সংবাদদাতা, উলুবেড়িয়া, বারুইপুর, বনগাঁ: ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর…’ তবে যখন কাজের সূত্রে ‘অর্ধেক’ জায়গা অতিক্রম করে নারী আরও কিছুটা জায়গা অধিকার করে বসেন, তখন পুরুষরা হয়ে পড়ে খানিক খাটো। নারী দিবসের আগে এমন তিন নারীর কাহিনি, যাঁরা ছাপিয়ে গিয়েছেন নিজেদের। অতিরিক্ত উচ্চতা অর্জন করেছেন। আশপাশে থাকা পুরুষদের ঘাড় উঁচু করেই দেখতে হয় তাঁদের। যেমন উলুবেড়িয়া দু’নম্বর ব্লকের তুলসিবেড়িয়ার কল্যাণী পালুই। বারুইপুরের শিখরবালি এক নম্বর পঞ্চায়েতের পালপাড়ার পুষ্পরানি পাল। উত্তর ২৪ পরগনার বাগদা ব্লকের সাগরপুরের প্রতিমা অধিকারী, সীমা মণ্ডল, শেফালি সরকার ও কাঞ্চন বিশ্বাস।
কল্যাণীদেবী চোলাই মদের নেশা থেকে পুরুষদের বাঁচাতে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আন্দোলন চালাচ্ছেন। স্বামী অসুস্থ বলে আশি বছরের পুষ্পরানি পুতুল তৈরি করেন। সে রোজগারে চালান সংসার। আর প্রতিমা-সীমারা ভেক্টর কন্ট্রোলের কাজ করতে গিয়ে সংগ্রহ করেন আবর্জনা। কমলালেবুর খোসা থেকে সাবান, কচুরিপানা থেকে কাগজ, প্লাস্টিক থেকে দাহ্য তেল এবং ঘর সাজানোর জিনিসপত্র তৈরি করেন।
কল্যাণীদেবী গড়েছেন উলুবেড়িয়া মহিলা উন্নয়ন সমিতি। উলুবেড়িয়ার পাশাপাশি বাগনান, আমতা, মাজু, উদয়নারায়ণপুরেও সংগঠনের শাখা আছে। দিন হোক বা রাত চোলাই বিক্রির খবর পেলেই সদস্যদের নিয়ে ছুটে যান। লক্ষ্য চোলাইমুক্ত তুলসিবেড়িয়া। বাবা মোহনলাল ঘোষের আন্দোলন দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তারপর ২০০৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রায় ছ’হাজার সদস্য নিয়ে নিজের আন্দোলন শুরু। তিনি বলেন, ‘একসময় ৬০টির মতো চোলাইয়ের ভাঁটি চলত। নিত্য ঘরে ঘরে অত্যাচার, অশান্তি। মেয়েরা স্কুল যেতে ভয় পেত। এক পরিবারের তিনজনের মৃত্যুও হয়। আমরা রুখে দাঁড়াই। বহুবার আক্রমণ নেমে এসেছে। কিন্তু আন্দোলন থামাইনি। আর আশি বছরের পুষ্পরানিদেবী তো সোজা হয়ে হাঁটতেই পারেন না। কিন্তু শিল্পী হিসেবে বিখ্যাত। এলাকায় তাঁর নাম ‘পুতুল বুড়ি’। রাজা-রানি, নানা সাজের নারী-পুরুষ, পশুপাখি বানান। তারপর মেলায় বিক্রি করতে যান। কুড়ি থেকে ত্রিশ টাকা দাম। তাঁর স্বামী কেনারাম পাল। বয়স ৯০ বছর। তাঁদের দোতলা বাড়িতে অ্যাসবেস্টসের ছাউনি। ভাঙাচোরা অবস্থা। কেনারাম বয়সের কারণে কাবু। বলেন, ‘আমরা বৈষ্ণব। কারও হাতে খাই না। এই কাজ করেও আমার জন্য রান্না করে দেয় গিন্নি।’ পুষ্পদেবী বলেন, ‘বার্ধক্যভাতা পেলে একটু সুবিধে হতো। জিনিসপত্রের যা দাম বেড়েছে কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছে না।’ আর বাগদার প্রতিমা, সীমা, শেফালি, কাঞ্চনরা এখন ব্যস্ত অপরাজিতা-গাঁদা ফুল, বিট, টম্যাটো নিয়ে। ভেষজ আবির তৈরি করছেন। সামনেই দোল। আবিরের বরাত পেয়েছেন। এঁরা এই ব্লকের ভিসিটি (ভেক্টর কন্ট্রোল টিম) কর্মী। পতঙ্গবাহিত রোগ প্রতিরোধে কাজ করেন। জমা জলে কীটনাশক স্প্রে ও বাদবাকি পরিচ্ছন্নতায় কাজকর্ম করেন। তা করতে গিয়ে পড়ে থাকা জিনিসপত্র সংগ্রহ। জলের বোতল, প্লাস্টিক কুড়িয়ে কিছু বিক্রি করেন কিছু দিয়ে ঘর সাজানোর জিনিস বানান। তাঁরা গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। এখন মূলধন প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ ও বিক্রির ব্যবসা শুরু করেছেন।