অরুণাভ দত্ত: নীলাচল ভূবৈকুণ্ঠ। এই স্থান দারুময় সনাতন ব্রহ্মরূপী জগন্নাথের নিত্যলীলাক্ষেত্র, বিষ্ণুপ্রিয়া লক্ষ্মীও এ স্থানে অচলা। তাই তো নীলাচলের আরেক নাম শ্রীক্ষেত্র। ‘শ্রী’ অর্থাৎ দেবী লক্ষ্মী এই ক্ষেত্রে তাঁর প্রাণেশ্বরের সেবার জন্য সদাই উন্মুখ। জগন্নাথের সেবা! সে কি চারটিখানি কথা! তাঁর নিত্যসেবার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর ভোগ। আর জগন্নাথের আহারের বাহার, সে তো জগদ্বিখ্যাত। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন জগন্নাথের কাছে বর চেয়েছিলেন, প্রভু, শ্রীমন্দিরে সারাদিন তোমার ভোজন চলতে থাকবে, তোমার হাতের আঙুল কখনো শুকোবে না। তাই প্রত্যূষে, পূর্বাহ্ণে, মধ্যাহ্নে, অপরাহ্ণে, সায়াহ্নে—ঘণ্টায় ঘণ্টায় রকমারি পদ রান্না হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে জগন্নাথদেবের সমুখে। পাচকদের দম ফেলার ফুরসত নেই। মন্দিরের বিরাট হেঁশেলে উদয়াস্ত অভিনব পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে নানা রকমের অন্ন, ব্যঞ্জন, খাজা, গজা, পিঠে, পানা। কথিত আছে, দেবী লক্ষ্মীর কৃপাতেই জগন্নাথের নিত্য ভোগরাগ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। উৎকলখণ্ডও সাক্ষ্য দিচ্ছে, ‘স্বয়ং লক্ষ্মী দেবীই ঐ সমস্ত পাক করেন এবং মূর্তিমান সাক্ষাৎ নারায়ণ নিত্য সেই কমলার স্বহস্ত নিষ্পাদিত অন্নাদি ভোজন করেন।’ (সপ্তত্রিংশোঽধ্যায়ঃ, ২১) শোনা যায়, জগন্নাথের সকালধূপ বা রাজভোগের তালিকায় যে চাঁপানটে শাক থাকে, লক্ষ্মীর রাঁধা সেই শাক না হলে জগন্নাথের ভোগই হয় না।
জগন্নাথ খেয়ে সুখী হন, লক্ষ্মী সুখী হন তাঁকে খাইয়ে, আর আমরা পরম সুখী হই প্রভুর মহাপ্রসাদ ধারণে— বহুকাল ধরে চক্রটা এভাবেই ঘুরে আসছে। শুধু আষাঢ়ের কয়েকটা দিন, যখন জগন্নাথ তাঁর দাদা আর বোনকে নিয়ে মাসিমার বাড়িতে যান এবং সেখানেই তাঁর ভোগরাগ সম্পন্ন হয়, তখন জগন্নাথ মন্দিরে দেবী লক্ষ্মীর হেঁশেল সেই ক’টা দিনের জন্য বন্ধ থাকে।
রথযাত্রায় জগন্নাথের মোক্ষলীলা। মানুষকে দেবতা করবেন বলে, মোক্ষদ্বারের আগল খুলে দেবেন বলে রথে চড়ে পথে নামেন জগন্নাথ। আবার এই রথযাত্রার পর থেকে উলটোরথ এবং নিজের মন্দিরে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত তিনি দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে এক অপরূপ লীলায় মাতেন।
আমরা বলি উলটোরথ, শাস্ত্র বলে পুনর্যাত্রা, আবার স্থানীয়দের মুখে সেটা ‘বহুড়া যাত্রা’। আষাঢ় মাসে শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার তিনটি রথ যে পথ ধরে মূলমন্দির থেকে গুণ্ডিচামন্দিরে যায় শুক্লা একাদশীর দিন আবার সেই পথ ধরেই রথগুলি উলটো দিকে অর্থাৎ গুণ্ডিচা বাড়ি থেকে শ্রীমন্দিরের উদ্দেশে পুনরায় যাত্রা করে। পদ্মপুরাণে আছে, রথযাত্রার পরে সাতদিন এই রথ নদীতীরে রেখে অষ্টম দিনে নানা প্রকার ভূষণে সজ্জিত করে নবম দিনে পুনর্যাত্রা করাই বিধেয়।
