমাণ ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড। অত্যন্ত সহজপাচ্য হওয়ায় শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের জন্যই রুই মাছ আদর্শ।
কারা খাবেন এই মাছ—ডায়াবেটিস, হাই ব্লাডপ্রেশার, অ্যাথেরোস্ক্লেরসিস, হার্টের অসুখ, অস্টিওপোরোসিস, অ্যাজমা, নার্ভের অসুখ, ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম, ওবেসিটি ইত্যাদি সমস্যা থাকলেও সহজেই খাওয়া যাবে রুই মাছ। এছাড়া বিভিন্ন বয়সি সুস্থ মানুষদের জন্য এই মাছ উপযুক্ত।
২) কাতলা মাছ: রুই মাছের পরেই অত্যন্ত সুস্বাদু ও জনপ্রিয় এই মাছে ফ্যাট ও প্রোটিন কনটেন্ট রুইমাছের তুলনায় সামান্য বেশি। পাশাপাশি ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও বি-ভিটামিনের উৎকৃষ্ট উৎস কাতলা মাছ। কাতলা মাছে সামান্য পরিমাণে ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে বলে রোগ প্রতিরোধে সাহায্যকারী।
কারা কারা খেতে পারেন কাতলা মাছ—অ্যানিমিয়া, আর্থ্রাইটিস, অ্যালঝেইমার্স, অস্টিওপোরোসিস, নিউরাল ডিস-অর্ডার, ডায়াবেটিস, আন্ডারওয়েট ও প্রেগনেন্সিতে দারুণ উপকারী এই মাছ।
কারা খাবেন না—বদহজম, অ্যাসিডিটি ও লিভারের সমস্যা বা কিডনির সমস্যা থাকলে চলবে না এই মাছ।
৩) মৃগেল মাছ: মৃগেল মাছে ক্যালরি ও ফ্যাট কনটেন্ট কম এবং ক্যালশিয়াম যথেষ্ট বেশি, ১০০ গ্রামে প্রায় ৬৮০ মিগ্রা। এছাড়া আছে ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড।
কারা মৃগেল মাছ খেতে পারেন: যাঁদের হজম সংক্রান্ত সমস্যা আছে। আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস, হার্টের রোগ, লিভারের অসুখ, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম, ডায়াবেটিস বা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি তাঁরা স্বচ্ছন্দে এই মাছ খেতে পারেন, তবে অবশ্যই মাত্রা মতো।
৪) পাবদা মাছ: অত্যন্ত সুস্বাদু কুলীন গোত্রীয় এই মাছ নিয়মিত খাদ্য তালিকার পাশাপাশি উৎসব অনুষ্ঠানেও দিব্যি স্থান করে নিয়েছে। প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন সমৃদ্ধ এই মাছে ক্যালশিয়াম, ফসফরাস ও আয়রন থাকে। ১০০ গ্রাম পাবদা মাছ থেকে প্রায় ১০৬ কিলোক্যালরি শক্তি এবং ২.৪ গ্রাম ফ্যাট থাকে।
কাদের জন্য পাবদা মাছ অত্যন্ত উপকারী—হাইব্লাড প্রেশার, আন্ডার ওয়েট, অস্টিওপোরোসিস, কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যালঝেইমার্স, পারকিনসন্স ডিজিজ, কোলাইটিস, ডিসপেপসিয়া, অ্যানেমিয়া ইত্যাদি রোগ এমনকী ক্যান্সার রোগীর পথ্যেও রাখা যায় এই মাছ। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই খেতে পারেন এই মাছ।
৫) পার্শে মাছ: জিরে বাটা দিয়ে বাংলার পার্শে মাছের ঝোল শুধু যে লোকসংস্কৃতিতে স্থান করে নিয়েছে তাইই নয়, সুস্বাদু এই মাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ইত্যাদি থাকে। পার্শে মাছে ফ্যাট ও ক্যালরির মাত্রা সাধারণ রুই মাছের তুলনায় সামান্য বেশি হলেও অত্যন্ত উপকারী।
কোন কোন অসুখে চলতে পারে পার্শে মাছ—আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস, অ্যানেমিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, টিউবারকুলোসিস, হাইফিভার ও ক্যান্সারেও চলতে পারে তাজা পার্শে মাছের হালকা পাতলা ঝোল। সুস্থ মানুষেরা নিয়মিত এই মাছ খেতে পারেন।
