প্রীতেশ বসু, যাদবপুর: ২৫ বছর তিনি কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলার। এর মধ্যে ১৬ বছরই মেয়র পারিষদ। বাম আমলে ‘জঞ্জালনগরী’ হয়ে ওঠা কলকাতাকে ‘ভ্যাট ফ্রি’ শহরে বদলে দেওয়ার পুরোধা। পুরসভার কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কমপ্যাক্টর স্টেশন তৈরি তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। আবার পুরকর ব্যবস্থা সরলীকরণেও বড়ো ভূমিকা পালন করেছেন পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এই মানুষটি। পায়ে চামড়ার চটি। পরণে হাফ স্লিভ শার্ট। মাথায় হেলমেট। এভাবেই স্কুটার নিয়ে চষে বেড়াচ্ছেন যাদবপুরের অলিগলি। তবে শুধু নির্বাচনের সময়ে নয়। সারা বছরই এভাবে মানুষের সুখ-দুঃখে পৌঁছে যান দেবব্রত মজুমদার। এলাকায় যাঁর সমধিক পরিচিতি মলয় নামে। দীর্ঘদিন শিক্ষকতার কারণে তিনি অনেকের কাছে মলয় স্যার। তিনিই যাদবপুরের বর্তমান বিধায়ক এবং এবারের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী। তাঁর প্রতিপক্ষ বিজেপির শর্বরী মুখোপাধ্যায় এবং সিপিএমের বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন কলকাতার মেয়র ছিলেন বিকাশবাবু। দুই প্রার্থীরই কলকাতা পুরসভার সঙ্গে দৃঢ় যোগ থাকায় পুর পরিষেবা প্রদানে কে বেশি সফল, তা নিয়ে জোর চর্চা রয়েছে যাদবপুরের দশটি ওয়ার্ডেই। তবে পানীয় জল সরবরাহ, উন্নত রাস্তাঘাট, জঞ্জালমুক্ত শহর থেকে শুরু করে নূন্যতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ২০২১-এ বিধানসভা ভোট পরবর্তী পাঁচ বছরকে এগিয়ে রাখছেন যাদবপুরবাসী। সে বছর দেবব্রতবাবু প্রথমবারের জন্য বিধায়ক হয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার বিধায়ক হওয়ার দৌড়ে বিরোধীদের থেকে তিনি অন্তত ১০০ মাইল এগিয়ে রয়েছেন বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের।
কলকাতা পুরসভার ১০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত যাদবপুর কেন্দ্রে গত লোকসভা ভোটে মাত্র একটিতে ৯০ ভোটে পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। সেখানেও এবার ‘লিড’ হবে বলে দাবি করছেন মলয়বাবু। সেই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, বাম আমলে এই কেন্দ্রে অন্নপূর্ণা গ্লাস, সুলেখা, ডাবর সহ একাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে বহুতল গড়ে ওঠার কথা। ১০১ নম্বর ওয়ার্ডের বি পি টাউনশিপের জে ব্লকের বাসিন্দা শ্যামল সরকারের কথায়, ‘অন্যান্য কাজ তো আছেই। কিন্তু যারা পাটুলি চিনত না, তারা আজকে পাটুলি চিনে গিয়েছে। জল-কল তো হয়েইছে। সৌন্দর্যায়নেও এই কেন্দ্রের জুড়ি মেলা ভার।’ তবে টালিনালা সংস্কার, নতুন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট তৈরি, জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং তিনটি অত্যাধুনিক পাম্পিং স্টেশন তৈরি সত্ত্বেও বেশ কিছু এলাকায় রয়েছে জল জমার সমস্যা।
১৯৬৭ সাল থেকে এই কেন্দ্রে ১৩ বার বিধানসভা নির্বাচনে জিতেছে সিপিএম। তবে এই কেন্দ্রকে এক সময়ের ‘লাল দুর্গ’ বলতে নারাজ বিজেপি। এই ধারণা মুছে দিতে তাঁদের প্রার্থী শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের গলায় শোনা গেল ১৯৮৪ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয়ের ইতিবৃত্ত। তাঁর কথায়, ‘যাদবপুরকে এক সময়ের লাল দুর্গ বলার বিষয়টি একেবারে ঠিক নয়। মনে রাখতে হবে, যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রেরই অংশ এই বিধানসভা। আর সিপিএম আমলে এই লোকসভা কেন্দ্রেই সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে সাংসদ হয়েছিলেন বর্তমানের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাহলে আর লাল দুর্গ কেন বলা হবে?’ ২০১১ সালে পালাবদলের বড়ো সাক্ষী এই কেন্দ্র। টানা পাঁচবার জয়ের পর এখান থেকেই ২০১১ সালে পরাজিত হন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ২০১৬ সালে সিপিএম ফের জয় পায় সুজন চক্রবর্তীর হাত ধরে। সেটাই ছিল এই কেন্দ্রে বামেদের শেষতম জয়। আর এই তথ্য কাজে লাগিয়ে বামেদের গায়ে ‘আনলাকি থার্টিন’-এর তত্ত্ব সেঁটে দিতে শোনা যাচ্ছে অনেককে। স্বাভাবিকভাবেই এই অবৈজ্ঞানিক বিষয়কে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিতে নারাজ বিকাশবাবু। যদিও এলাকায় কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, ‘ফুল তো ভালোই ফুটছে। বামেদের কি আদৌ বিকাশ হবে?’