নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ইস্তফার হিড়িক চলছে। ময়না থেকে নন্দীগ্রাম, রামনগর থেকে কাঁথি—গোটা জেলায় কোণঠাসা নেতারা বিডিও অফিস ও এসডিও অফিসে গিয়ে পদত্যাগ করছেন। গত ৪ মে ভোটের ফল প্রকাশের পরই তৃণমূলের জেলা নেতারা উধাও। কেউ কেউ জার্সি বদলের মরিয়া চেষ্টা করেও ব্যর্থ। দুর্দিনে নেতাদের পাশে না পেয়ে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান, সদস্য, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিরা পদত্যাগ করছেন। তাঁদের অনেকেই পারিপার্শ্বিক চাপের মুখে পড়ছেন। এই বিপদের দিনে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে পাশে না পেয়ে চেয়ার ছেড়ে সরে দাঁড়ানোর মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার নন্দীগ্রাম-২ ব্লকের আমদাবাদ-১ পঞ্চায়েত প্রধান তৃণমূলের সুতপা রানা মান্না বিডিও অফিসে গিয়ে ইস্তফা দিয়েছেন। শুক্রবার ওই ব্লকের বিরুলিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূলের সদস্য মনোরঞ্জন ধাড়া বিডিও অফিসে ইস্তফা দেন। চাপের মুখে পড়ে পঞ্চায়েত প্রধান ইস্তফা দিয়েছেন বলে স্থানীয় নেতৃত্ব জানিয়েছেন। যদিও দলের পক্ষ থেকে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল না বলেও স্বীকার করে নিয়েছে অঞ্চল নেতৃত্ব। নন্দীগ্রাম-২ ব্লকে মোট সাতটি গ্রাম পঞ্চায়েতের আমদাবাদ-১ ও খোদামবাড়ি-১ পঞ্চায়েত তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে। আমদাবাদ-১ এর প্রধান ইস্তফা দেওয়ার খোদামবাড়ি-১পঞ্চায়েত প্রধানের উপরও সরে দাঁড়ানোর চাপ আসছে বলে শুক্রবার জেলা তৃণমূল সভাপতি সুজিত রায় জানিয়েছেন।
৪ তারিখ ভোটের ফল ঘোষণার পর পূর্ব মেদিনীপুরের পরাজিত একঝাঁক তৃণমূল প্রার্থী এলাকাছাড়া। যেমন, নন্দীগ্রামের পবিত্র কর, ভগবানপুরের মানব পড়ুয়া নিজেরা আপাতত অন্তরালে। তাঁদের মোবাইলও বন্ধ। তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে থাকা গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি দখল করার জন্য স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের একটা অংশ ওঠে পড়ে লেগেছে। এর জেরেই প্রতিদিন বিডিও অফিস কিংবা এসডিও অফিসে ইস্তফা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। কেউ কেউ বিজেপিতে ঢোকার আবেদন করছেন। তবে, তা পত্রপাঠ খারিজ হয়ে যাচ্ছে। আপাতত বিজেপির দরজায় খিল।
এর আগে ময়না পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি শেখ শাজাহান আলি, ভগবানপুর-১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অরূপসুন্দর পণ্ডা এবং রামনগর-১ পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি অম্বিকাচরণ জানা ইস্তফা দিয়েছেন। এছাড়াও নন্দীগ্রামের বয়াল-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান তথা পবিত্র করের স্ত্রী শিউলি কর, পঞ্চায়েত সদস্য পদ থেকে পবিত্র নিজে ইস্তফা দিয়েছেন। এরকম জেলায় একঝাঁক তৃণমূলের গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য বিডিও অফিসে গিয়ে ইস্তফা দিয়েছেন।
ভোটে শোচনীয় পরাজয়ের পর পূর্ব মেদিনীপুরের তৃণমূল নেতারা নিজেরাই নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত। নীচুতলার কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো উদ্যোগই তাঁদের নেই। তাই রোজদিন পদত্যাগের ঘটনা ঘটছে। এদিকে, জেলা পরিষদে সভাধিপতি উত্তম বারিক সহ অন্য কর্মাধ্যক্ষরা আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। একইভাবে বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রধানরা গরহাজির। এরফলে উচ্চশিক্ষায় যোগ দিতে যাওয়া পড়ুয়াদের ডোমিসাইল সার্টিফিকেট পেতে সমস্যা হচ্ছে।
শুক্রবার জেলা তৃণমূল সভাপতি সুজিত রায় বলেন, ‘গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতির প্রতিনিধিরা খুব চাপে রয়েছেন। অনেক জায়গায় পদত্যাগ করতে জোর করা হচ্ছে।’ বিজেপির জেলা সহ সভাপতি প্রলয় পাল বলেন, ‘পদত্যাগপত্রে কোনো সদস্য চাপের মুখে এই সিদ্ধান্ত বলে জানাচ্ছেন না। তৃণমূল ভোটে হেরে যাওয়ার পর তাঁরা নৈতিক পরাজয় স্বীকার করে সরে দাঁড়াচ্ছেন। মানুষ সঙ্গে না থাকলে পঞ্চায়েত চালানো সম্ভব নয়। সেটা বুঝতে পেরেই নিজেরা সরে দাঁড়াচ্ছেন। এখানে বিজেপির কোনো ভূমিকা নেই।’