৬) বাটা মাছ: কম ক্যালরি যুক্ত ক্যালশিয়াম সমৃদ্ধ এই মাছে খুব সহজপাচ্য উন্নত মানের প্রোটিন থাকায় সুস্থ-অসুস্থ, শিশু-বৃদ্ধ সকলের জন্যই অত্যন্ত উপকারী।
কোন কোন অসুখে পথ্য বাটা মাছ—হার্টের অসুখ, হাই ব্লাডপ্রেশার, ডায়াবেটিস, হাইপারলিপিডেমিয়া, ক্যান্সার, আর্থ্রাইটিস, হাইফিভার, জন্ডিস, টাইফয়েড, কোলাইটিস, অ্যানিমিয়া, ডায়েরিয়া, ওবেসিটি ইত্যাদি অসুখে চলতে পারে এই মাছ।
৭) বেলে মাছ: ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও বি-ভিটামিনস সমৃদ্ধ এই মাছে ক্যালরি ও ফ্যাটের পরিমাণ বেশ কম হলেও উন্নত মানের প্রোটিন আছে।
কোন কোন অসুখে চলতে পারে এই মাছ—ডায়াবেটিস, ওবেসিটি, হজম ও বিপাক সংক্রান্ত সমস্যা, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম-এর সমস্যা থাকলে স্বচ্ছন্দে চলতে পারে এই মাছ। সুস্থ মানুষেরাও রোজই খেতে পারেন এই মাছ।
৮) কই মাছ: অত্যন্ত সুস্বাদু এই মাছে ক্যালরি ও ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালশিয়াম, ফসফরাস ও আয়রন থাকে। তবে উপকার পেতে হলে অত্যন্ত সহজপাচ্য উপায়ে কম তেল মশলাসহ রান্না করাই শ্রেয়।
কোন কোন রোগে চলতে পারে—অ্যানেমিয়া, আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস, আন্ডারওয়েট ইত্যাদি রোগে চলতে পারে এই মাছ।
তবে হজমের সমস্যা থাকলে এই ফ্যাট যুক্ত মাছ অ্যাভয়েড করাই ভালো।
৯) ফলুই মাছ: ফলুই মাছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও সহজপাচ্য প্রোটিন থাকে। কাঁটা সমৃদ্ধ এই মাছ যেমন সুস্বাদু তেমনই সুস্থ-অসুস্থ সবার জন্যই উপযুক্ত।
ফলুই মাছের উপকারিতা— অ্যানিমিয়া, মাংসপেশির দুর্বলতা, হজমের গোলমাল, অরুচি, অস্টিওপোরোসিসসহ বহু অসুখেই চলতে পারে এই মাছ।
১০) শিঙ্গি মাছ: অনেকেই শিশুদের খাওয়ানোর জন্য অনেক দাম দিয়েও আয়রন, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস ও হাইপ্রোটিন যুক্ত সহজপাচ্য শিঙ্গি মাছ কিনে থাকেন। এই মাছে ফ্যাটের পরিমাণ বেশ কম। তবে শিঙ্গি মাছের বদলে অন্যান্য অনেক সহজপাচ্য মাছও বাচ্চাদের জন্য আদর্শ।
বহু-রোগের পথ্য শিঙ্গি মাছ। আলসার, জন্ডিস, জ্বর-জারি, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস, আইবিএস, কোলাইটিস, এজ রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, অ্যানিমিয়া, টিউবারকুলোসিস, অ্যাজমা থেকে শুরু করে বহু রোগের পথ্য হতে পরে এই মাছ।
১১) মাগুর মাছ: অসুস্থ রোগীর পথ্য হিসেবে মাগুর মাছের হালকা ঝোল খাওয়ার প্রচলন আছে। এই মাছে ক্যালরির পরিমাণ কিছুটা কম হলেও ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম, সেলেনিয়াম ও ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
কোন কোন রোগে পথ্য মাগুর মাছ—হাইপ্রেশার, হার্টের অসুখ, ডায়াবেটিস, আলসার, হজমের সমস্যা, অ্যাথেরোস্ক্লেরসিস, ক্রনিক ফিভার, অ্যানেমিয়া, জন্ডিস, শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের ডায়েটে অনায়াসেই রাখা যায় এই মাছ।
