Bartaman Logo
১৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / বিশেষ ক্রোড়পত্র

রথের মেলা

পুরীর রথযাত্রা ও গুপ্তিপাড়ার ৬৩০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে বিশাল মেলা। রথের দিনে হাজারো মানুষের সমাগম। বিস্তারিত পড়ুন।

রথের মেলা
  • ১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অরুণ মুখোপাধ্যায়: রথের মেলা সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই পুরীর রথযাত্রা নিয়ে কিছু বলতেই হয়। পুরীর রথযাত্রার সূচনা মেলায় রূপ নেয় অক্ষয় তৃতীয়া থেকে। অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্য দিবসে রথ গড়ার কাজ শুরু হয়। রথযাত্রার দিন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা তিনজনেই আলাদা আলাদা রথে চেপে শ্রীমন্দির থেকে গুণ্ডিচাবাড়ির দিকে যাত্রা করেন। তার সঙ্গে সঙ্গে আইসক্রিম, শোনপাপড়ি, ঝালমুড়ি, ফুচকা, ভুট্টা, হাওয়া ঘূর্ণি, নাগরদোলা, বাঁশি, বেলুন, মাদারি কা খেল, নারকোল কোরা সবই চলে যায়। পুরীর রথযাত্রায় রাস্তার দু’পাশে অত্যন্ত আকর্ষণের বিষয় থাকে রঘুরাজপুরের পটশিল্প এবং নানা শিল্পীদের অঙ্কিত পটচিত্র।

Advertisement

শ্রীপাট মাহেশ হুগলির শ্রীরামপুরে অবস্থিত। এখানে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এবার রথের ৬৩০ বছর। মাহেশ বিখ্যাত তার স্নান যাত্রার জন্য। হুতোম প্যাঁচার নকশায় কালীপ্রসন্ন সিংহ তো মাহেশের স্নানের বিবরণ রেখেছেন, রথযাত্রা বিষয়ে লিখেছেন। রথের মেলার বর্ণনা দিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রাধারানি নামক বালিকাকে মাহেশে পাঠিয়ে তাকে অমর করে দিয়েছেন। কথায় আছে, ‘নীলাচলে পুরুষোত্তম জগন্নাথ নাম। সেই নাম প্রকট হয় মাহেশের ধাম।’ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মাহেশ এসেছিলেন। দ্বাদশ গোপাল মহোৎসব পালন করেছিলেন। সেই স্মৃতিকে সম্বল করে এখনও রথযাত্রা ও পুনর্যাত্রার মধ্যে যে রবিবার থাকে সেই দিন দ্বাদশ গোপাল উৎসব পালিত হয়। শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর ১২ জন পার্ষদকে নিয়ে মধ্যবর্তী রবিবারটিতে মাহেশে রথের চারপাশে নৃত্য করেছিলেন। এখনও সেই দিন সকাল থেকে কীর্তন চলে আর বিরাট মেলা বসে যায়।
রথযাত্রা উপলক্ষ্যে গুপ্তিপাড়ায় খুব বড়ো মেলা হয়। ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে গুপ্তিপাড়ায় রথযাত্রা উপলক্ষ্যে লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ হয়েছিল। রথের মেলা দেখতে যাওয়ার সময় একটি নৌকা উলটে ৪৫ জন লোকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছিল। ‘কলিকাতা রিভিউ’ নামক পত্রিকায় রেভারেন্ড লং সাহেব এই কথা উল্লেখ করেছেন। গুপ্তিপাড়ায় স্নানযাত্রায়, রথযাত্রায়, ভাণ্ডার-লুঠের দিনে এবং পুনর্যাত্রায় মানুষের আগমন এবং তার মেলায় রূপান্তর দেখার মতো। এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ হল বাজারে হিমসাগর, ফজলি আম এবং কাঁঠালের সম্ভার। মেলায় যাঁরা আসেন তাঁরা কাঁঠাল কিনে মেলায় ভেঙে মুড়ি দিয়ে খান। এটা ২৮৭ বছরের গুপ্তিপাড়ার রথের মেলার অবশ্য বৈশিষ্ট্য। কাঠের আসবাবপত্র, কাঠের জিনিস, লোহার জিনিস, কলমের নানা জাতের গাছ, মনিহারি দ্রব্যাদি নিয়ে বিক্রেতারা দোকান খুলে বসে। আড়াইশো বছরের বেশি প্রাচীন রথ রয়েছে চন্দননগর শহরে। লক্ষ্মীগঞ্জ বাজার থেকে রথ এগিয়ে চলে তালডাঙা পর্যন্ত। যাদবেন্দু ঘোষ বা যাদু ঘোষ নামক এক বিখ্যাত চাল ব্যবসায়ী, জগন্নাথের পরম ভক্ত, তিনি ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে পুরীতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় যাওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি পথে দেবতার স্বপ্নাদেশ পান। ফিরে আসেন তাঁর শহর চন্দননগরে। গঙ্গার তীরে তিনি নিম কাঠের জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার মূর্তি নির্মাণ করেন।  ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে (অন্য মত ১৭৯৮ খ্রি.) তিনি নিম কাঠের রথ তৈরি করেন। সেই রথ নষ্ট হয়ে যায় কালের নিয়মে। তারপর ১৯৬২ সালে নতুন লোহার রথ তৈরি হয়, যা এখনও চলছে। জগন্নাথের রথযাত্রা উপলক্ষ্যে চন্দননগরে বিরাট মেলা বসে সারা জি টি রোড ধরে। হুগলির তালচিনান সানিহাটি, সুলতানগাছায়, আঁটপুরে জগন্নাথদেবের, হোয়েরায় নারায়ণজিউর, বেঙ্গাই গ্রামে শ্যামরায়ের রথযাত্রা উপলক্ষ্যে মেলা বসে। দশঘড়ার বিশ্বাস পরিবারের কুলদেবতা গোপীনাথজিউকে কেন্দ্রে রেখে আষাঢ় মাসে রথযাত্রা উৎসব ও মেলা হয়। প্রজাবৎসল রানি জানকী দেবী প্রজাদের অনুরোধে এক মিলনমেলাকে উপলক্ষ্য করে ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে মহিষাদলে প্রথম রথযাত্রার আয়োজন করেন। রথের নকশা করেছিলেন মঁসিয়ে পেরু নামে এক ফরাসি ভাস্কর। ২৫০ বছরের প্রাচীন এই রথের মেলায় মূলত গ্রামীণ কৃষি ও কুটিরশিল্প সম্ভার প্রচুর পরিমাণে থাকে। রাজবাড়ি থেকে গুণ্ডিচাবাড়ি পর্যন্ত রথ যাওয়ার পথে বসে অনেক রকমের দোকান। মনিহারি দোকান, নাগরদোলা, মরণকূপ, ম্যাজিক, ছোটো চিড়িয়াখানা। এমনকি সারা বছর পরিবারের প্রয়োজনে লাগে এমন দরকারি জিনিসপত্র, কৃষকদের ব্যবহারের নানা সরঞ্জাম। সারা মেদিনীপুরের মানুষ এই তমলুকের মহিষাদলের রথের মেলায় এসে কৃষিজাত দ্রব্য ও কৃষিকাজে লাগে এমন উপকরণ কিনে নেন।
