Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

কামারহাটিতে অটুট মদন ক্যারিশমা, সকলেই মজে ‘ও লাভলি’তে!

গঙ্গা লাগোয়া পিটুরিঘাট প্রাচীন জনপদ। সাংসদ তহবিলের কয়েক কোটি টাকা খরচে সৌগত রায় এখানে মাল্টিপারপাস পার্ক গড়ে দিয়েছেন

কামারহাটিতে অটুট মদন ক্যারিশমা, সকলেই মজে ‘ও লাভলি’তে!
  • ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: গঙ্গা লাগোয়া পিটুরিঘাট প্রাচীন জনপদ। সাংসদ তহবিলের কয়েক কোটি টাকা খরচে সৌগত রায় এখানে মাল্টিপারপাস পার্ক গড়ে দিয়েছেন। পাশেই নবনির্মিত ঝাঁচকচকে পিটুরিঘাট জেটি। বিকালে গঙ্গার হাওয়া খেতে পার্কে ভিড় জমেছে। লক্ষ্মীদেবী, গায়েত্রী কুমার সহ একদল মহিলা এসেছেন কচিকাঁচাদের নিয়ে। মাইকে ভেসে আসছে বিজেপির স্লোগান। এবার কার পাল্লা ভারী? গায়েত্রী কুমার বলেন, ‘আমরা শান্তিতে থাকতে চাই। আমাদের কাজ করে খেতে হয়। মদনবাবু এলাকায় শান্তি রেখেছেন। কেউ ঝামেলা পাকাতে পারে না। টুকটাক অশান্তির খবর পেলে ওঁর এক ফোনে সব ঠান্ডা হয়ে যায়।’ তাঁর কথায় মাথা নেড়ে সহমত প্রকাশ করলেন বাকি মহিলারা। সাবিনা ইয়াসমিন, ফতেমা খাতুনরাও পার্কে এসেছেন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে। ভোটের হাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করায় সাবিনা বললেন, ‘আমরা এত পার্টি বুঝি না। মদনদা সবসময় আসে। আমরা ভরসা পাই।’

