Bartaman Logo
১৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / বিশেষ ক্রোড়পত্র

ষড়ৈশ্বর্যময় শ্রীজগন্নাথ পুরুষোত্তম

শ্রীজগন্নাথের ষড়ৈশ্বর্য ও আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যের প্রতীক হিসেবে তাঁর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বিস্তারিত জানুন।

ষড়ৈশ্বর্যময় শ্রীজগন্নাথ পুরুষোত্তম
  • ১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বামী হরিময়ানন্দ: ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এমন কিছু তীর্থক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলি কেবলমাত্র উপাসনার স্থান নয়। একটি জাতির চেতনা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের চিরন্তন প্রতীক। পুরীর শ্রীজগন্নাথধাম তেমনই এক মহাতীর্থ। ‘জগন্নাথ’— অর্থাৎ জগতের নাথ। তিনি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের নন। তিনি সমগ্র মানবজাতির আপনজন। 

Advertisement

প্রতিবছর রথযাত্রায় অগণিত মানুষ জাতি, বর্ণ, ভাষা ও সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে একত্রিত হন।
শ্রীজগন্নাথের ষড়ৈশ্বর্য-ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্যের অপূর্ব সমন্বয়। তাঁর এই ছয়টি দিব্যগুণই তাঁকে যুগে যুগে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের প্রভু করে তুলেছে। এবার আসি সেই ছয়টি ঐশ্বর্যের কথায়। 
ষড়ৈশ্বর্যের প্রথম প্রকাশ ঐশ্বর্য 
ভগবানের ষড়ৈশ্বর্যের প্রথম প্রকাশ ঐশ্বর্য। ঐশ্বর্য বলতে কেবল ধনসম্পদ বা বৈভবকে বোঝায় না। এর অর্থ সর্বপ্রকার সম্পদ, সর্বময় প্রভুত্ব এবং সমগ্র সৃষ্টির উপর অধিকার। শ্রীজগন্নাথ সেই পরম ঐশ্বর্যের আধার। তিনি জগতের নাথ— সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি। সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের অন্তরালে যে এক অদৃশ্য মহাশক্তি নিরন্তর ক্রিয়াশীল, সেই শক্তিরই প্রতীক শ্রীজগন্নাথ। 
পুরীর শ্রীমন্দিরে প্রবেশ করলেই এই মহিমার এক অনির্বচনীয় অনুভূতি জাগে। আকাশছোঁয়া শিখর, গরুড়স্তম্ভ, সিংহদ্বার, আর অবিরাম শঙ্খ-ঘণ্টার ধ্বনি যেন ঘোষণা করে— এ কেবল একটি মন্দির নয়, এটি যুগযুগান্তরের ভক্তির রাজধানী। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কত রাজা, সম্রাট, সাধু, মহাপুরুষ এবং সাধারণ মানুষ তাঁদের সর্বস্ব তাঁর চরণে নিবেদন করেছেন। কে নেই সেখানে? আদি শংকরাচার্য থেকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, গুরুনানক থেকে স্বামী বিবেকানন্দ— যুগে যুগে ভারতের বিভিন্ন ধর্মধারা ও দর্শনের মহাপুরুষেরা নীলাচলে এসে শ্রীজগন্নাথের চরণে প্রণাম নিবেদন করেছেন। তবে জগন্নাথের প্রকৃত ঐশ্বর্য শ্রীমন্দিরের রত্নভাণ্ডারে নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ ভক্তের হৃদয়ে। যে ভক্ত অশ্রুসজল চোখে তাঁর নাম উচ্চারণ করে, সেই হৃদয়ই তাঁর প্রকৃত রত্নভাণ্ডার। ভক্তির এই অমূল্য ধন কোনো রাজকোষের ধনরত্নের সঙ্গে তুলনীয় নয়। এই ঐশ্বর্যের এক অনন্য প্রকাশ হল মহাপ্রসাদ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য বিশাল রান্নার আয়োজন হয়। মাটির অসংখ্য হাঁড়িতে পর পর খাদ্য প্রস্তুত করা হয়। লোকবিশ্বাস অনুসারে, একটির উপর আরেকটি বসানো হাঁড়ির মধ্যে উপরের হাঁড়ির খাদ্য আগে সেদ্ধ হয়— এই বিস্ময়কর কথা আজও ভক্তসমাজে শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রচলিত। ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, ভক্তের কাছে এটি জগন্নাথের অসীম কৃপা ও ঐশ্বর্যেরই স্মারক। মহাপ্রসাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতি, বর্ণ, ধনী-দরিদ্র বা সামাজিক মর্যাদার কোনো ভেদরেখা নেই। এই সাম্যের মধ্যেই জগন্নাথের ঐশ্বর্য সর্বাধিক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। 
