Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

তৃতীয় ব্যক্তি থেকে তিক্ত দাম্পত্য

দু’জনের সঙ্গ— তৃতীয় এলেই সুরভঙ্গ! সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে নানা দিক নিয়ে আলোচনা করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন প্রধান ও মনোবিদ ডঃ নীলাঞ্জনা সান্যাল। কথা বললেন অন্বেষা দত্ত।

তৃতীয় ব্যক্তি থেকে তিক্ত দাম্পত্য
  • ২৪ মার্চ, ২০২৫ ১৬:০৩
Prefer us on Google

দু’জনের সঙ্গ— তৃতীয় এলেই সুরভঙ্গ! সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে নানা দিক নিয়ে আলোচনা করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন প্রধান ও মনোবিদ ডঃ নীলাঞ্জনা সান্যাল। কথা বললেন অন্বেষা দত্ত।

Advertisement

তৃতীয় ব্যক্তির অনুপ্রবেশে দাম্পত্যে তাল কাটতেই পারে। সেই ওঠাপড়া নিয়ে বেশিদিন হয়তো সম্পর্ক বয়ে নিয়ে চলা যায় না। তবে এমন হতেও পারে তৃতীয় ব্যক্তির জন্য দাম্পত্যে ফাটল তৈরি হওয়ার পর সেই ফাটল বুজেও 
যায়। দু’জনই আগ্রহী হলে সম্পর্কটা বেঁচে যায়। আবার সেটা নাও হতে পারে। সম্পর্ক তলানিতে এসে একটা সময় শেষ হয়ে যায়। এমনই নানা বিষয় নিয়ে কথা বললেন মনোবিদ ডঃ নীলাঞ্জনা সান্যাল।
বিশ্বাসের ভিত
 কথার শুরুতেই তিনি জানালেন, দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে একটা সূক্ষ্মতার বিচার থাকে। যে সূক্ষ্মতা মুখে উচ্চারিত না হলেও যে কোনওভাবেই হোক, দু’জন সঙ্গীকে দু’জনের প্রতি সম্পূর্ণ অনুরক্ত বলে প্রতিভাত করার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ ‘আমরা দু’জন’— এই দু’জনের যে বিশেষত্ব, সেই বিশেষত্ব আর কোনও সম্পর্কের মধ্যে এই দুটো মানুষের মধ্যে হবে না। যদি কোনও দম্পতি সেটা মেনে নেয়, তাহলে সম্পর্কের মধ্যে প্রথম যে কথাটা উঠে আসে সেটা হল, বিশ্বস্ততা। একজন আর একজনকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করার মতো জায়গায় থাকবে। অর্থাৎ এমন কোনও কাজ করব না, যেটা একজনের সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে দুঃখের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। নীলাঞ্জনা বলছেন, এই যে একটা অব্যক্ত ‘নীতিকথা’ বা নীতির সুর এই সম্পর্কের মধ্যে থাকে, এটা যদি কোনওভাবে নিজেদের মতো করে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তারপরে বাদবাকি যা থাকে সেটা ধরে রাখা সম্ভব। তখন দাম্পত্য আর অন্য কোনও সম্পর্ক দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত প্রভাবের মধ্যে দিয়ে যাবে না। 
পুরনো বন্ধু