মেদিনীপুরের আনন্দপুর গ্রামে রথযাত্রায় গোপালজিউর রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষ্যে চকবাজারের রাস্তার ধারে মেলা বসে। ২৭৫ বছরের প্রাচীন এই মেলা। লোয়াদা গ্রামে দেড়শত বছরের প্রাচীন রাধাবল্লবজিউর রথযাত্রা এবং তেঘরি বাড়কমল গ্রামের আড়াইশো বছরের প্রাচীন রথযাত্রা উপলক্ষ্যে মেলা বসে। কাঁথড়া গ্রামে রাধাগোবিন্দজিউ-এর রথযাত্রা, বাসুদেবপুর গ্রামে, জাড়া, শ্রীনগর গ্রামে মহাপ্রভুর রথযাত্রা, সাওড়দা গ্রামে গোপীনাথজিউ-এর রথযাত্রা, গহবী গ্রামে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা, কসবা নারায়ণগড়ে, বল্লুক, মধুপুর গ্রামে, দেখালি গ্রামে রথের মেলা বসে। বাহিরিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় ‘রথদাঁড়’ নামক পরিচিত প্রাঙ্গণে বিশাল মেলা বসে। বাহিরির মেলাটি অতি প্রাচীন। মিষ্টান্ন, চিঁড়েভাজা, তেলেভাজা, তামা, পিতলের থালা-বাসন, মনিহারি, লাঙ্গল, জোয়াল, দা ইত্যাদি এই মেলায় পাওয়া যায়। কাঁথি-দীঘা রাস্তার ওপর বাগপুরা গ্রামে জগন্নাথদেবের যে রথের মেলাটি হয় তা ৩৫০ বছরেরও প্রাচীন। লালগড়ে স্থানীয় জমিদার পরিবারের কুলদেবতা রাধামোহনজিউর রথযাত্রা প্রায় দেড়শো বছরের প্রাচীন। দশ দিন ধরে এখানে মেলা উৎসব চলে।
হাওড়া জয়পুরের ঝিখিরা গ্রামের মল্লিক বাড়ির পারিবারিক রথটি ১৩০২ বঙ্গাব্দে হরিনারায়ণ মল্লিক সূচনা করেছিলেন। এই রথযাত্রা ক্রমশ সর্বজনীনে রূপান্তরিত হয়েছে। মল্লিক বাড়ির আরাধ্য দেবতা দামোদরজিউ। এখানকার মেলার আকর্ষণ হল কাঠের পুতুল নাচ। হাওড়ার বেলকুলাই গ্রামে জগন্নাথের, জগৎবল্লভপুর গ্রামে রাধাগোবিন্দের, কামিনা গ্রামে অনন্তদেবের রথযাত্রা, বীরশিবপুরে, বাগান্ডা গ্রামে রথযাত্রায় মেলা উপলক্ষ্যে নানা রকমারি জিনিসের কেনা বেচা হয়। বর্ধমানের উখরায় রথযাত্রা উপলক্ষ্যে বিরাট মেলা বসে। সেখানকার প্রধান বিগ্রহ গোপীনাথ জিউ দেবী রাধিকা সহ রথে আরোহণ করেন এবং রথ টানা হয়। লক্ষ লক্ষ যাত্রীর সমাগম হয় এবং রাস্তার দু’পাশে নানা ধরনের দোকান বসে। তালপাতার জিনিস, মাটির খেলনা, মাটির বাসন, লোহার জিনিসপত্র, সুতা, বঁড়শি— এই ধরনের দোকান বসে। এই মেলাটি স্থানীয় জমিদার শ্রীলাল সিংহ প্রচলন করেছিলেন। বর্ধমানের কাজোরা গ্রামে আষাঢ় মাসের রথযাত্রা উপলক্ষ্যে গ্রামের শিবমন্দির সংলগ্ন জমিতে একদিনের জন্য একটি প্রাচীন মেলা বসে। বর্ধমানের ঝাড়ুল গ্রামে আষাঢ়ে রথযাত্রায় মেলা বসে। পুরুলিয়ার বলরামপুর গ্রামে রথযাত্রা উপলক্ষ্যে জগন্নাথ মন্দির সংলগ্ন স্থানে আটদিনব্যাপী মেলা হয়। মেলাটি প্রায় ১০০ বছরের কাছাকাছি। মিষ্টির দোকান, তেলেভাজা, মনিহারি, বাসন-কোসন, ছবিসহ বই, কাপড়চোপড়, মাটির হাঁড়ি, বাচ্চাদের খেলনা, বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসপত্রের একশোর বেশি দোকানপাট বসে। আমোদের জন্য থাকে নাগরদোলা, সার্কাস, ম্যাজিক, ছৌ নাচ, সাঁওতালি নাচ ও কীর্তন।