১২) পোয়া মাছ: বাংলাদেশের মোহনা এবং বঙ্গোপসাগরে প্রাপ্ত এই মাছকে অনেকেই পামা, কই ভোলা বা পোয়া বলে। উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ এই মাছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ডি, ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকায় হৃদরোগ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
কোন কোন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে— হার্ট অ্যাটাক, হাইপারলিপিডেমিয়া, আর্থ্রাইটিস, ক্যাটারাক্ট, অ্যালঝেইমার্স, ডিমেনশিয়া, অস্থি সংক্রান্ত কিছু সমস্যা ইত্যাদি রোগে চলতে পারে এই ভোলা মাছ।
১৩) শোল মাছ: শোল মূলা, আমশোল, শোল মাছের রসা বা কালিয়ার বিভিন্ন অতি উপাদেয় রেসিপির সঙ্গে বহু বাঙালিই বিশেষভাবে পরিচিত। মিষ্টি জলের এই মাছের ক্যালরির পরিমাণ বেশ কম, অন্যদিকে ক্যালশিয়াম, আয়রন, ভিটামিন ডি ও উন্নত মানের প্রোটিন যথেষ্ট মাত্রায় থাকায় বিভিন্ন অসুখের মোকাবিলায় সাহায্য করে। শোল মাছে এছাড়াও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে।
কোন কোন রোগে শোল মাছ উপযুক্ত— হজম সংক্রান্ত অসুখ, ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ, ডিসপেপসিয়া, গ্যাসট্রাইটিস, জ্বরজারি, ফুসফুসের সংক্রমণ, জন্ডিস, টাইফয়েড, কনস্টিপেশন, অ্যানেমিয়া, টিউবারকুলোসিস ইত্যাদি বহু রোগে চলতে পারে শোল মাছ।
১৪) বোয়াল মাছ: মিষ্টি জলের অত্যন্ত সুস্বাদু এই মাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ছাড়াও ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে। ১০০ গ্রাম বোয়াল মাছের ক্যালরি মাত্রা প্রায় ১০৪ কিলোক্যালরি অর্থাৎ অতিরিক্ত তৈলাক্ত হলেও ক্যালরিমাত্রা সম ওজনের রুই মাছের সঙ্গে তুল্যমূল্য।
কারা এই মাছ খেতে পারেন— আন্ডারওয়েট মানুষজন, অ্যানিমিয়া ও স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম তাদের ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে চলতে পারে এই মাছ। সুস্থ মানুষজনের ক্ষেত্রে কোনও অসুবিধা নেই।
কারা খাবেন না বোয়াল মাছ— এই মাছে ফ্যাটের পরিমাণ একটু বেশি থাকায় শিশু, গর্ভবতী মা ও দুর্বল হজমশক্তি সম্পন্ন মানুষজন, ইনফ্লুয়েঞ্জা, অ্যালার্জি ও ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের সমস্যা থাকলে মোটেই খাবেন না এই মাছ।
১৫) ভেটকি মাছ: অত্যন্ত সুস্বাদু ভেটকি মাছের পাতুরি, ফিশফ্রাই, তেলঝাল, ভাপা বা কালিয়ার সঙ্গে বাঙালিমাত্র সবারই প্রায় কমবেশি পরিচয় আছে। উন্নত মানের প্রোটিন, ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড ছাড়াও ভেটকি মাছে ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও জিঙ্ক ইত্যাদি বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। উপরন্তু ভেটকি মাছে টোটাল ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশ কম হওয়ায় পকেট পারমিট করলে নিয়মিত ডায়েটে রাখলে বেশ উপকার পাবেন।