শ্রীজগন্নাথের আর এক অনন্য ঐশ্বর্য তাঁর সঙ্গে ভক্তের নিবিড় সম্পর্ক। ভারতীয় ধর্মজগতে বহু দেবতার উপাসনা প্রচলিত থাকলেও জগন্নাথের সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক যেন একান্ত আপনজনের। তিনি কেবল পূজিত হন না, তিনি ভালোবাসাও পান। কারও কাছে তিনি আদরের সন্তান, যাঁকে স্নেহে আহার করানো হয়। কারও কাছে তিনি অন্তরঙ্গ বন্ধু, যার কাছে মনের সব কথা বলা যায়। কারও কাছে তিনি প্রভু, আবার কারও কাছে তিনি পরিবারের একজন সদস্য। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশ্বর্য— তিনি সকলের, আর সকলেই তাঁর। 
ষড়ৈশ্বর্যের দ্বিতীয় গুণ বীর্য
ভগবানের ষড়ৈশ্বর্যের দ্বিতীয় গুণ হল বীর্য। বীর্য অর্থ শক্তি, সাহস, পরাক্রম এবং ধর্মকে রক্ষা করার অসীম সামর্থ্য। কিন্তু শাস্ত্রের দৃষ্টিতে বীর্য কেবল বাহুবল বা যুদ্ধজয়ের ক্ষমতা নয়। এটি সেই দিব্যশক্তি, যার দ্বারা ভগবান অধর্মকে দমন করেন। ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং ভক্তকে জীবনের সংগ্রামে জয়ী হওয়ার প্রেরণা দান করেন। শ্রীজগন্নাথ হলেন শ্রীকৃষ্ণ, আর কৃষ্ণ মানেই ধর্মরক্ষার অবিনাশী শক্তি। মথুরার অত্যাচারী কংস থেকে শুরু করে জরাসন্ধ, শিশুপাল, নরকাসুর— অসংখ্য অধার্মিক শক্তির বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর পরাক্রম কখনো ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জন্য ছিল না। সর্বদাই ছিল ধর্ম, ন্যায় ও মানব-কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য। তাই তাঁর শক্তি ধ্বংসের শক্তি নয়, ন্যায়ের শক্তি। জগন্নাথদেবের বীর্যকে বুঝতে হলে আমাদের কৃষ্ণলীলার দিকে ফিরে তাকাতে হয়। শিশু কৃষ্ণের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের কাহিনি। পুতনার বিষাক্ত স্তন্য, তৃণাবর্তের প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়, বকাসুর ও অঘাসুরের ভীষণ আক্রমণ— কোনো কিছুই তাঁকে বিচলিত করতে পারেনি। কৈশোরে কংসবধের মধ্য দিয়ে তিনি অত্যাচারের অবসান ঘটালেন। পরবর্তীকালে জরাসন্ধ ও শিশুপালের মতো প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও তিনি ধর্মের পক্ষেই অটল রইলেন। তাঁর সমগ্র জীবনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এক অবিরাম সংগ্রাম। 
তবে শ্রীজগন্নাথের বীর্য কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্বে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর প্রকৃত পরাক্রম মানুষের অন্তর্জগতে। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড়ো যুদ্ধ বাইরের জগতে নয়, নিজের অন্তরে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য— এই ষড় রিপুই মানুষের প্রকৃত শত্রু। বাহ্যিক শত্রুকে জয় করা অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু নিজের মনকে জয় করাই সর্বাপেক্ষা কঠিন। 
