Bartaman Logo
১৪ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / বিশেষ ক্রোড়পত্র

মহিষাদল রাজপরিবারের, রথযাত্রী

‘মহিষাদল’ নামকরণ নিয়ে ঐতিহাসিক সত্যতা না থাকলেও বহু জনশ্রুতি ও কথিত, ষোড়শ শতকের আগে পর্যন্ত এই অঞ্চল বেলাভূমি হিসাবে পরিচিত ছিল। ওই অঞ্চল ছিল নির্জন বনজঙ্গলে ভরা, লোকবসতি ছিল অপ্রতুল।

মহিষাদল রাজপরিবারের, রথযাত্রী
  • ১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুপ্রকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘মহিষাদল’ নামকরণ নিয়ে ঐতিহাসিক সত্যতা না থাকলেও বহু জনশ্রুতি ও কথিত, ষোড়শ শতকের আগে পর্যন্ত এই অঞ্চল বেলাভূমি হিসাবে পরিচিত ছিল। ওই অঞ্চল ছিল নির্জন বনজঙ্গলে ভরা, লোকবসতি ছিল অপ্রতুল। মহিষাদল, দোরো, সুতাহাটি ওইসব অঞ্চল ছিল সমুদ্র পার্শ্ববর্তী দ্বীপের মতো, চরে বেড়াত বহু মহিষ, ওই সূত্র ধরেই হয়তো নাম হয়েছে মহিষাদল। আবার কারও মতে পূর্বে ওই দ্বীপটির আকার মহিষের আদলে ছিল বলে নাম মহিষাদল। মহিষাদলের রাজ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে কবি ললিতকুমার ঘোষের লেখনীটি খুব প্রাসঙ্গিক ‘রূপনারায়ণ-ভাগীরথী যেথা, মিশিয়া রচিল অগাধ বারি শষ্য শ্যামল ভূমি মহিষাদল, শোভিছে দক্ষিণ পুরবে তারি, সুদূর অতীতে বাড়িয়া-কল্যাণ রায় ছিল ভূপতি হেথা। উত্তর হতে জনার্দন নামে, উপধ্যায় দ্বিজ আসিল সেথা।’ 