কোন কোন শারীরিক সমস্যায় চলতে পারে ভেটকি মাছ— বিভিন্ন অসুখ-বিসুখের প্রতিরোধ ও প্রতিকার উভয়ক্ষেত্রেই ভেটকি মাছের বিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। ভেটকি মাছের ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধে বিশেষ কার্যকরী। এছাড়াও ভেটকি মাছের বিশেষ অ্যান্টি থ্রম্বোটিক প্রপার্টি থাকায় রক্তনালীর মধ্যে রক্তজমাট বাঁধার প্রবণতা কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। ডায়াবেটিস, অ্যানেমিয়া, নিউরাল ডিসঅর্ডার, অস্টিওপোরোসিস, অপুষ্টি, টিউবারকুলোসিস, ক্যাটারাক্ট, ইনফ্ল্যামেটারি বাওয়েল ডিসঅর্ডার, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, ডিপ্রেশন ইত্যাদি রোগের পথ্য হিসেবেও চলতে পারে ভেটকি মাছ।
১৬) ইলিশ মাছ: বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হলেও বাংলা ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন স্থানে ইলিশ মাছ অত্যন্ত জনপ্রিয়। স্বাদ, গন্ধ ও রূপে অতুলনীয় এই মাছকে যে কত রকমভাবে রান্না করা যায় তা এককথায় বলে বোঝানো যায় না। কাঁটাযুক্ত হলেও অত্যন্ত সুস্বাদু এই মাছ। জীবনের বেশকিছুটা সময় সমুদ্রে কাটানোর ফলে ওমেগা-থ্রি জাতীয় অত্যন্ত উপকারী পলি-আনস্যাচুরেডেট ফ্যাটি অ্যাসিডের গুণে সমৃদ্ধ। উন্নতমানের প্রোটিন, ফ্যাট, ক্যালশিয়াম, আয়রন, বি-ভিটামিনস, জিঙ্ক ইত্যাদি পুষ্টি উপাদানের গুণে সমৃদ্ধ সুস্বাদু এই মাছ।
কোন কোন রোগে চলতে পারে ইলিশ মাছ— হার্টের রোগ থেকে ডায়াবেটিস, অ্যানেমিয়া থেকে হাইপারটেনশন অথবা আর্থ্রাইটিস, অ্যাজমা, অ্যারিদমিয়া, সোরিয়াসিস, অস্টিওপোরোসিস, অ্যালঝেইমার্স, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, ডিপ্রেশন, অ্যাকনে, সিওপিডি, ডিমেনশিয়া, অ্যানোরেক্সিয়া নার্ডোসা ইত্যাদি রোগে যেমন মাত্রা মাফিক ইলিশ মাছ চলতে পারে, তেমনই সুস্থ মানুষদের জন্যে এই মাছ অত্যন্ত উপকারী।
কারা কারা খাবেন না ইলিশ মাছ: ডায়েরিয়া, গাউট, আর্থ্রাইটিস, হাইপারলিপিডেমিয়া বা লিভারের অসুখের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ইলিশ মাছ না খাওয়াই ভালো। যাঁদের হার্টের রোগ বা ফ্যাট রেস্ট্রিকশন আছে তাঁরাও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো মাসে ১০০-২০০ গ্রামের বেশি ইলিশ মাছ খাবেন না। খুব বয়স্ক মানুষজন যাঁদের হজমের গোলমাল আছে তাঁদের জন্যেও উপযুক্ত নয় এই হাইক্যালরি, হাইফ্যাটযুক্ত মাছ।
১৭) পমফ্রেট মাছ: সুস্বাদু সামুদ্রিক এই মাছ সারাবছরই জনপ্রিয় তবে শীতকালে পমফ্রেটের স্বাদই আলাদা। এই মাছে ফ্যাট ও ক্যালরির পরিমাণ বেশ কম হলেও যথেষ্ট পরিমাণে প্রোটিন, আয়োডিন, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস ও বি-ভিটামিনস থাকে। পমফ্রেট মাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হার্টহেলদি ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
কোন কোন রোগে চলতে পারে এই মাছ— সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ সপ্তাহে ২-৩ দিন এই মাছ খেতে পারেন। বয়স, কার্যক্ষমতা ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী কতটা মাছ খাবেন, তা ডায়েটিশিয়ানের থেকে জেনে নিন। টাইপ টু ডায়াবেটিস, কার্ডিয়াক ডিজিজ, হাইপার লিপিডেমিয়া, ওবেসিটি, সোরিয়াসিস, অস্টিওপোরোসিস, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম, পারকিনসন্স, ডিপ্রেশন, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন ইত্যাদি রোগে এই মাছ অত্যন্ত উপকারী।