জগন্নাথের ‘মাসিমার বাড়ি’ নামে খ্যাত যে গুণ্ডিচা মন্দির, সেই স্থান সম্পর্কে স্কন্দপুরাণের বিষ্ণুখণ্ডে জগন্নাথ বলেছেন যে, পৃথিবীতে গুণ্ডিচার থেকে পবিত্রতম স্থান আর নেই। কোনো মতে, গুণ্ডিচা দেবী হলেন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের রানি, আবার তিনি ‘অর্ধাসনী’ নামেও খ্যাত। গুণ্ডিচা মন্দিরেই জগন্নাথ আবির্ভূত হন এবং রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সেখানে সহস্র অশ্বমেধযজ্ঞ করেন। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মূল মন্দিরের রত্নবেদি ছেড়ে গুণ্ডিচা মন্দিরের সেই পবিত্র যজ্ঞবেদিতেই উলটোরথের দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন।
জানা যায়, রথযাত্রার দিন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা সারা রাত গুণ্ডিচা মন্দিরের বাইরে নিজেদের রথেই অবস্থান করেন। পরদিন সাঁঝবেলায় তাঁরা মন্দিরের যজ্ঞবেদিতে আসীন হন। এদিকে জগন্নাথ মন্দিরের আকাশ তখন অভিমানে কালো হয়ে যায়। কারণ প্রভু তাঁর প্রিয় পত্নীকে না নিয়েই মাসির বাড়ি চলে গিয়েছেন। তাই অভিমানিনী লক্ষ্মীর ওই ক’দিন আর রাজভোগে রুচি থাকে না, শুধু ডালিয়া আর শাক হলেই তাঁর চলে যায়।
রথযাত্রার চতুর্থ দিনটি হল ‘হেরাপঞ্চমী’। ‘হেরা’ শব্দের অর্থ দেখা বা দর্শন। জগন্নাথের উপর অভিমান করলে কী হবে, চার দিন স্বামীর কোনো খবরাখবর না পেয়ে লক্ষ্মীর প্রাণ আনচান করে ওঠে। তিনি আর গোঁসা করে বসে থাকতে পারেন না। যমেশ্বর শিব আর সেবিকাদের সঙ্গে নিয়ে হেরাপঞ্চমীর দিন লক্ষ্মী রওনা দেন গুণ্ডিচামন্দিরের উদ্দেশে। জগন্নাথ মন্দিরের পান্ডারা প্রত্যুষে লক্ষ্মীর প্রতিনিধি বিগ্রহকে স্নান করিয়ে, বসন ও অলংকারে সাজিয়ে পালকিতে করে হেরাগৌরীসাহি গলি ধরে গুণ্ডিচাবাড়িতে নিয়ে যান। সঙ্গে থাকে লক্ষ্মীর সেবিকারূপে পান্ডাদের গৃহিণীরা।
লক্ষ্মী গুণ্ডিচামন্দিরের প্রথম দ্বারে পৌঁছালে জগন্নাথের সেবক দয়িতারা দ্বার আগলে দাঁড়ান। দেবীর সেবিকারা জগন্নাথকে মন্দিরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান। দু’পক্ষের বাদানুবাদ শুরু হয়। লক্ষ্মীর সেবিকারা গর্ভমন্দিরের দরজার ফাঁক দিয়ে জগন্নাথকে এক ঝলক দেখে নেন এবং লক্ষ্মীর কাছে ফিরে সেই সংবাদ দেন। এদিকে লক্ষ্মী এসেছেন জেনে জগন্নাথ তাঁর পান্ডার মাধ্যমে লক্ষ্মীর কাছে পাঠিয়ে দেন ‘আজ্ঞামালা’, যদি লক্ষ্মীর মান ভাঙে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। লক্ষ্মী সেই মালা হাত