• সময়ই সবচেয়ে বড়ো শাসক। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান কত সম্পর্কের সীমাহীন দূরত্ব তৈরি করে দেয়। বলছিলেন প্রবীণ অভিনেতা দীপঙ্কর দে। সেদিন শ্যামল বসু পরিচালিত ছবি ‘দূরত্ব’র শ্যুটিংয়ে তিনি। শুভাশিস সেনগুপ্ত প্রযোজিত ছবিতে তাঁর চরিত্রের নাম অরুণ। নিজের অভিনীত চরিত্র নিয়ে দীপঙ্করের বিশ্লেষণ, ‘বিপত্নীক অরুণ নিঃসঙ্গ। ছেলে বিদেশে থাকে। বার্ধক্যজনিত নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত। তবুও মর্নিং ওয়াকে বেরন নিয়মিত। সেই যাতায়াতের পথেই আলাপ অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অনন্যাদেবীর সঙ্গে। উনিও একাকী। স্বামী বহুদিন গত হয়েছেন। একমাত্র মেয়ে থাকে বেঙ্গালুরুতে।’
একদিকে বয়স্ক মানুষগুলোর নিঃসঙ্গতা, অন্যদিকে আজকের প্রজন্মের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প বলবে ‘দূরত্ব’, জানালেন পরিচালক। কথার মধ্যেই গাড়ি থামার শব্দ। দরজা খুলে নেমে এলেন ছবির ‘অনন্যা’ মাধবী মুখোপাধ্যায়। ঘরে প্রবেশ করতেই ‘মাধবীদি’কে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে স্বাগত জানালেন দীপঙ্কর। মুখে আলো ছড়িয়ে মাধবীর প্রশ্ন, ‘কেমন আছেন দীপঙ্করবাবু?’ ‘আছি... একরকম। আপনি?’ পালটা প্রশ্ন দীপঙ্করের। হেসে মাধবীর উত্তর, ‘চারবার পা ভেঙেছি। তার মধ্যে একবার দু-পা একসঙ্গে। ডাক্তারবাবু বললেন, আর ফুটবল খেলা চলবে না। তাও দেখুন ফুটবল খেলতে চলে এসেছি।’
কতদিন পর দীপঙ্কর-মাধবী এক ফ্রেমে? পরিচালক শ্যামলবাবুর দাবি, ওঁরা শেষবার একসঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছেন সেই তপন সিংহ পরিচালিত ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এ। মাঝে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘উৎসব’-এ দীপঙ্কর দে, মাধবী মুখোপাধ্যায় দু’জনেই অভিনয় করলেও, এক ফ্রেমে ওঁদের দেখা যায়নি। মাধবী মানতে নারাজ। বললেন, ‘উৎসবের পরও আমরা একসঙ্গে বেশ কিছু কাজ করেছি।’ তাও অনেকদিন পর দেখা। আপনারা কি স্মৃতিমেদুর? ‘তা একটু তো বটেই’ বললেন দীপঙ্কর। ‘মনে পড়ছে মাধবীদির সঙ্গে একটা ছবি করেছিলাম। নাম ‘হারায়ে খুঁজি’। মাধবীদি ছিলেন নায়িকা। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে মাধবীদি আমার প্রথম নায়িকা।’ উজ্জ্বল মুখে মাধবী বললেন, ‘একদম ঠিক।’
দীপঙ্কর ৮২। মাধবী ৮৭। এখনও এত আগ্রহ? দীপঙ্করের কথায়, ‘অভিনয় ছাড়া আর তো কিছু শিখিনি। অনেক বয়স হয়ে গেল। এখন পেছন ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে সব। বেশি মনে পড়ে আশি-নব্বইয়ের দশকের ছবিগুলোর কথা। তখনই আবার কাজের উৎসাহটা ফিরে আসে।’ মাধবী এক্ষেত্রে ভিন্ন পথের যাত্রী। তাঁর কথায়, ‘সবসময় মনে হয় নতুন কিছু করি। এখনও পর্যন্ত সেই জায়গায় পৌঁছইনি, যেখানে মনে হবে এটাই শেষ।’
ছবিতে বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করছেন সুপ্রিয় দত্ত, দোলন রায়, সঙ্গীতা দাস প্রমুখ। সুরকার দেবজিৎ ঘোষ। ওদিকে তখন আলো রেডি। ডাক পড়ল ছবির নায়ক-নায়িকার। অনন্যার বাড়িতে চা খেতে এসেছেন অরুণ। ডাইনিং রুমের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধ মানুষটি। দূর থেকে ভেসে আসছে ‘তবু মনে রেখো’, শুনে রবীন্দ্র-গীতিকবিতাটি আবৃত্তি করছেন অরুণ ওরফে দীপঙ্কর। আনমনা অনন্যা। ‘কাট’ বলে উঠলেন পরিচালক। মুগ্ধ মাধবীর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, বাহ...।
প্রিয়ব্রত দত্ত