তাপস ঘোষ, বহরমপুর: মহালয়ার ভোরে রেডিওর নভ ঘোরাতেই অলইন্ডিয়া রেডিওর সিগনেচার টিউন দিয়ে শুরু হয় বাঙালির আবেগের সকাল। এরপর ইসার মাধ্যমে ভেসে আসে, যা দেবী সর্বভুতেষু শক্তি রুপেন সংস্থিতা। দেবী চণ্ডীর স্ত্রোস্ত্র কানে ঢুকতেই বাঙালি মনে আজও শিহরণ জাগে। সেই ১৯৩২ সাল থেকে দেবী পর্বের ঊষাকালে বাঙালিরা রেডিওর সামনে বসেই কাটিয়ে আসছেন। ১৯৭২ সালে দূরদর্শন ও তারপর একের পর এক বাংলা চ্যানেল আত্মপ্রকাশ করার পর থেকে মহালয়া আলাদ মাত্রা পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু রেডিওর কৌলিন্য আজও ম্লান হয়ে যায়নি। সারা বছর তাই ‘বোকা বাক্সের’ সামনে ‘বোকার’ মতো বসে থেকেও বাঙালি পরিবারে আজও মহালয়ার ভোর হয় বেতার যন্ত্রের নভ ঘুরিয়ে।
টিভি আর কেবলের দৌলতে অনেকেই সারা বছর বেতার যন্ত্রটাকে আবহেলায় দূরে সরিয়ে রাখেন। শরতের কাশফুল দিকে দিকে মাথা দোলাতে শুরু করলেই সবার হুঁশ ফেরে। তাড়াতাড়ি রেডিওর ধুলো ঝাড়া শুরু হয়ে যায়। কেউ বা বাজারের ব্যাগে করে বিকল যন্ত্র সারাতে হাজির হন মেকানিকের কাছে। মোটা কাঁচের চশমা পড়া রেডিও মেকানিক মাথা তুলে জানিয়ে দেন দেরি হবে। বৃদ্ধের তাতে মন ভেঙে গেলেও হতাশ না হয়ে পড়ে থাকেন দোকানেই। বেলা শেষে দু’জোড়া ব্যাটারি কিনেই বাড়ি ফেরেন। বাড়ি ঢুকেই নিচু হয়ে নভ ঘুরিয়ে আকাশবাণী কলকাতার নির্দিষ্ট মেগাহার্যে কাঁটা ফিক্সড করে রাখেন।
মহালয়া এলে শুধু রেডিও সারানোর ধুম পড়ে যায়, তাই নয়। মহালয়া আসছে বলে নতুন রেডিও কেনারও হিড়িক পড়ে যায়। বহরমপুর প্রাঙ্গণ মার্কেটের রেডিও বিক্রেতা অসিত মজুমদার বলেন, সারাবছর ধরে যা রেডিও বিক্রি হয়, শুধু মহালয়ার আগে তার দ্বিগুণ রেডিও বিক্রি করি। কেন? দোকানদার প্রশ্ন শুনে অবাক হয়ে মাথা তোলেন। এমনভাব, সামনে যেন কোনও অবাঙালি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সোজাসাপটা জবাব, আরে মশাই, মহালয়া আর রেডিও এক সুতোয় বাঁধা।
মহালয়ার হিমেল ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভরাট গলায় চণ্ডীপাঠ, বাঙালি এই সেন্টিমেন্টেই বেড়ে উঠেছে। বহু প্রবীণ আছেন, যাঁরা মহালয়ার ভোরে রেডিওর সামনে বসবেন। পারশালিকার বাসিন্দা চুরানব্বই বছরের গোলকবিহারী ঘোষ বলেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র চণ্ডীপাঠের আচার্য। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে কোনও বছর মহালয়া শুনতে বাদ দিইনি।
১৯৩২ সালে রেডিওতে প্রথম সম্প্রচারিত হয় চণ্ডীপাঠ। ১৯৬০ সাল থেকে বাণিকুমার সম্পাদিত পঙ্কোজ মল্লিক সুরারোপিত মহিষাসুর মর্দিনী নামে সম্প্রচারিত হতে শুরু করে মহালয়া। আর এই সম্প্রচারের শুরুর মুহূর্তটাও বিতর্কিত হয়ে উঠেছিল। সেইকালে বাঙালিদের মনজুড়ে গোঁড়ামিও বেশ খানিকটা জায়গা দখল করেছিল। আকাশবাণীর কর্তারা বেতারে নতুন কিছু সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছিলেন। কিছুটা সঙ্কোচিতভাবে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আকাশবাণীর প্রোগ্রাম ডিরেক্টরের কাছে চণ্ডীপাঠের প্রস্তাব দেন। শুনে অনেকেই রে-রে করে উঠেছিলেন। কায়স্থের ছেলে চণ্ডীপাঠ করবে! মানুষ সেটা কি মেনে নেবে! হতেই পারে না। অনেক ভেবে নৃপেণবাবু মহিষাসুর মর্দিনীতে সায় দিলেন এবং বললেন, এই অনুষ্ঠানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ছাড়া আর কেউ ভালো চণ্ডীপাঠ করতেই পারেন না। কথামতো কাজ। আর তারপর থেকে বছরের পর বছর বেতার তরঙ্গে চণ্ডীপাঠ বাঙালির রক্তে ঢেউ তুলেছে। এইভাবেই মহিষাসুর মর্দিনী নাম এক ‘সেন্টিমেন্টের’ জন্ম হয়েছিল। মাঝে ১৯৭৬ সালে মহানায়ক উত্তম কুমারকে দিয়ে দুর্গতিহারিনী নামে বিকল্প অনুষ্ঠান করতে গিয়ে তাল কেটেছিল। ১৯৭৭ সাল থেকে আবার সেই আসনে বসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তোলপাড়া করে দিয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যু হয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের। কিন্তু আজও বাঙালির মনে তিনি অমর।