পেতে নেন বটে, কিন্তু তাতে অভিমানের বরফ গলে না। কারণ জগন্নাথ তখনও মন্দিরে ফিরে যেতে রাজি নন। রুষ্ট হয়ে লক্ষ্মী গুণ্ডিচা মন্দির থেকে বেরিয়ে আসেন, আর দেখেন বাইরে দাঁড় করানো আছে জগন্নাথের রথ নন্দীঘোষ। রথ দেখে লক্ষ্মী দ্বিগুণ ক্রোধে জ্বলে ওঠেন। তাঁর আদেশে এক সেবিকা নন্দীঘোষের একটি চাকার অংশ ভেঙে দেন। মন্দিরের বাইরে এক বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মী রথভঙ্গ চাক্ষুষ করেন। তার পর তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় শ্রীমন্দিরে।
জগন্নাথদেবের গুণ্ডিচামন্দিরে অবস্থানকালীন যেন প্রেমের হাট বসে। রথযাত্রার সপ্তম দিনে সন্ধ্যারতির পর প্রভুর বিশেষ ‘সন্ধ্যাদর্শন’ হয়। হেরাপঞ্চমীর পরদিন তিনটি রথকে দক্ষিণ-পশ্চিম মুখে ঘুরিয়ে রাখা হয়। কারণ জগন্নাথ মন্দিরের অবস্থান গুণ্ডিচার ঠিক দক্ষিণ দিকে।
পদ্মপুরাণে আছে, জগন্নাথরূপী শ্রীবিষ্ণুর দক্ষিণাভিমুখে যাত্রা অতি দুর্লভ ও মুক্তিপ্রদায়িনী। স্কন্দপুরাণও জগন্নাথের পুনর্যাত্রার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ওই পুরাণের বিষ্ণুখণ্ডে জৈমিনি বলছেন যে, ভগবান বিষ্ণুর পুনর্যাত্রা অতি দুর্লভ। রথযাত্রা এবং পুনর্যাত্রা দুই-ই মুক্তিদায়ক। রথে আরূঢ় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে গুণ্ডিচামণ্ডপ থেকে দক্ষিণ অভিমুখে যাত্রা করতে দেখলে মানুষ মোক্ষ লাভ করে। উলটোরথের দিন যে ব্যক্তি রথের সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে জগন্নাথকে গমন করতে দেখে, সে প্রতি পদক্ষেপে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল পায়। জগন্নাথকে নীলাচলে আগমন করতে দেখলে সে ব্যক্তি অন্তিমে অবশ্যই বৈকুণ্ঠে যায়।
পুনর্যাত্রার দিন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রথে আসীন হলে পুরীর রাজা এসে সোনার ঝাড়ু দিয়ে ‘ছেরাপহরা’ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। আগে হলধরের রথ ‘তালধ্বজ’, মাঝে সুভদ্রার রথ ‘পদ্মধ্বজ’ বা ‘দর্পদলন’ এবং পিছে জগন্নাথের ‘নন্দীঘোষ’ ধীরে ধীরে শ্রীমন্দিরের দিকে এগিয়ে চলে। বিদায়কালে রথ তিনটি শ্রদ্ধাবালির উপর দিয়ে অর্ধাসনী দেবী বা মাসিমার কাছে পৌঁছালে তিন দেবতাকে মাসিমার পক্ষ থেকে আটার তৈরি ‘পোড়াপিঠা’ দেওয়া হয়।
লক্ষ ভক্তের প্রেমের টানে ভাসতে ভাসতে নন্দীঘোষ যখন রাজার প্রাসাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন লক্ষ্মী জানতে পারেন তাঁর আগমনসংবাদ। তিনি পালকিতে চড়ে স্নানবেদির কাছে চাহনিমণ্ডপে এসে জগন্নাথকে এক ঝলক দেখে নেন। তার পর রথের কাছে এসে রথ পরিক্রমা করেন। একে ‘লক্ষ্মীনারায়ণ ভেট’ বলা হয়। জগন্নাথ প্রেমের চিহ্নস্বরূপ তাঁর দয়িতাপতিদের মাধ্যমে কণ্ঠের একগাছা মালা লক্ষ্মীর কাছে পাঠিয়ে দেন। সেই মালা নিয়ে লক্ষ্মীর প্রস্থানের পর জগন্নাথের রথ মন্দিরের সিংহদ্বারের সামনে এসে দাঁড়ায়। সেইদিন সারা রাত রথের উপরেই তাঁর পুজো ও ভোগরাগ সম্পন্ন হয়।