বাঁকুড়ার নড়রা গ্রামে রথ ও উলটো রথের দিন মেলা বসে। প্রায় দেড়শো বছরের প্রাচীন এই মেলায় মিষ্টান্ন, মনিহারি, বাসন, কাপড়, তাল পাতার বাঁশি, পাখা, মাটির খেলনা পুতুল ইত্যাদি বিক্রি হয়। বাঁকুড়া শহরে আষাঢ় মাসে জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় পিতলের রথ বের হয়। বাঁকুড়ার তিলুড়ি গ্রামে রথযাত্রার মেলায় বেতের তৈরি জিনিসপত্র বেশি পাওয়া যায়। আমোদপ্রমোদের জন্য থাকে সত্যপীরের গান, মনসামঙ্গল, কবিগান, নাচ, ঝুমুর, যাত্রা, থিয়েটার। বিবড়দা গ্রামে রথের মেলায় কৃষি সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি এবং বাসন বেশি বিক্রি হয়। সং নাচ এখানকার মেলার একটি বৈশিষ্ট্য। বাঁকুড়ার কুচিয়াকোল এক বিশিষ্ট গ্রাম। এই গ্রামে আষাঢ় মাসে রাধাকান্তজিউর রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষ্যে রথ যাওয়ার নির্দিষ্ট পথের দু’পাশে রথযাত্রা ও পুনর্যাত্রার দিন মেলা বসে। সাড়ে তিনশো বছরের পুরানো এই মেলা। বীরভূমের গণপুর, দীঘলগ্রাম, দেবগ্রাম, বরলা গ্রামে প্রাচীন রথযাত্রার মেলায় প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। সিউড়ির মোরব্বা বীরভূমের সব মেলায় পাওয়া যায়। উত্তর ২৪ পরগনার ধান্যকুড়িয়া গ্রামে আষাঢ় মাসের রথযাত্রায় স্থানীয় রাসমঞ্চ সংলগ্ন জমিতে রথযাত্রা ও পুনর্যাত্রার দিন মেলা বসে। অত্যন্ত প্রাচীন মেলায় নদীয়া, হাজরাতলা, খাসপুর, রাজবাড়িয়া, যদুরআঁটি, আড়বেলিয়া, কচুয়া ইত্যাদি জায়গা থেকে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে নর-নারীর সমাগম হয়। গোপালনগর, কাটুরা, কাঙ্গনবাড়িয়া, ইষারপুর, বেলসিং, দেরিয়া,  আটীগ্রামে, আটুরিয়া গ্রামে, দেগঙ্গায়, দেউলিয়া গ্রামে রথের মেলা হয়। উত্তর ২৪ পরগনার মেলায় বেশি আসে কুটিরশিল্পজাত দ্রব্যসামগ্রী। কাঠ, বাঁশ, বেতের জিনিস, ধামা, কুলো, চ্যাঙারি, টোকা আর ফুল ফলের চারাগাছ।
মালদহের ইংরেজবাজারের মকদুমপুরের প্রধান উৎসব ও মেলা হল শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা। ব্রজমোহন রাধারানির যুগল মূর্তিকে কেন্দ্র করে এই শতবর্ষ প্রাচীন উৎসব মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
মুর্শিদাবাদের নয়নসুখগ্রামে দেড়শো বছরের অধিক, লালগোলায় আড়াইশো বছরের কাছাকাছি সুপ্রাচীন রথের মেলা বসে। খড়গ্রামের ইন্দ্রাণী গ্রামে জগন্নাথের রথযাত্রা হয় সাড়ে ৪০০ বছরের কাছাকাছি বয়স। নদীয়ার নেউলিয়া গ্রামে প্রাচীন জগন্নাথদেবের রথযাত্রা ১১৬৫ বঙ্গাব্দে সূচনা হয়েছিল। শান্তিপুরের বড়ো গোস্বামী বাড়ি,  হাটখোলার গোস্বামী বাড়ি রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষ্যে দেবোত্তর জমিতে আষাঢ় মাসে ৭ দিন ধরে মেলা বসে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