১৮) চিংড়ি মাছ: নদী, পুকুর, সমুদ্র ইত্যাদি উৎসস্থান থেকে প্রায় কয়েকশো প্রজাতীর চিংড়ি মাছ বা এই বিশেষ জলজ প্রাণী সারা পৃথিবীতেই অত্যন্ত জনপ্রিয়। মোটামুটি ১০০ গ্রাম চিংড়ি মাছে প্রায় ৮৯ কিলোক্যালরি শক্তি এবং ১৯.১ গ্রাম প্রোটিন থাকে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয়রন, ফসফরাস, সেলেনিয়াম, ক্যালশিয়াম, ভিটামিন বি১২ ইত্যাদি ছাড়াও সামুদ্রিক চিংড়িতে থাকে অ্যাসথাজ্যানথিন নামক বিশেষ এক ধরনের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস, যা চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে দারুণ উপকারী। এর সেলেনিয়াম ও জিঙ্ক বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে, বিপাক ক্রিয়া ভালো রাখে। পর্যাপ্ত আয়রন থাকায় অ্যনিমিয়া বা রক্তহীনতায় যাঁরা ভুগছেন তাঁদের জন্যেও উপকারী এই মাছ। হাইপোথাইরয়েডিজম এবং ওবেসিটিতেও উপকারী এই মাছ। টাইপ-টু ডায়াবেটিসেও চলবে এই মাছ। আমাদের নখ, দাঁত, চুল, হাড় ও রক্তসঞ্চালন ভালো রাখতে সাহায্য করে চিংড়ি মাছ এবং ওমেগা-থ্রি থাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
কাদের জন্য উপযুক্ত নয়— অ্যালার্জি যাঁদের আছে তাঁরা মোটেই এই মাছ খাবেন না। এতে হিস্টামিন জাতীয় যৌগ থাকায় সামান্য পরিমাণে শরীরে ঢুকলেও হতে পারে শ্বাসকষ্ট, ত্বকের প্রদাহ, চোখের সমস্যা ইত্যাদি। অ্যানাফাইলেটিক শকের মতো মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও হাইপারলিপিডেমিয়া, হার্টের অসুখ, হাইপ্রেশার বা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে চিংড়ি মাছ খেতে হলে অবশ্যই ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ মেনে খাবেন।
১৯) চিতল মাছ: চিতল মাছের ‘মুইঠ্যা’ বাঙালির রসনাবিলাসকে পরিতৃপ্ত করে। স্বাদের পাশাপাশি পুষ্টিগুণের বিচারেও এই মাছ অনন্য। ১০০ গ্রাম চিতল মাছে প্রায় ১০৮ কিলোক্যালরি শক্তি, ১৮.৬ গ্রাম উন্নত মানের প্রোটিন ও ২.৩ গ্রাম ফ্যাট থাকে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয়রন, ক্যালশিয়াম পটাশিয়াম ছাড়াও এই মাছে কোলিনের পরিমাণ বেশ বেশি থাকায় স্বাস্থ্যকর।
কোন কোন রোগে উপযুক্ত এই মাছ— অ্যানিমিয়া, প্রোটিন এনার্জি ম্যালনিউট্রিশন, অ্যালঝেইমার্স, হাই ব্লাডপ্রেশার, হার্টের অসুখ, মনোযোগের অভাব, ডিপ্রেশন, ক্যান্সার ইত্যাদি বিভিন্ন রোগে যেমন উপযুক্ত তেমনই বিভিন্ন বয়সি সুস্থ মানুষজনও নিয়মিত ডায়েটে রাখতে পারেন এই মাছ।
২০) কাজলি মাছ: অত্যন্ত সুস্বাদু ঝকমকে রুপোলি রঙা মিষ্টি জলের এই মাছের প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ১৮ গ্রাম প্রোটিন ও ৪.১ গ্রাম ফ্যাট থাকে। আয়রন, ক্যালশিয়াম, ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ হয় এই মাছ।
কাজলি মাছের উপকারিতা— উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, অস্টিওপোরোসিস, বাতের ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, চোখের বিভিন্ন অসুখে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এই মাছ। সুস্থ-অসুস্থ সবার জন্যেই উপযুক্ত এই মাছ। তবে এই মাছে যেহেতু ফ্যাটের পরিমাণ সামান্য বেশি তাই কম তেলে রান্না করা উচিত।
