নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কলকাতা পুরসভার মেয়র পদ ছাড়ছেন ফিরহাদ হাকিম? এই একটি প্রশ্নেই তৃণমূলের অন্দরে বুধবার টানাপোড়েন চলল দিনভর। সূত্রের খবর, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির থেকে তাঁকে পুরসভার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিতে চাপ দেওয়া হয়েছে। এবং এই বার্তা এসেছে বুধবার নবান্ন সভাঘরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে ফিরহাদ হাকিমের উপস্থিতির পর। জানা যাচ্ছে, এই ঘটনায় রীতিমতো অসন্তুষ্ট মমতা। এমনকি, মমতার বৈঠকে না এসে ফিরহাদ হাকিম নবান্ন থেকে সরাসরি কলকাতা পুরসভা চলে যাওয়ায় কালীঘাটে অসন্তোষ বাড়ে বলে খবর। তারপরই ফোনে ফিরহাদের সঙ্গে কথা বলেন মমতা। ওই বৈঠক সেরে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সামনে বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফিরহাদ হাকিমের কথা হয়েছে। উনি মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার বিষয়ে নেত্রীকে আগে একাধিকবার বলেছিলেন। নেত্রী এদিন অনুমতি দিয়েছেন।’ যদিও ফিরহাদের বক্তব্য, ‘পদত্যাগের বিষয়ে এখনও আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’ দু’তরফের এই মন্তব্যেই জল্পনা ছড়িয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি ‘প্রেশার ব্লক’-এর পালটা ‘প্রেশার’ এখানেও চলছে?
ববি হাকিমের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রে জানা যাচ্ছে, এদিন দলনেত্রীর সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। এবং যদি তাঁর পদত্যাগের পর দীর্ঘদিন দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো নেতাকে মেয়র হিসাবে বসানো হয়, তাহলে রাজ্য বিধানসভার মতোই নাটকীয় মোড় দেখা যেতে পারে কলকাতা পুরসভায়। তৃণমূল কাউন্সিলারদের একাংশ বলছে, ‘ববি দা’কে পদত্যাগ করতে হলে পুরসভাতেও আড়াআড়ি বিভাজন তৈরি হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাউকে মেয়র পদে বসাতে চাইলে, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে পালটা ‘মেয়র মুখ’ নিয়ে আসা হতে পারে।
সূত্রের খবর, নেত্রীর ‘বারণ’ উপেক্ষা করেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে গিয়েছিলেন ফিরহাদ। সেখানে ফিরহাদকে ‘মেয়র সাহেব’ বলে সম্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধায়কদের আসন থেকে উঠিয়ে মন্ত্রীদের পাশেই বসান। অগ্নিমিত্রা পাল থেকে শুরু করে অন্য মন্ত্রীরাও এসে ববির সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করে যান। এমনকি, মন্ত্রীদের বলতে না দিয়ে ফিরহাদকে বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দেন শুভেন্দু। সেখানে ফিরহাদ জানান, হাওড়ায় গঙ্গার তলায় একটি টানেল ও মেট্রোপলিটন-নিউটাউন ফ্লাইওভার তৈরির স্বপ্ন ছিল তাঁর। শোনার পর মুখ্যমন্ত্রী অফিসারদের সেগুলি ‘নোট’ করতে বলেন। তবে, শহরের বেআইনি নির্মাণ উষ্মা প্রকাশ করেছেন শুভেন্দু। এবং ভবিষ্যতে এই ইস্যুতে আরও সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছেন। যে নির্মাণগুলি নিয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে, সেগুলি ‘রেগুলারাইজড’ করতেও বলেছেন বলে বৈঠক সূত্রে খবর। নিউটাউন নিয়েও ফিরহাদের পরামর্শ নিয়েছেন শুভেন্দু। তৈরি হয়েছে এক পরিবর্তিত সৌজন্যের আবহাওয়া। বৈঠকের পর আলাদাভাবে ফিরহাদকে চা খাওয়ার অনুরোধও জানান মুখ্যমন্ত্রী। যদিও, কাজ থাকায় সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন ববি। চলে যান পুরসভায়।
তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ এদিন জানান, ‘ফিরহাদকে মমতা বলেছেন, পুরসভা কাজ করতে পারছে না। তুমিও ঠিকভাবে কাজ করতে পারছ না। কমিশনার চাইছেন, বিধায়কদের নিয়ে কাজ করবেন। তাই করুক।’ তারপরই কুণাল বলেন, ‘ফিরহাদ হাকিম আগেই মমতার কাছে মেয়র পদে ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন, তাতে উনি সম্মতি দিয়েছেন।’ তাতেই খবর রটে যায়, মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ববি। ঘনিষ্ঠ মহলে যদিও ফিরহাদ বলেছেন, ‘ইস্তফা দিইনি। আগামী কাল তেমন কিছু করার পরিকল্পনাও নেই।’
এদিকে নতুন খেলা শুরু হয়েছে কলকাতা পুরসভার অন্দরেও। সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তৃণমূলের একাংশের কাউন্সিলাররা। একটা বড় অংশ ঘুঁটি সাজাতে নেমে পড়েছেন। সূত্রের খবর, ববিকে চাপ দিয়ে পদত্যাগ করিয়ে মমতা শোভন চট্টোপাধ্যায়কে মেয়র পদে বসাতে চাইছেন। সেই ‘বাড়া ভাতে ছাই’ দিয়ে পালটা কাউন্সিলাররাও নতুন ‘মেয়র মুখ’ দাঁড় করাতে পারেন। অর্থাৎ যেভাবে রাজ্য বিধানসভায় তৃণমূল দু’ভাগ হয়েছে, তেমনই ছবি দেখা যেতে পারে পুরসভায়। যদিও রাজনৈতিক মহলের মতে, এতদিন মেয়র পরিষদের বৈঠক কিংবা পুরসভার অধিবেশন করা যায়নি। তবে হাইকোর্ট পুর কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছে। বলেছে, এই পুর-মাসিক অধিবেশন করতেই হবে। এক্ষেত্রে চেয়ারপার্সন শেষ কথা। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ফের ‘কাজের পরিবেশ’ ফিরে আসতে পারে। তাই, ফিরহাদ শেষ পর্যন্ত ইস্তফা দেন কি না, এখন সেটাই দেখার।