Advertisement

কে মহিষাদলের রথ প্রতিষ্ঠা করেন? যতদূর জানা যায়, মহিষাদলের রাজ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা জনার্দন। তাঁর উত্তরপুরুষরা ছিলেন, রাজা জনার্দনের পুত্র রাজা দুর্যোধন, তাঁর পুত্র রাজা রামশরণ, তাঁর পুত্র রাজা রাজারাম, তাঁর পুত্র রাজা শুকল্যান এবং তাঁর পুত্র রাজা আনন্দ লাল। রাজা আনন্দলাল পুত্রহীন হওয়ায় তাঁর মৃত্যুর পর আনন্দলালের সুযোগ্য সহধর্মিনী রানি জানকী দেবী ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে মহিষাদল রাজ এস্টেটের সমূহ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। রানি জানকী দেবী মহিষাদলের রামবাগে রামজিউর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরে রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, হনুমানজি, জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা, রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহও কতকগুলি শালগ্রাম শিলা বিরাজমান, দশমীতে রামজিউর রথ এই অঞ্চলে বিখ্যাত। 
মহিষাদল রাজবাড়ির মধ্যে সুউচ্চ ৺মদনগোপাল জিউর সুদৃশ্য নবরত্ন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে জানকী দেবী প্রথম শ্রীশ্রীমদনগোপাল জিউর রথযাত্রা প্রচলন করেন। তাই মহিষাদলের রথ মদনগোপাল জিউর রথ, রথযাত্রায় জগন্নাথদেব, মদন গোপাল জিউ এবং রাজ রাজেশ্বরজিউ থাকেন। মন্দির থেকে চতুর্দ্দোলাতে করে বিগ্রহ নিয়ে এসে রথতলায় দাঁড়িয়ে থাকা রথে বসানো হয়। কাঠের তৈরি হয় ওই রথ উচ্চতা পতাকা সহ প্রায় সত্তর ফুট, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে আঠাশ ফুট। প্রথমে রথের চূড়া ছিল ১৭টি পরে এলাকার জনবসতি বাড়ায় চূড়া তেরোয় নামিয়ে আনা হয়। এটি ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে রাজা লছমন প্রসাদের সময়ের কথা। 
এই রথটি পাঁচতলা, প্রতিটি চূড়াতে পেতলের কলস-চক্র-ঘণ্টা থাকে। রথের আগের দিন (আষাঢ়ী শুক্ল পক্ষের প্রতিপদ তিথিতে) বিকালে গোপাল জিউর মন্দির থেকে পালকিতে করে রাজরাজেশ্বরকে আনিয়ে রথের সামনে পুজোর অনুষ্ঠান করা হয়। এরপর রথের সবার উপরে তেরো নম্বর চূড়ায় কলস-চক্র-ঘণ্টা সমন্বিত পতাকাদণ্ডটি ঝুলন্ত নুতন কাপড় রথের মাথা থেকে মাটি পর্যন্ত স্থাপন করা হয়। একে স্থানীয় ভাষায় লেৎবাঁধা বা লেতোৎসব বলে। এই মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানটিকে ‘নেত্রোৎসব’ও বলা হয়ে থাকে। এছাড়াও রথের চক্ষুদান উৎসব হয়। রথের দিন বিকালে রাজডঙ্কা বাজতে বাজতে রঙিন রাজছত্র, রুপো ও পেতলের বল্লম হাতে নকশাদার বিশাল পাখা হাতে প্রহরী দেহরক্ষীর সঙ্গে সুন্দর পালকিতে করে রাজ পরিবারের সদস্য পথে উপস্থিত হয়ে রথের রশিতে প্রথম টান দিয়ে রথ যাত্রার সূচনা করেন। প্রায় দুই মাইল দূরে গুণ্ডিচাবাটিতে রথ পৌঁছে গেলে রাজ পরিবারের সদস্য রাজবাড়িতে ফিরে আসেন। গুণ্ডিচাবাটি হতে নয় দিনের দিন আবার রথে করে জগন্নাথদেব ও গোপালজিউ নিজ মন্দির ফিরে আসেন। ওই গুণ্ডিচাবাটি হল মাসির বাড়ি। গুণ্ডিচাবাটির মন্দিরটি চণ্ডীমণ্ডপের আদলে তৈরি। সামনে টিনের ছাউনি দেওয়া বড়ো নাটমণ্ডপ। সেখানে ওই আট দিন সন্ধ্যায় বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় এবং প্রতিদিন গোপালজিউ নতুন নতুন বেশে পূজিত হন। যেমন রাজবেশ, ষড়ভুজ গৌরাঙ্গ বেশ, রাখাল রাজা, কৃষ্ণকালি, কালীয়াদমন, মৎস্য অবতার, কূর্ম অবতার, বরাহ অবতার ও নটবর বেশ ইত্যাদি ইত্যাদি। মন্দিরের পাশেই রয়েছে রন্ধনশালা, প্রতিদিন দুইবেলা ভোগ নিবেদন করা হয়, রথতলা থেকে গুণ্ডিচাবাটি পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার রথতলা থেকে গুণ্ডিচাবাটি পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার রথ চলার যে প্রশস্থ পথ সেটাকে রথ সড়ক বলা হয়। গুণ্ডিচাবাটিতে আট দিন থাকার পর নবম দিনে একইভাবে পুনর্যাত্রা বা উলটোরথ হয়। 
এছাড়া গুরুপূর্ণিমার দিন (আটারি পূর্ণিমা) বিকেলে ছোটো একটি রথ দধিমানব জিউর মন্দির থেকে ফুলবাগ রাজবাড়ি পরিক্রমা করে পুনরায় দধিমানব জিউর মন্দিরে ফিরে আসে। ওই রথে নিয়ে যাওয়া হয় দধিমানব জিউর শালগ্রাম শিলা। রথযাত্রা উপলক্ষে রথের আগের দিন থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত ১৫ দিন চলে বৈচিত্রপূর্ণ রথের মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