এই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের একটি ভাবনা বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি বলেছেন, ‘যে নিজের মনকে জয় করতে পারে, সেই প্রকৃত বীর।’ এই বাণীর মধ্যেই জগন্নাথের বীর্যতত্ত্বের গভীর অর্থ নিহিত। তিনি মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দেন না। তিনি মানুষের অন্তরে জাগিয়ে তোলেন আত্মবিশ্বাস, সংযম, নৈতিক সাহস এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার শক্তি। আজকের মানুষও এক কঠিন কুরুক্ষেত্রের মধ্যে বাস করছে। প্রতিযোগিতা, উদ্বেগ, লোভ, হিংসা, হতাশা এবং মূল্যবোধের সংকট আমাদের প্রতিনিয়ত আঘাত করছে। তিনি আমাদের শেখান, বাহ্যিক সাফল্যের চেয়ে চরিত্রের জয় বড়ো, অন্যকে পরাজিত করার চেয়ে নিজেকে জয় করা শ্রেয়। তিনি পাপীকে ঘৃণা করেন না। পাপ থেকে মুক্তির পথ দেখান। তিনি ভীত মানুষকে সাহস দেন। দুর্বল মানুষকে দৃঢ়তা দেন। হতাশ মানুষকে আশার আলো দেখান। তাঁর কৃপায় মানুষের অন্তরের অন্ধকার ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে ওঠে। এই কারণেই বিপদের মুহূর্তে, দুঃখের দিনে, জীবনের কঠিন পরীক্ষার সময় মানুষ আজও ব্যাকুল হৃদয়ে উচ্চারণ করে— ‘জয় জগন্নাথ’। এই নাম কেবল ভক্তির উচ্চারণ নয়। এটি সাহসের মন্ত্র, আত্মবিশ্বাসের মন্ত্র। ধর্মের পথে অটল থাকার অঙ্গীকার। 
অতএব বলা যায়, জগন্নাথের বীর্য কেবল কংসবধের পরাক্রমে নয়, মানুষের হৃদয়ে সত্য, ন্যায়, প্রেম ও আত্মজয়ের শক্তি জাগিয়ে তোলার মধ্যেই সর্বাধিক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই অন্তর্জয়ের মহাশক্তিই তাঁর ষড়ৈশ্বর্যের দ্বিতীয় এবং এক অনন্য প্রকাশ। 
ষড়ৈশ্বর্যের তৃতীয় গুণ যশ 
ভগবানের ষড়ৈশ্বর্যের তৃতীয় গুণ হল যশ। যশ অর্থ কেবল খ্যাতি নয়। যশ হল সেই মহিমা, যা দেশ, কাল ও জাতির সীমা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করে। শ্রীজগন্নাথের যশ এমনই এক চিরন্তন মহিমা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোটি কোটি মানুষের ভক্তি ও ভালোবাসার মাধ্যমে ক্রমাগত বিকশিত হয়েছে। জগন্নাথের যশের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ তাঁর রথযাত্রা। প্রতিবছর আষাঢ় মাসে পুরীর বড়োদাণ্ডে মানুষের যে মহাসমুদ্রের সৃষ্টি হয়, তা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ। বিশাল তিনটি রথ— নন্দীঘোষ, তালধ্বজ ও দর্পদলন— যখন ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়, রথের দড়ি স্পর্শ করার জন্য মানুষের ব্যাকুলতা দেখে মনে হয়, মানুষ যেন কেবল একটি রথ টানছে না। তারা ভক্তির টানে নিজের হৃদয়কে ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। 
জগন্নাথের এই বিশ্বজনীন যশকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। পুরীতে প্রথম জগন্নাথ দর্শনে তিনি এমন প্রেমাবিষ্ট হয়েছিলেন যে, ভাবসমাধিতে মন্দির প্রাঙ্গণে অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হতে থাকে, শরীরে প্রেমের অষ্ট-সাত্ত্বিকভাব প্রকাশ পায়। তিনি কাঠের মূর্তি দেখেননি। তিনি দর্শন করেছিলেন স্বয়ং প্রেমময় শ্রীকৃষ্ণকে। পরবর্তী জীবনের দীর্ঘ আঠারো বছর তিনি পুরীতেই অতিবাহিত করেন এবং তাঁর প্রেম, কীর্তন ও ভক্তির মাধ্যমে জগন্নাথের মাহাত্ম্য সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেন। আজ আর জগন্নাথের যশ কেবল পুরীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের নানা প্রান্তে, এমনকী বিশ্বের বহু দেশেও রথযাত্রা পালিত হয়। লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, সিডনি কিংবা সিঙ্গাপুর— যেখানেই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানেই নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতি ও নানা দেশের মানুষ একত্রিত হয়ে জগন্নাথের নামগান করেন। এই বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতাই তাঁর যশের সর্বোৎকৃষ্ট পরিচয়। 
