প্রীতেশ বসু, শালবনী: ঘোষণা হয়েছিল অষ্টম বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে। তার আড়াই মাসের মধ্যেই শালবনীতে পূর্ব ভারতের প্রথম প্রকৃতিবান্ধব তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শিলান্যাস করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন দু’টি ইউনিট গড়ে উঠবে এখানে। পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনীতে জিন্দাল গোষ্ঠীর ‘জেএসডব্লু এনার্জি’ ১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে গড়ে তুলবে এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এর সুফল রাজ্যের ২৩টি জেলার মানুষই পাবেন বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ হাজার কর্মসংস্থান হবে। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি শালবনীতেই ২০০০ একর জমিতে শিল্পতালুক গড়ে তুলবে জিন্দাল গোষ্ঠী। সেখানে আরও কয়েক হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। এদিন সেই শিল্পতালুকেরও শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যে শিল্পায়ন নিয়ে বিরোধীদের অপপ্রচারের জবাবও এদিন দিয়েছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘রাজ্যে বিনিয়োগ আসছে না এবং শিল্প হচ্ছে না যাঁরা বলেন, তাঁদের চোখ খুলে দেখা উচিত। প্রস্তাবিত প্রকল্প আজ বাস্তব হতে চলেছে। সবক’টি বাণিজ্য সম্মেলন মিলিয়ে ১৯ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। ১৩ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ ইতিমধ্যে হয়ে গিয়েছে। বাকিটাও হচ্ছে। আমরা যা বলি, তাই করে দেখাই। মনে রাখবেন, বাংলাই শিল্পের ভবিষ্যৎ।’
এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং সাংসদ দেব। ছিলেন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ, বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস সহ অন্যান্যরা। তাঁদের সামনে রাজ্যের শিল্পে অগ্রগতির খতিয়ান তুলে ধরেন মমতা। বলেন, ‘মেদিনীপুরে ন’টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক রয়েছে। বাংলায় ছ’টি ইকোনমিক করিডর তৈরি করেছি। পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে ৭২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে। পাঁচটি বড় সংস্থা আসছে। ২ হাজার ৪৮৩ একর জমিতে জঙ্গলসুন্দরী কর্মনগরী তৈরি হয়েছে। অশোকনগরে ওএনজিসি। বানতলায় লেদার হাব। নিউটাউনে সিলিকন ভ্যালি। তাজপুরেও শিল্প আসছে। দেউচা-পাচামিতে হাজার হাজার কর্মসংস্থান হবে। যতদিন যাবে বিনিয়োগ আরও বাড়বে। ফলে আমার নামে কুৎসা করতে পারবেন, কিন্তু অবজ্ঞা নয়।’ স্ত্রী সঙ্গীতা, পুত্র পার্থকে নিয়ে এদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জিন্দাল গোষ্ঠীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর সজ্জন জিন্দাল স্বয়ং। বাংলার শিল্পবান্ধব পরিস্থিতির অকুণ্ঠ প্রশংসা করে তাঁর ঘোষণা, এই প্রকল্পের ফলে সর্বাধিক উপকৃত হবেন এলাকার বাসিন্দারাই। একটি স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার গড়ে তোলা হবে। সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে-বিদেশে চাকরি করতে পারবেন স্থানীয় তরুণ-তরুণীরা। বাম জমানায় ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁর আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে রাজ্যের অগ্রগতির পরিসংখ্যান তুলে ধরেন মমতা। জানান, গত ১৪ বছরে রাজ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০০০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার মেগাওয়াট। আগামী দিনে যা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছবে। এর জন্য ৪৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে।
এক সময়ের মাওবাদী অধ্যুষিত জঙ্গলমহল এখন পুরোপুরি শান্ত। সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে এদিন বিজেপি এবং তার দোসরদের নাম না করে তোপ দাগেন মমতা। বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের উচিত দেশকে এক রাখা, শক্তিশালী করা। দেশকে ভাগ করা নয়। কোনও নেতিবাচক কথায় কান না দিয়ে হৃদয়কে চাঙ্গা রেখে উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের কাজ।’