২১) মৌরলা মাছ: খাল, বিল, ডোবা, নদী, পুকুর ইত্যাদি স্থানে পাওয়া যায় বাঙালির অতিপ্রিয় সুস্বাদু এই মাছ। ক্যালশিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন-এ ও ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যুক্ত এই মাছ নিয়মিত খেলে হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্য মজবুত হয়, দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকে, রক্তাল্পতা দূর হয় ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
২২) পুঁটি মাছ: অত্যন্ত সুস্বাদু কাঁটাওলা, মিষ্টিজলের এই মাছের ১০০ গ্রামে প্রায় ১১০ কিলোক্যালরি শক্তি ও ১৮.১ গ্রাম প্রোটিন থাকে। সরপুঁটি মাছে ফ্যাট ও ক্যালরির পরিমাণ অবশ্য কিছু বেশি।
কারা খেতে পারেন এই মাছ— আন্ডার ওয়েট, প্রোটিন এনার্জি ম্যালনিউট্রিশন, বাড়ন্ত বাচ্চা, গর্ভবতী মায়েদের জন্যে উপযুক্ত এই মাছ।
২৩) আমোদি মাছ: প্রোটিন সমৃদ্ধ এই মাছ ছোটবড় সকলের জন্যেই বেশ উপযুক্ত। দেহের বৃদ্ধি, বিকাশ, ক্ষয়পূরণ ও রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে এই ছোট মাছ।
ওমেগা-থ্রি জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ: সার্ডিন, স্যামন, টুনা, হেরিং কড ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছে প্রোটিন, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, আয়োডিন, সালফার, সেলেনিয়াম, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ডি, ভিটামিন-বি১২ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণে পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-থ্রি জাতীয় পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে ম্যাজিক্যাল হেলথ বেনিফিট আছে।
কোন কোন রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সাহায্য করে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ— হার্ট ডিজিজ, হাইপারলিপিডেমিয়া, কিডনি, ব্রেস্ট-ব্লাডার-স্টমাক-প্রস্টেট ক্যান্সার, বিভিন্ন ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ, টাইপ-টু ডায়াবেটিস, অ্যালঝাইমার্স, ইনসমনিয়া, ডিপ্রেশন, পারকিনসন্স, মালটিপল স্কুলেরসিস, সোরিয়াসিস, এজরিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, স্নায়বিক অসুস্থতা, ফুসফুসের প্রদাহ এবং ত্বক ও চুলের বিভিন্ন সমস্যা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সাহায্য করে সামুদ্রিক মাছ।
এইসব উপকারী সামুদ্রিক মাছ সপ্তাহে ২-৩ দিন মাত্র ৫০ গ্রাম করে ডায়েটে রাখা গেলেই উপকার পাওয়া যাবে। তবে এক্ষেত্রে খুব বড় মাছ অথবা দীর্ঘদিন ধরে বরফে সংরক্ষিত মাছ খাবেন না।
কোন বয়সে কতটা মাছ খাওয়া ভালো?
মাছ অত্যন্ত উপকারী প্রোটিন জাতীয় খাবার, যা সুষম আহারের একটা অত্যাবশ্যক উপাদান। কিন্তু কোন বয়স থেকে শিশুদের মাছ খাওয়ানো যেতে পারে অথবা কোন বয়সের মানুষজন কতটা মাছ খেতে পারেন সে ব্যাপারে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক।
১-৩ বছর বয়সি শিশুদের কতটা মাছ খাওয়াবেন?