ষড়ৈশ্বর্যের চতুর্থ গুণ শ্রী 
ভগবানের ষড়ৈশ্বর্যের চতুর্থ গুণ হল শ্রী। সাধারণ অর্থে শ্রী বলতে সৌন্দর্য, লাবণ্য, মাধুর্য ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত শোভাকে বোঝায়। কিন্তু শ্রীজগন্নাথের শ্রী প্রচলিত সৌন্দর্যবোধের গণ্ডি অতিক্রম করেছে। তাঁর রূপ প্রথম দর্শনেই দর্শককে বিস্মিত করে। বিশাল গোলাকার দু’টি নয়ন, সংক্ষিপ্ত বাহু, অসম্পূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ— এ যেন প্রচলিত মূর্তি-শিল্পের সমস্ত নিয়মকে অতিক্রম করে এক নতুন নন্দনতত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। এই রূপের সঙ্গে একটি সুপরিচিত লোক-প্রচলিত কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে। বলা হয়, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন ভগবানের মূর্তি নির্মাণ নিয়ে ব্যাকুল, তখন এক রহস্যময় বৃদ্ধ ছুতোর এসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি শর্ত রাখেন— একুশ দিন পর্যন্ত মন্দিরের দ্বার কেউ খুলবেন না। রাজা সেই শর্ত মেনে নেন। কিন্তু কয়েকদিন পরে ভেতর থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে রানি উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠেন। অবশেষে দরজা খুলে দেখা যায়, বৃদ্ধ আর নেই। আর মূর্তিগুলি অসম্পূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। রাজা গভীরভাবে মর্মাহত হলেন।

 তখন দৈববাণী হল— ‘এই রূপেই আমি পূজিত হতে চাই।’ 
জগন্নাথের সৌন্দর্য প্রচলিত নন্দনতত্ত্বের বিষয় নয়। এটি প্রেমের সৌন্দর্য, করুণার সৌন্দর্য এবং সর্বজনীনতার সৌন্দর্য। তাঁর রূপের আকর্ষণ বাহ্যিক পরিমাপে ধরা পড়ে না। অনুভব করতে হয় ভক্তির দৃষ্টিতে। যতবার তাঁর দর্শন করা যায়, ততবারই তাঁর রূপ নতুন অর্থে হৃদয়কে স্পর্শ করে। 
জগন্নাথ নীরব, কিন্তু তাঁর নীরবতাই যেন এক অনন্ত ভাষা। তাঁর বিশাল নয়ন আমাদের শেখায়— সংকীর্ণতা নয়, উদারতার দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখতে। তাঁর প্রসন্ন মুখমণ্ডল শেখায়— প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাবাদ হারিয়ে না ফেলতে। তাঁর অসম্পূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মনে করিয়ে দেয়— মানুষের চোখে যা অপূর্ণ, ঈশ্বরের দৃষ্টিতে তাই পূর্ণ হতে পারে। আর তাঁর রথযাত্রা শেখায়— মহত্ত্ব দূরে অবস্থান করার মধ্যে নয়, মানুষের কাছে নেমে আসার মধ্যেই। 
ষড়ৈশ্বর্যের পঞ্চম গুণ জ্ঞান 
ভগবানের ষড়ৈশ্বর্যের পঞ্চম গুণ হল জ্ঞান। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা, সর্বব্যাপী পরমাত্মা। মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ— কিছুই তাঁর অগোচর নয়। শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন— ‘বেদাহং সমতীতানি বর্তমানানি চার্জুন।’ অর্থাৎ, হে অর্জুন, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত জীবকে আমি জানি। 