দাম্পত্যে তৃতীয় সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে মনোবিদ বোঝালেন, তৃতীয় সম্পর্কে ‘সম্পর্কিত অবস্থাটা’ কত পুরনো বা কত নতুন, সেটার উপরেও। এমন যদি হয় যে কোনও একটি মেয়ে বা কোনও একটি ছেলে তার খুব ছোটবেলার সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ নেই। আবার তার সঙ্গে কোনওভাবে যোগাযোগ তৈরি হল। তাহলে সেই দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে একজন বন্ধু হিসেবে যুক্ত হল, সেটা আনন্দের। যে দাম্পত্য সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি একটা খোলা বারান্দার মতো অর্থাৎ সে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে নিজেদের কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যেও কিছুটা হাঁফ ছাড়া যায়, কিছুটা আরাম পাওয়া যায়, কিছুক্ষণ বসে থেকে বাইরের বাতাসকে অনুভব করা যায়— সেটা কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্ককে সুস্বাস্থ্যের দিকে নিয়ে যায়, বলছেন নীলাঞ্জনা। দাম্পত্য সম্পর্কে ওঠানামা থাকবেই। জাগতিক সাংসারিক টানাপোড়েনে সেটাই স্বাভাবিক। বন্ধুর সঙ্গে সেই টানাপোড়েন তো থাকে না, তাই তার সঙ্গে যে সম্পর্ক সেটা মজার, আনন্দের, হাসির, ভালোলাগার। সেই ভালোলাগা দিয়ে মানসিক পরিবেশ আলোকিত হয়। কিন্তু তা অনেকেই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না।
বন্ধুত্বের বাইরে
আজকের জীবনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, দাম্পত্যে তৃতীয় ব্যক্তির চলে আসার সম্ভাবনা খুব সহজ হয়ে গিয়েছে। কারণ ছেলেমেয়ে সবাই নানাভাবে বাইরের জগতের কাজের সঙ্গে যুক্ত। কাজের সূত্রে কাউকে হয়তো বন্ধু হিসেবে পাওয়া গেল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তো এখন বন্ধুর ছড়াছড়ি, যদিও সেখানে মানুষগুলোকে আমরা খুব ভালো করে চিনি না বা জানি না। তাই সম্পর্কের মধ্যে কত দূর নীতিবোধ কাজ করছে এবং কোথায় সেটাকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রবৃত্তি আছে, সেটাও আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় না, বলছেন নীলাঞ্জনা। এমন কোনও ব্যক্তির প্রতি বিশ্বাস রেখে তার সঙ্গে যদি কোনও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে এবং সেই সম্পর্ক যদি লুকানো বা নিষিদ্ধ সম্পর্কের মতো কোনও গন্ধ তৈরি করে, তাহলে তা দাম্পত্য জীবনকে নষ্ট করে দেয়। যে মানুষ এই সীমা অতিক্রম করে না, যে মানুষ পরিধিটা নিজেদের মতো করে মেনটেন করে, নতুন সম্পর্ক তৈরি হলেও তার সামনে কিন্তু কোনও সমস্যা নেই। নতুন সম্পর্ক সাময়িক সম্পর্ক, কখনওসখনও দেখা হবে, কথা ভাগ করে নেওয়া যাবে, এই পর্যন্তই। এই সম্পর্ক খোলাখুলি, যা লুকিয়ে রাখতে হয় না, তা নিয়ে কোনও জটিলতা নেই। কিন্তু যে সম্পর্ক সরিয়ে রাখতে হয়, আড়ালে লুকিয়ে রাখতে হয়, তাকে বন্ধুত্বের নাম দেওয়া হলেও তার মধ্যে নিষিদ্ধতার ইঙ্গিত থাকে। সেই ইঙ্গিত যেখানে আছে, সেখানে বুঝতে হবে দাম্পত্যে তার প্রভাবও ক্ষতিকর হবে, বোঝালেন বিশেষজ্ঞ।   
ওপেন রিলেশনশিপ?
