Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / খেলা

মাস্টারদা এবং মোহন বাগানই আমাদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন

নিশুতি রাত। উত্তরপাড়ার রাম ঘাট জনশূন্য। মাঝেমধ্যে ঝিঁঝির ডাক ছাড়া চরাচর নির্জন। কানে আসে গঙ্গার কালো জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। অন্ধকার ফুঁড়ে হঠাৎ বেরিয়ে আসে এক ছায়ামূর্তি।

মাস্টারদা এবং মোহন বাগানই আমাদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন
  • ২৯ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০৫
Prefer us on Google

আজ মোহন বাগান দিবস। ১৯১১’র এই দিনে ইস্ট ইয়র্কশায়ারকে হারিয়ে প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে আইএফএ শিল্ড জেতেন শিবদাস ভাদুড়ি-বিজয়দাস ভাদুড়ি-অভিলাষ ঘোষরা। ফুটবল মাঠে স্বাধীনতার নান্দীপাঠ সেদিনই করেছিলেন তাঁরা। আর সেই উপলক্ষ্যে বর্তমানের পাঠকদের জন্য কলম ধরলেন অমর একাদশের অন্যতম মনমোহন মুখার্জির নাতনি।

Advertisement

মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায়: নিশুতি রাত। উত্তরপাড়ার রাম ঘাট জনশূন্য। মাঝেমধ্যে ঝিঁঝির ডাক ছাড়া চরাচর নির্জন। কানে আসে গঙ্গার কালো জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। অন্ধকার ফুঁড়ে হঠাৎ বেরিয়ে আসে এক ছায়ামূর্তি।   ঘাটের পাশেই জমাট অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা নৌকায় চেপে বসলেন আগন্তুক। আড়িয়াদহের ঘাটে তখন তাঁরই প্রতীক্ষায় সঙ্গীরা। পূর্ব শর্ত মেনে সেদিন যাত্রীর পরিচয় জিজ্ঞাসাও করেননি মাঝি। গন্তব্যে পৌঁছে তাঁকে আশীর্বাদ করে আগন্তুক বলে ওঠেন, ‘আমি মাস্টারদা সূর্য সেন। তোমার উপকার ভুলবো না কখনও।’ বন্দে মাতরম ধ্বনি তুলে আঁধারে মিশে গেলেন তিনি। মাঝি তখন বিহ্বল। নিঃশব্দে ঘাটের ধুলো মাথায় নিয়ে ফিরে এসেছিলেন বাড়িতে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মাস্টারদার কথা বলতেন সেদিনের মাঝি। অন্য কেউ নন, তিনিই আমার পিতামহ মনমোহন মুখার্জি। মোহন বাগান অমর একাদশের অন্যতম ফুটবলার। বুকে টগবগে দেশপ্রেম। সেদিন বিপ্লবী দলের অনুরোধেই নৌকা নিয়ে হাজির ছিলেন তিনি। আমার বাবা প্রয়াত বিমল মুখার্জিও মোহন বাগানের প্রাক্তন অধিনায়ক। ১৯৩৯ সালে ঐতিহাসিক লিগ জয় তাঁর নেতৃত্বে। আমার ছোট ভাই নিখিলও গায়ে চাপিয়েছে সবুজ মেরুন জার্সি। তবে চোটের কারণে অকালেই বেচারার ফুটবল কেরিয়ার শেষ হয়ে যায়। 
হুগলির উত্তরপাড়ায় বনেদি মানুষের বাস। আমাদের মুখার্জি বাড়ির বয়স প্রায় ১৫০। ছোটবেলায় দাদুর কোলেই আমার বিশ্বজয়। গঙ্গায় সাঁতার শেখাতে নিয়ে যেতেন তিনি। রাস্তায় আইএফএ শিল্ড জয়ী মনমোহন মুখার্জিকে দেখতে ভিড় উপচে পড়ত। শুধু ফুটবলার নয়, বেহালা বাদক হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। নৌকা চালানোতেও চ্যাম্পিয়ন। মোহন বাগান ট্রফি জিতলে উত্তরপাড়ার বাড়িতে আনন্দ করতেন সমর্থকরা। শৈলেন মান্না, গোষ্ঠ পালের মতো কিংবদন্তি মানুষের স্নেহস্পর্শে আমরা ধন্য।
মোহন বাগান আমাদের রক্তে। সবুজ-মেরুনেই জীবনের স্পন্দন। পুরানো বাড়ি ছোটখাটো মিউজিয়াম। স্মারক,  ঘড়ি, জার্সি বুক দিয়ে আগলে রেখেছে সবাই।  বাড়ির সামনে মনমোহন ও বিমল মুখার্জির আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। ২৯ জুলাই মোহন বাগান দিবসে সেখানে মাল্যদান করেন বিশিষ্টরা। জীবন সায়াহ্নেও মাস্টারদা এবং মোহন বাগানই আমাদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন। ঐতিহাসিক শিল্ড জয়ের ভোরে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। টাটকা ফুল হাতে দাদু, বাবার ছবির সামনে দাঁড়াই। প্রার্থনা করি মোহন বাগানের জন্য। তারার দেশ থেকে তাঁরা আশীর্বাদ করেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসা নিয়ে এভাবেই এগিয়ে চলুক আমাদের প্রিয় ক্লাব। সেই মন্দিরে আরও একবার প্রণাম করি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