এই সর্বজ্ঞতাই জগন্নাথের জ্ঞানের ভিত্তি। তিনি কেবল মানুষের মুখের ভাষা শোনেন না। তিনি হৃদয়ের নীরব আর্তিও উপলব্ধি করেন। জ্ঞান কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়। জ্ঞান হল সত্যকে উপলব্ধি করার শক্তি। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যে কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, জ্ঞানযোগ ও সমত্ববুদ্ধির শিক্ষা দিয়েছেন, তা মানবজীবনের চিরন্তন পথনির্দেশ। সেই শ্রীকৃষ্ণই জগন্নাথরূপে আজও মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোর দিকে আহ্বান জানান। রথযাত্রা একটি গভীর আধ্যাত্মিক মহালীলা। বাইরের দৃষ্টিতে দেখলে শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা বিশাল রথে চড়ে শ্রীমন্দির থেকে গুণ্ডিচাতে গেলেন। কিন্তু সাধকের দৃষ্টিতে মানুষের জীবনের এক মহাসত্য এর মধ্যে নিহিত। উপনিষদ বলছেন, ‘আত্মানম্‌ র঩থিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু।’ আত্মাকে রথের আরোহী এবং শরীরকে রথ বলে জানবে। আমাদের শরীর যেন এক রথ, ইন্দ্রিয়গুলি তার ঘোড়া, মন তার লাগাম এবং বুদ্ধি তার সারথি। এই রথকে সঠিক পথে পরিচালিত করাই সাধনার উদ্দেশ্য। গুণ্ডিচা মন্দির আসলে ভক্তের হৃদয়। হৃদয় যখন কামনা, বাসনা, অহংকার ও স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত হয়, তখন ভগবান সেখানে বিরাজ করেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর গুণ্ডিচা-মার্জন লীলা আসলে চিত্তশুদ্ধির প্রতীকী লীলা। 
রথের দড়ি টানার মধ্যেও রয়েছে একটি আধ্যাত্মিক প্রতীক। লক্ষ লক্ষ মানুষ একসঙ্গে সেই দড়ি ধরে টানেন। এটি যেমন সকলের মিলিত প্রচেষ্টার ফলে সম্ভব, ঠিক সেইভাবে জীবনের রথকে ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সমস্ত শুভ শক্তির সহযোগিতা প্রয়োজন। মানুষের জীবন, সভ্যতা, রাজত্ব, সম্পদ— সবই পরিবর্তনশীল। কিন্তু ঈশ্বরের করুণা ও সত্য চিরন্তন। রথের দিকে তাকালে মনে হয়, মানবজীবনও এক যাত্রা। 
ষড়ৈশ্বর্যের পরম গুণ বৈরাগ্য
ভগবানের ষড়ৈশ্বর্যের ষষ্ঠ এবং পরম গুণ হল বৈরাগ্য। বৈরাগ্য মানে সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বৈরাগ্য হল সব কিছুর অধিকারী হয়েও কোনো কিছুর প্রতি আসক্ত না থাকা। যাঁর কিছুই নেই, তাঁর অনাসক্ত হওয়া সহজ। কিন্তু যাঁর সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উপর অধিকার, তিনিই প্রকৃত অর্থে বৈরাগ্যের পূর্ণ প্রকাশ ঘটাতে পারেন। সেই পরম বৈরাগ্যের জীবন্ত প্রতিমূর্তি শ্রীজগন্নাথ। 
স্বর্ণ, রত্ন, ঐশ্বর্য, ক্ষমতা— সবই তাঁর। তবু তিনি রাজপ্রাসাদের আড়ালে নিজেকে আবদ্ধ রাখেন না। প্রতিবছর রথযাত্রার দিনে তিনি মন্দিরের গর্ভগৃহ ত্যাগ করে রাজপথে নেমে আসেন। এই কারণেই রথযাত্রা বৈরাগ্যের এক অপূর্ব প্রতীক। মহিমার শিখরে অধিষ্ঠিত হয়েও মানুষের কাছে নেমে আসা, দূরত্ব সৃষ্টি না করে আপন করে নেওয়া— এই বিনয়ই প্রকৃত মহত্ত্ব। ভগবান মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য নিজেই এগিয়ে আসেন, এই করুণার মধ্যেই তাঁর বৈরাগ্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ। 