‘ওপেন রিলেশনশিপ’ বা মুক্ত সম্পর্ক ব্যাপারটা কী? দীর্ঘ দাম্পত্যে থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিকভাবে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই মুক্ত সম্পর্কে রয়েছেন বলে আজকাল দাবি করার একটা প্রবণতা রয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। দাম্পত্যের বাইরে এই ধরনের সম্পর্ক থাকলেও বোঝাপড়ার নাকি অভাব নেই বলেও দাবি করেন কেউ কেউ। এটা কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
নীলাঞ্জনা জানালেন, আজকের জীবনে মানুষের মধ্যে আমিত্বের প্রাধান্য খুব বেড়ে গিয়েছে। নিজের আমিটা কী চাইছে, নিজের আমিটা কী পছন্দ করে, নিজের আমিটা কতগুলো জিনিস পছন্দ করে— এগুলো অনেক বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। দাম্পত্যের ক্ষেত্রে স্বামীর মধ্যে বা স্ত্রীর মধ্যে এমন কিছু কিছু গুণ আছে, যেটা সংশ্লিষ্ট সঙ্গীকে আশ্বস্ত রাখে। সেটা জীবনেও একটা স্থিরতা তৈরি করে। সঙ্গীর সেই গুণটা যেমন পছন্দ, আবার এমন কিছু কিছু ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য থাকবেই, যেটা তেমন পছন্দের নয়। এটা হতে বাধ্য। কারণ কোনও মানুষই তো নিখুঁত নন। কিছু খুঁত থাকতে পারে, ব্যক্তিত্বে কিছু দুর্বলতা থাকতেই পারে। কিন্তু যখন মানুষ কাউকে ভালোবাসে, তখন অপর ব্যক্তির দুর্বলতা কোনওভাবে তার বিরক্তির কারণ হলেও অনেক সময় সেটাকে সে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। এটা এমন কিছু বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় না। কারণ তার মাথায় এটাই কাজ করে, সামগ্রিকভাবে তো মানুষটি আমার প্রিয়, ভালোবাসার জন। 
এবার এই সমস্যাটা আধুনিক সময়ের ফসল। নীলাঞ্জনা জানালেন, আজকের আমিত্ব-প্রধান পৃথিবীতে মানুষ নিজের দাবি, নিজের চাহিদা এক তিলও ছাড়তে রাজি নয়। তাই যদি মনে হয় ঘরের মানুষের কাছে আমার অনেকটা পাওয়ার আছে, তাহলে সেই মানুষের সঙ্গে ঘর করাটা ছাড়ব না। কিন্তু যেখানে যতটা সুযোগ পাব, আমার পছন্দের অন্য জিনিসগুলো পাওয়া যাবে, সেটাও আমি হাত দিয়ে তুলে নেব। একাধিক মানুষের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করা এভাবেই। এই যে ‘পলিগ্যামাস’ প্রবণতা মানুষের মধ্যে, তা খুবই সহজাত। তা না হলে তো রোজ আমরা একই জামা পরতাম, একইরকম খাবার খেতাম, একই জিনিস করতাম। কিন্তু এই যে বিভিন্নতার মধ্যে সুখ, সেই সুখ আমরা নিজেদের ভিতরে নিয়েই আমরা আসছি। 
সমাজের বাঁধন
মন অনেক কিছু একসঙ্গে চাইলেও সামাজিকতার বোধ আমাদের শেখায়, একটি মানুষের সঙ্গেই থাকতে। তা না হলে সমাজ, সংসার বলে কিছু থাকবে না। সবাই যদি পলিগ্যামাস হয়ে পড়ে, তাহলে তো আর কোথাও নিশ্চিন্ততা থাকবে না। নিয়ম থাকবে না। নিশ্চয়তা থাকবে না, বলছিলেন মনোবিদ। ইদানীং সেই নিয়ম, নিশ্চয়তার জায়গাটা নড়ে গিয়েছে। নিজেদের একটা পরিধির মধ্যে গুছিয়ে রাখা বা ধরে রাখার ইচ্ছে এখন কারও নেই। সবটাই যেন অনেকটা দিগভ্রান্ত হয়ে খোলা মাঠে দৌড়ে বেড়ানো। অর্থাৎ একটা লাগামহীন মানসিকতা। লাগামহীনতা মানুষকে তাৎক্ষণিক সুখের দিকে টেনে নিয়ে