আইসিএমআর (ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিক্যাল রিসার্চ)-এর পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে শিশুর ৭-৮ মাস বয়স থেকেই ওজন অনুযায়ী দৈনিক ১ চা চামচ করে কাঁটা বাছা সুসিদ্ধ মাছ দেওয়া যায়। আস্তে আস্তে সেই পরিমাণ বেড়ে শিশুর তিন বছর বয়স হলে দৈনিক ৪০-৫০ গ্রাম কাঁটা বাছা/ কাঁটাবিহীন সুস্বাদু, সহজপাচ্য মাছ দেওয়া উচিত।
৪-১০ বছর বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে কতটা মাছ প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন: এই বয়সি শিশুদের বিভিন্ন পুষ্টিদ্রব্য বিশেষত প্রোটিন ও ভিটামিন-এ এর অভাবজনিত অসুস্থতা দূর করার জন্যে সাধারণ ভাত, ডাল, শাকসব্জি, ফলমূল, দুধযুক্ত ব্যালান্স ডায়েটে ৫০-৭৫ গ্রাম পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের মাছ রাখা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি এই বয়সি বাড়ন্ত বাচ্চাদের যদি সপ্তাহে ২ দিন অন্তত ৫০ গ্রাম মাত্রায় বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ খাওয়ানো হয় তাহলে বাচ্চাদের স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে, বাড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
১১-১৮ বছর বয়সিরা রোজ কতটা মাছ খেতে পারেন:
শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়সে পৌঁছনোর মাহেন্দ্রক্ষণ এই বয়ঃসন্ধিতে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিগত চাহিদারও বিশেষ পরিবর্তন ঘটে। শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা। এইসময় ছেলেমেয়েদের ক্যালশিয়াম, প্রোটিন, আয়রন, ক্যালরি, আয়োডিন, জিঙ্ক, বি-ভিটামিনস ইত্যাদি পুষ্টি উপাদানের চাহিদা মেটানোর জন্যে ব্যালান্সড ডায়েটের এক অন্যতম উপাদান মাছ। দৈনিক ৪৫-৬৫ গ্রাম প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্যে প্রতিদিনের ডায়েটে ৭০-৭৫ গ্রাম মাত্রায় রুই, কাতলা, মৃগেল, শোল, বাটা, বেলে, মৌরলা, কাজলি, ট্যাংরা, পাবদা, গুরজালি, চাপলা, চেলা, কাচকি, ভেটকি, সুরমাই, চিতল, ফলুই, পমফ্রেট, ইলিশ, আড়, ভাঙর ইত্যাদি যে কোনও মাছই বয়সন্ধিতে উপযুক্ত।
এর মধ্যে সপ্তাহে ২-৩ দিন অন্তত সার্ডিন, স্যামন, ম্যাকরেল, টুনা, লোটে, পমফ্রেট ইত্যাদি মাছ অন্তত ৫০-৬০ গ্রাম মতো খাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ইকোসাপেন্টানোয়িক অ্যাসিড এবং ডোকোসাহেক্সানোয়িক অ্যাসিডের অভাব হয় না। ফলে দেহে এনার্জি লেভেল বাড়ে, মনঃসংযোগ, বুদ্ধিবৃত্তি ও দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটে। সক্রিয় থাকে থাইরয়েড গ্রন্থিও। বেসাল মেটাবলিক রেট ঠিক থাকায় ওজন বাড়ার প্রবণতাও কম থাকে।
প্রাপ্তবয়স্ক (১৯-৬০ বছর) মানুষদের দৈনিক কতটা মাছ খাওয়া উচিত: ১৮ বছর বয়সের পর থেকে দেহের বৃদ্ধি ও বিকাশ সেভাবে না হলেও দেহের অভ্যন্তরীণ ও শারীরবৃত্তীয় কাজকর্ম, রোগপ্রতিরোধ ও ক্ষয়পূরণের জন্য প্রতি কেজি আদর্শ দেহভারের ১ গ্রাম/ কেজি হিসেবে ৬০-৭৫ গ্রাম প্রোটিন দরকার। আর এই প্রোটিনের অতি উৎকৃষ্ট উৎস হল মাছ। স্বভাবতই এই পুরুষ বা মহিলারা যদি হেভি ওয়ার্কআউট বা স্পোর্টস এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন তবে ব্যক্তি বিশেষের বয়স, ওজন, উচ্চতা, শারীরিক অবস্থা এবং কর্মক্ষমতা অনুযায়ী প্রোটিন চাহিদাও বেড়ে ৭৫-১০০ গ্রাম হতে পারে। ইয়াং অ্যাডাল্টরা এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ সাপেক্ষে দৈনিক সর্বাধিক ১২৫ গ্রাম পর্যন্ত প্রোটিন নিতে পারেন। গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের জন্যেও প্রোটিন চাহিদা বাড়ে। এক্ষেত্রে সামুদ্রিক, নদী, পুকুর বা অন্যান্য জলাশয়ের বিভিন্ন মাছই অত্যন্ত উপকারী। সাধারণ অবস্থায়