জগন্নাথের ভক্তের অসংখ্য কাহিনি আজও লোকমুখে প্রচলিত। তার মধ্যে দাসিয়া বাউরির কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত সম্প্রদায়ের একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি। ধনসম্পদ ছিল না, সামাজিক প্রতিষ্ঠাও ছিল না। কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল নির্মল ভক্তিতে পরিপূর্ণ। লোক-প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, তিনি এক তীর্থযাত্রীর হাতে একটি নারকেল দিয়ে জগন্নাথের উদ্দেশে নিবেদন করেছিলেন। ভক্তসমাজ বিশ্বাস করে, শ্রীজগন্নাথ সেই সামান্য নিবেদনও সস্নেহে গ্রহণ করেছিলেন। এই কাহিনি আমাদের শিক্ষা দেয়, ভগবানের কাছে বাহ্যিক ঐশ্বর্যের কোনও মূল্য নেই। আন্তরিক ভক্তিই তাঁর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য। 
একইভাবে ভক্তকবি সালবেগের জীবনও জগন্নাথের বৈরাগ্য ও সর্বজনীন করুণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জন্ম-পরিচয়ের কারণে যিনি মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেননি, সেই ভক্তের আকুল প্রার্থনায় রথ থেমে গিয়েছিল— এমন লোক-প্রচলিত বিশ্বাস আজও মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত। জগন্নাথ মানুষের জন্ম-পরিচয় দেখেন না। তিনি দেখেন ভক্তির আন্তরিকতা। আর এই কারণেই ভক্তকবি সালবেগ আজও জগন্নাথ-ভক্তির আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলজ্বল করছেন। তাঁর রচিত অসংখ্য ভজন আজও ওড়িশাতে ঘরে ঘরে গাওয়া হয়। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় জগন্নাথের কাছে ভক্তিই প্রধান। 
জগন্নাথের বৈরাগ্য ত্যাগের মধ্যে নয়, করুণার মধ্যে। তিনি নিজের মহিমাকে কখনো অহংকারের কারণ করেন না। সেই মহিমাকে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করেন। তাই তাঁর বৈরাগ্য বিচ্ছিন্নতার নয়। সর্বজনীন ভালোবাসার বৈরাগ্য। উদাসীনতার নয়, সীমাহীন অনুগ্রহের বৈরাগ্য। 
পরিশেষে বলি, সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে। পুরীর আকাশে সমুদ্রের স্নিগ্ধ বাতাস বয়ে যায়। শ্রীমন্দিরের সুউচ্চ শিখরে পতপত করে উড়তে থাকে পতাকা। যুগের পর যুগ ধরে অগণিত মানুষ এখানে এসেছে— সেউ এসেছে কৃতজ্ঞতা জানাতে, কেউ এসেছে অশ্রু বিসর্জন দিতে, কেউ বা এসেছে ভগ্ন হৃদয়ের ভার লাঘব করতে। সময় বদলেছে, সভ্যতার রূপ পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু নীলাচলের সেই চিরন্তন প্রভু আজও একই করুণাদৃষ্টিতে বিশ্বমানবতার দিকে চেয়ে রয়েছেন। তাঁর বিশাল দু’টি নয়নে যেন সমগ্র সৃষ্টি-জগতের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, প্রেম ও প্রার্থনা একাকার হয়ে রয়েছে। 
মানুষের জীবনে কত আকাঙ্ক্ষা, কত ব্যর্থতা, কত প্রাপ্তি, কত হারিয়ে যাওয়া! তবু এই সবকিছুর মধ্যেও মানুষের অন্তর খোঁজে এক নিরাপদ আশ্রয়, এক অকৃত্রিম ভালোবাসা, এক অবিনশ্বর শান্তি। শ্রীজগন্নাথ সেই আশ্রয়েরই নাম। তিনি আমাদের শেখান— ঐশ্বর্যের চেয়ে করুণা বড়ো। শক্তির চেয়ে ধর্ম বড়ো। জ্ঞানের চেয়ে প্রজ্ঞা বড়ো। আর সমস্ত ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষের পরিচয় তার নির্মল ভক্তি। হয়তো জীবনের কোনও এক ক্লান্ত সন্ধ্যায়, সমস্ত হিসাব-নিকাশের শেষে, মানুষ উপলব্ধি করে— পৃথিবীতে স্থায়ী বলে কিছু নেই। সম্পদ, সম্মান, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি— সবই একদিন পেছনে পড়ে থাকে। তখন অন্তরের গভীর থেকে একটি নামই ভেসে ওঠে— জগন্নাথ। আর সেই নামের মধ্যে আছে ভরসা, আছে শান্তি, আছে অনন্তের স্পর্শ। তাই অগণিত ভক্তের সঙ্গে আমরাও প্রার্থনা করি— হে নীলাচলের নাথ, আমাদের জীবনরথের সারথি হয়ে থাকুন, আপনার করুণা দৃষ্টি যেন কখনো আমাদের ছেড়ে না যায়। ‘জগন্নাথ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