যায়। সেটাই এখন মানুষের কাছে শ্রেয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নীলাঞ্জনা ব্যাখ্যা করলেন, গভীরতম যে সুখ, সেই সুখে যে নিজেকে স্থির করা যায় সেটা কিন্তু বোঝা যায় অনেক  পরে। বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন শারীরিক উন্মাদনা কিছু কমে, তখন সেই স্থিরতার দিকে মন যেতে চায়। অল্প বয়সে এই ভাবনা আসেই না। কমবয়েসে এইভাবে ভাবতে পারা যায় না বলেই নানা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে অনেকে। আর যখন জড়িয়ে পড়ে, তখন মনে করে না যে তার তরফে কোনও ভুল বা অন্যায় হচ্ছে। নিজেকে সে প্রবোধ দেয়, আমি তো কাউকে ছেড়ে আসছি না। কাউকে কষ্ট দিচ্ছি না। বরং আমি আর একজনের সঙ্গে নৈকট্য গড়ে তুলে অন্য এক ধরনের সুখ পাচ্ছি। কিন্তু এভাবে চিন্তা করলে সমাজ ভেঙে পড়বে। ভাবুন তো, বাড়ির সব ক’টা মানুষ যদি যার যার মতো আলাদা গণ্ডি তৈরি করে নেয়, তাহলে কি আর সেটা পরিবার থাকে? থাকে না। তাই অন্যদিকে মন যদি যায়, সবচেয়ে আগে নিজেকে প্রশ্ন করা যে, আমি সীমাটা মানতে পারব তো? বা সীমা মেনে আর একজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার কোনও প্রয়োজন সত্যিই আছে কি? সম্পর্কে এভাবে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি তৈরি হয়ে গেলে ধরে নিতে হবে, দাম্পত্য জীবনে কোথাও একটা ফাটল আছে। কোথাও একটা সুনির্দিষ্ট শূন্যতা রয়েছে। সেই শূন্যতা ভরাট করতে আর একজন ঢুকে পড়ছে। তাই যদি সেটা বোঝা যায়, তাহলে নিজেদের মধ্যেই সেটাকে সারিয়ে নেওয়া দরকার। বাইরের কোনও কিছু এনে ওই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করলে যেটা হবে সেটা হচ্ছে বাইরের জিনিসটা তার নিজের দাবি ছাড়বে না।
ফাটল বুজবে?
দাম্পত্যে এইভাবে দূরত্ব বা শূন্যতা তৈরি হলে সেটা সবসময় সম্পর্কের অন্ত ঘটাবে, এটা যদি না ভাবে একটু ইতিবাচক দিক থেকে বিষয়টা দেখা যায়? ফাটল সারিয়ে তোলার ক্ষেত্রে কেউ সচেতনভাবে আগ্রহী হলে কী করবেন? নীলাঞ্জনা বলছেন, যদি নিজেদের মধ্যে খোলাখুলি বিষয়টা নিয়ে কথা বলা যায়, তাহলে সবচেয়ে ভালো। নিজেদের মধ্যে কথা বলে সুরাহার ব্যবস্থা করা সম্ভব না হলে খুব কাছের বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করা যায়। সেই পর্যায়ে গিয়েও যদি বিষয়টাকে আয়ত্তে না আনা যায়, তাহলে ম্যারেজ কাউন্সেলর-এর কাছে যেতে হবে। 
পরিবারের অন্যদের এক্ষেত্রে কোনও ভূমিকা? বিশেষত দু’তরফের বাবা-মা? তাঁর মতে, পরিবারে বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত থাকার চলটাই তো এখন আর নেই। যদি কেউ থাকেন একসঙ্গে, তাহলে যার অসুবিধে বেশি হচ্ছে যেমন বাড়ির বউটির যদি অসুবিধা হয়, তাহলে তার শ্বশুর শাশুড়ি তাকে পরামর্শ দিতে গেলেও সে শুনবে না। বরং তার মা বা বাবা তাকে ডেকে বোঝানোর চেষ্টা করলে কিছুটা সুবিধা বা উপকার হতে পারে। একই কথা প্রযোজ্য স্বামীর ক্ষেত্রেও। তার অসুবিধা হলে তার বাবা-মা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন। দাম্পত্য সম্পর্ক শেষ করে দিলে তার কী কী ফলাফল হতে পারে, সে