পরদিন একাদশী তিথিতে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা ‘সুনাবেশ’ বা ‘স্বর্ণবেশ’ ধারণ করেন। জগন্নাথের দু’ হাতে সোনার চক্র ও রুপোর শঙ্খ, হলধরের দু’হাতে সোনার লাঙল ও গদা এবং সুভদ্রার হাতে দেওয়া হয় সোনার পদ্ম। সেইসঙ্গে সোনার চরণ, শিরে সোনার মুকুট ও পরনে বেনারসি থাকে। এই তিথি ছাড়াও বগুড়া একাদশী, দশেরা এবং মাঘ, কার্তিক ও পৌষ পূর্ণিমায় তিন দেবতাকে স্বর্ণবেশে সুসজ্জিত করা হয়।
ওইদিন সন্ধ্যায় পালিত হয় ‘অধরপনা’ উৎসব। দেবতাদের অধর সমান উঁচু তিনটি মাটির পাত্রে একটি বিশেষ পানা বা শরবত নিবেদন করা হয়। দেড় মন খণ্ড বা চিনি ও চার হাঁড়ি দুধের সরের সঙ্গে বাহান্ন কলসি জল দিয়ে বড়ো এলাচ গুঁড়ো ও গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে পনা বা শরবত প্রস্তুত করা হয়। ভোগ নিবেদনের পর মাটির পাত্রগুলি রথের উপরেই ভেঙে দেওয়া হয়।
পরদিন দেবতাদের রত্নবেদিতে ফিরে যাওয়ার উৎসব ‘নীলাদ্রি বিজে’ বা ‘নীলাদ্রিবিজয়’। সেদিন সন্ধ্যায় রথযাত্রার দিনের মতো সুদর্শন, বলরাম, সুভদ্রা নির্বিঘ্নে সেবকদের কাঁধে চড়ে শ্রীমন্দিরে চলে যান। কিন্তু জগন্নাথকে নিয়ে পান্ডারা যেই সিংহদ্বারে পৌঁছান, অমনি লক্ষ্মীর সেবিকারা এসে সিংহদ্বার বন্ধ করে দেন। এতদিন ধরে জগন্নাথ মাসির বাড়ির আদরে ভুলেছিলেন লক্ষ্মীর কথা একবারও ভাবেননি। সেই নিয়ে সেবিকাদের সঙ্গে জগন্নাথের সেবক দয়িতাপতিদের ঝগড়াঝাঁটি শুরু হয়।
দয়িতাপতিরা তর্কে জিতে যাওয়ায় জগন্নাথকে নিয়ে সিংহদ্বার পেরিয়ে খানিক এগিয়ে যান। কিন্তু লক্ষ্মীর সেবিকারা পরবর্তী জয়বিজয়দ্বার বন্ধ করে দেন। সেখানেও দু’পক্ষের মধ্যে আরেক প্রস্থ কথা-কাটাকাটি, মান-অভিমানের পালা।
শেষে লক্ষ্মীর মান ভাঙানোর জন্য জগন্নাথ শেষ উপায় অবলম্বন করেন। উপহারস্বরূপ লক্ষ্মীর হাতে তুলে দেন এক হাঁড়ি রসগোল্লা। সেইসঙ্গে প্রতিশ্রুতিও দেন যে, পরের বার তিনি লক্ষ্মীকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। জগন্নাথের হাতে মিষ্টিমুখ করে লক্ষ্মীর অভিমান গলে জল। এবার জগন্নাথ তাঁর মন্দিরে প্রবেশের ছাড়পত্র পান। জগন্নাথ ও লক্ষ্মীর মধ্যে শুভদৃষ্টি বিনিময় ও মালাবদল করে পুনর্মিলন হয়।
শেষপাতে মিষ্টির মতো রথযাত্রা উৎসবের সমাপ্তিতে লক্ষ্মী-জগন্নাথের এই সুমধুর মিলনোৎসবের সাক্ষী থাকে লক্ষ লক্ষ প্রাণ। সেই লক্ষাধিক প্রাণের ঈশ্বর লক্ষ্মীর মন জয় করে বলরাম ও সুভদ্রার সঙ্গে উপবিষ্ট হন রত্নবেদীতে।