Advertisement

কালীক্ষেত্র দক্ষিণেশ্বরে বহু বছর ধরে পুজোর ডালা বিক্রি করেন মাধব দত্ত। তিনি বলছিলেন, ‘গত এক দশকে বদলে গিয়েছে দক্ষিণেশ্বর মন্দির চত্বরের পরিকাঠামো। স্কাইওয়াক, গঙ্গায় উন্নত জেটি, নৌকায় ভজন শুনতে শুনতে বেলুড় যাওয়া, রাস্তাঘাট, আলো, মেট্রো—সব মিলিয়ে বদলে গিয়েছে চারপাশ। এই বদলের রূপকার দিদি। মদনদা তো এখানেই ফ্ল্যাটে থাকেন।’ মায়ের পুজোর ডালা কিনতে আসা বেলঘরিয়ার মাধবী দত্ত, পিয়ালি বিশ্বাস বলেন, ‘সত্যি বদলে গিয়েছে দক্ষিণেশ্বর।’ ভোট প্রশ্নে পিয়ালিদেবী বলেন, ‘জানেন, আমার বাপের বাড়ির সবার নাম উঠেছে। শুধু ভাইয়ের স্ত্রীর টাইটেল বদল হয়েছে বলে নাম বাদ পড়ে গিয়েছে। অথচ, ভাইবৌয়ের বাবা ও মায়ের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল। সব কাগজপত্রও জমা দিয়েছিল। এখন বিএলও বলছেন, তিনি কিছু জানেন না। এসব নিয়ে দিদিই তো লড়ছে।’ 
সাধারণ মানুষের মধ্যে এরকম নানা আলোচনা, জল্পনা চলছে। আর রাজনীতির কারবারিরা মজে রয়েছেন বৈচিত্রময় কামারহাটির ভোট অঙ্কে। কামারহাটি পুরসভার মোট ৩৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩১টি রয়েছে কামারহাটি বিধানসভায়। বাকি চারটি ওয়ার্ড বরানগর বিধানসভার মধ্যে পড়ে। ২০১১ সালের পরিবর্তনের ঝড়ে তৃণমূল প্রার্থী মদন মিত্র এখানে ২৪ হাজারের বেশি ভোটে সিপিএম প্রার্থী মানস মুখোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছিলেন। ২০১৬ সালে মদন জেলে বসে ভোটে লড়েছিলেন। সেবার তাঁকে মানসবাবুর কাছে প্রায় চার হাজার ভোটে হারতে হয়েছিল। কিন্তু জেল থেকে ছাড়া পাওয়া মদন আরও কৌশলী ও সমঝদার হয়ে ওঠেন। তার ফল মিলতে শুরু ২০১৯ সালের লোকসভা ভোট থেকে। সেই থেকে সময় যত গড়িয়েছে, কামারহাটিতে তৃণমূলের জমি ক্রমশ শক্ত হয়েছে। ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটে বিজেপি প্রার্থী অনিন্দ্য রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়কে ৩৫ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে জয়ী হন মদনবাবু। সিপিএম প্রার্থী সায়নদীপ মিত্র পেয়েছিলেন ২৮ হাজার ১৩৮ ভোট, যা বিজেপি প্রার্থীর থেকে ১০ হাজার কম। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে প্রায় ১৮ হাজার ৮০০ ভোটে। এর মধ্যে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ১ থেকে ৭ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূলের লিড ছিল ১৮ হাজার ভোট। এই সাতটি ওয়ার্ডে সাত জন বুথ এজেন্ট বিজেপি দিতে পারবে কি না, সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। সিপিএমের এজেন্ট থাকলেও কত জন ভোটার রয়েছেন, সেটা বড়ো প্রশ্ন। এবারেও কামারহাটিতে ত্রিমুখী লড়াইয়ের ছবি স্পষ্ট। 
বরাবরই ‘কালারফুল’ মদন মিত্র বাঙালিয়ানা বজায় রেখে মিটিং-মিছিলে ঝড় তুলছেন। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কখনও ট্রেনে ঝালমুড়ি বেচছেন, সহকর্মীদের সঙ্গে দুপুরে পান্তাভাত খেয়ে বিকালের রোড শোয়ে  ‘ও লাভলি’ গেয়ে ভোটারের মন জয় করছেন। প্রচারের ফাঁকে তিনি বলেন, ‘বোমা, গুলি, খুনোখুনির কামারহাটি এখন শান্তির জায়গা। সারা পৃথিবী স্কাইওয়াকে হেঁটে মা ভবতারিণী কাছে যাচ্ছে।’ সার্বিক উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ দিনের শেষে শান্তি চায়। সেই শান্তি আমি কামারহাটিতে ফিরিয়ে এনেছি। এবারও অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি।’ সিপিএমের পোড় খাওয়া নেতা মানস মুখোপাধ্যায়ও প্রচারে খামতি রাখছেন না। পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি, আড়িয়াদহে  জায়ান্ত সিং বাহিনীর নির্মম অত্যাচার, সাগর দত্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিকাঠামোর ঘাটতি, সিন্ডিকেট বাহিনীর দাপট, অবৈধ নির্মাণ সহ বহু ইস্যু ধরে প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘কামারহাটির সাতটি ওয়ার্ডে বিজেপির অস্তিত্ব নেই। তাই বিজেপি এখানে জিতবে না। বামেরাই তৃণমূলের অপশাসন থেকে কামারহাটিকে মুক্তি দিতে পারে, এটা মানুষ বুঝেছে। অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছি।’ বিজেপি প্রার্থী অরূপ চৌধুরী নন্দননগর, যতীন দাস নগর সহ বিস্তীর্ণ কামারহাটি জুড়ে প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘তৃণমূলের দুর্নীতি ও অপশাসনে মানুষ তিতিবিরক্ত। মানুষ ভোট দিলে তৃণমূলের বিসর্জন নিশ্চিত।’ তবে কামারহাটির ১ থেকে ৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘ওই জায়গায় চিরকাল আমরা দুর্বল। ওখানে সিপিএম ও তৃণমূলের মধ্যে লড়াই হবে। বাকি এলাকায় আমরা একচেটিয়া মানুষের সমর্থন পাব।’  প্রচারের ফাঁকে চলছে সেলফি তোলা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