ব্যাপারে তাকে কিছুটা অবগত করতে পারেন বাবা-মা। কী কী ক্ষতি বা অসুবিধার মুখে পড়তে পারে তাদের ছেলে, দম্পতির সন্তান থাকলে তার উপরেও প্রভাব পড়ে সেটা নিয়ে কথা বলতে পারেন। এক্ষেত্রে যাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তারা যদি শোনে বা বোঝে, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সেটা ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। আর যদি বাবা-মায়ের কথায় গুরুত্ব না দেয়, কিছু করার নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটাই হয়। দেখা যায় যে তৃতীয় ব্যক্তির অনুপ্রবেশে এই ধরনের বৈবাহিক সম্পর্ক যদি ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের কথাতেও কাজ হয় না। তাঁরা চেয়েও সাহায্য করতে পারেন না। তখন অপরিচিত কোনও কাউন্সেলর-এর কাছে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। 
কাউন্সেলিং উপযোগী
ম্যারেজ কাউন্সেলর কী করেন? নীলাঞ্জনা বলেন, কাউন্সেলর-এর মধ্যে একটা নৈর্বক্ত্যিক বা নিরপেক্ষ ব্যাপার থাকে। তিনি শুধু মেয়েটির কথা শুনলেন বা শুধু ছেলেটির কথা শুনলেন, এমনটা হবে না। অর্থাৎ দম্পতির মধ্যে কোনও একজনের কথাই প্রাধান্য পেল, তা কখনও হবে না। কাউন্সেলর তাঁর মূল্যবোধ দিয়ে ছেলেটি বা মেয়েটিকে বিচার করে দেখছেন, এরকমটাও কখনও হবে না। কাউন্সেলর নিরপেক্ষ বলেই দু’ধরনের কথাবার্তা শুনে তার মধ্যে কমন পয়েন্টস কী কী, সেটা তিনি খুঁজে বের করে সুরাহার সুলুকসন্ধান দিতে পারেন। এবার তাঁর দেখানো পথ বা সমাধানে সেই দম্পতি অর্থাৎ স্বামী স্ত্রী দু’জনেই যদি কনভিন্সড হন, তাহলে বিয়ে রক্ষা করা যেতেও পারে। অতীতটা সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রাসঙ্গিকতা পায় না। সম্পর্ক রক্ষা করাটাই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তাদের কাছে।
কিন্তু এত কিছু করেও সম্পর্ক যদি টিকিয়ে রাখা না যায়? ভেঙে যাওয়াটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন? 
অসহিষ্ণুতা এখন চরমে, বলছিলেন নীলাঞ্জনা। ভাঙাটাই যেন নিয়ম। সম্পর্ক আর না থাকলে, ভেঙে গেলে তো কারও কাছে কিছু আলাদা করে প্রমাণ করার নেই। তাই ভাঙাটা খুব সহজ হয়ে গিয়েছে। আমাদের সমাজে এই ধরনের চিত্র বাস্তব ছিল না। অনেক অসুবিধে গিলে, কিছু ফেলে, কিছু চোখের জল দিয়ে ধুয়ে সম্পর্ক নিয়ে মানানসইভাবে আমরা চলার চেষ্টা করতাম। এখন সেই ধৈর্যটাই আর নেই। 
আর বিশ্বাসভঙ্গের পরেও সেই বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে যখন একজন আগ্রহী হন, কিন্তু অন্যজন হয়তো তেমন ভাবিত নন, সেক্ষেত্রে কী হবে? নীলাঞ্জনার মতে, যে আগ্রহী নয়, তাকে জোর করে বিশেষ লাভও নেই। কিন্তু যে আগ্রহী, তাকেই যদি বুঝিয়ে সম্পর্কে নেতির প্রকোপ কিছুটা কমানো যায়, তাতে অন্য মানুষটিও কিছুটা শান্ত হতে পারে। আর যখন দু’জনের কারওই সম্পর্ক নিয়ে মাথাব্যথা নেই, ধরে নিতে হবে সে সম্পর্ক থাকারই নয়। তাদের ফেরানো যায় না।
সেক্ষেত্রে বিয়ের আগে কোনও ধরনের কাউন্সেলিং হলে বোঝাপড়ার বিষয়টা কি একটু ভালোভাবে দেখে নেওয়া সম্ভব?
বিশেষজ্ঞের মতে, যে কোনও সম্পর্কের নতুনত্বের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা খুব বড় বিষয়। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে বিশ্বাস ভাঙার যন্ত্রণা লাঘব করতে কাউন্সেলর-এর কাছে যাওয়ার চেয়ে বিয়ের আগে ভাবী দম্পতি কতদূর সমমনস্ক, সেটা দেখে নিতে পরামর্শ নেওয়া যেতেই পারে। বিয়ের কথাবার্তা যখন চলছে, সেই সময় থেকেই এটা করা যেতে পারে। তখন এমনিতে তো কোনও সমস্যা নেই, তাই দু’জনের জায়গাটা খোলা মনে দেখার একটা পরিসর থাকে। কার কোথায় খামতি, সেটা কীভাবে পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব সম্পর্কের খাতিরে, সেটাও দেখে নেওয়া সম্ভব।
ভাবী দম্পতিদের কথা ভেবে আরও একটি জরুরি পরামর্শ দিলেন বিশেষজ্ঞ। তাঁর কথায়, বিয়ের মন তৈরি হলে, বিয়ে করতে সত্যিই ইচ্ছে হলে তবেই বিয়ের কথা ভাবুন। প্রত্যেক মানুষকে বুঝতে হবে, এক একজন এক একটা পরিবারে বড় হয়েছে। যার সঙ্গে সে ঘর বাঁধতে চলেছে, সে ভিন্ন পরিসরে  বড় হয়ে উঠেছে। তাই বিভেদ থাকবেই এবং প্রচুর থাকবে।    
ফলে পরস্পরের কাছে প্রথম থেকেই উচ্চমাত্রার 
প্রত্যাশা না রেখে যদি সম্পর্ক গড়ার জন্য একটি মানুষ আর একটি  মানুষকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে খুব কাছ 
থেকে বুঝে নিতে পারে, তাহলে সমস্যা কিছুটা কম হয়। 
আমার উল্টো দিকের মানুষটির মধ্যে গুণের জায়গাগুলো কী কী, সেটা   খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়। গুণের পাশাপাশি দোষটাও চোখে পড়বে। কিন্তু তখন দোষটা এত বড় হয়ে উঠবে না। 
কারণ মানুষটি যেদিক থেকে শক্তিশালী, সেই জায়গাগুলি তার কাছে বড় হয়ে প্রতিভাত হবে। সেটাই পছন্দের বিষয় হবে। এমন পথে ভাবলে কাছের মানুষটির ঘাটতিও মেনে নিতে ভয়ঙ্কর অসুবিধে হবে না। এইভাবে ভাবতে শুরু করার মতো পরিণত মন হলে বিয়ের মতো কমিটমেন্ট ভাবা যেতে পারে। বিয়ের থেকে বিরাট কোনও প্রত্যাশার কথা না ভাবলে মানিয়ে চলা কিছুটা সহজ হয়। আর যদি বিশেষ প্রত্যাশা থাকে, তাহলে অমিল হওয়ার সম্ভাবনা এবং অশান্তি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যাবে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