সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, কলকাতা: পুজো মানেই বাঙালিদের কাছে ছ-এ ছুটি। কিছুদিন ধরে ব্যোমকেশের হাতে কোনও কাজকর্ম নেই। দুর্গাপুজোর মধ্যে দিনদুয়েকের জন্য কোথাও ঘুরতে যাওয়া যায় কি না, তা নিয়ে অজিত ও সত্যবতীর সঙ্গে আলোচনা চলছিল। আচমকা হাজির ক্যুরিয়র ডেলিভারি বয়। খাম ছিঁড়ে ব্যোমকেশ চিঠি বের করল। ব্রোঞ্জ ব্লু কালিতে ছাপা মনোগ্রাম যুক্ত পুরু কাগজে লেখা চিঠি। ছোট চিঠিটা পড়ে ব্যোমকেশ সহাস্য মুখে অজিতকে বললেন, ‘এই নাও। গুরুতর ব্যাপার। দমদম পার্কের তরুণ সঙ্ঘের পুজোয় রোমাঞ্চকর রহস্যের আবির্ভাব। দুর্গাপ্রতিমার গলা থেকে কণ্ঠহার উধাও! সেই রহস্য উদ্ঘাটিত করার জন্য জোর তাগাদা এসেছে।’
এই পর্যন্ত পড়ে শরদিন্দু-ভক্ত বাঙালি পাঠকদের মনে হতে পারে এমন গল্প মিস হয়ে গেল কী করে! না, ঠিক মিস হয়নি আপনার। আসলে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যোমকেশকে নিয়ে এমন কোনও গল্প কখনও লেখেননি। এই পুরো ঘটনাটি আসলে বাঙালির ব্যোমকেশ আবেগের অনুপ্রেরণার ফসল। তার উপরে ভিত্তি করেই দমদম পার্ক তরুণ সঙ্ঘের এবারের ভাবনা ‘সত্যান্বেষী’। যেখানে পুজোর আনন্দের সঙ্গে মিলেমিশে যাবে রহস্যের তদন্ত।
পুজোর যুগ্ম সম্পাদক সায়ন্তন কাঞ্জিলালের কথায়, গোটা মণ্ডপটি তৈরি হচ্ছে কমিক প্যালেটে। মনে হবে, পপ আর্ট স্টাইলে কমিক বইয়ের পাতার মধ্যে দিয়ে আপনি ঢুকে পড়েছেন কেয়াতলা লেনে, ব্যোমকেশের বাড়িতে। যেখানে কলিং বেল বাজালে স্বাগত জানাবে পুঁটিরাম। ভেতরে দেখা যাবে অজিত, সত্যবতীকে। ব্যোমকেশের সঙ্গে দেখা হবে না। তিনি ব্যস্ত কণ্ঠহার চুরির রহস্য ভেদ করতে। এরপর রয়েছে আট-দশটা বাড়ি। এই প্রতিটি বাড়ি বলবে ব্যোমকেশের আলাদা আলাদা গল্প। এই বাড়িগুলির মাঝেই রয়েছে একটি মন্দির। যেখানে দেবীমূর্তির গলা থেকে উধাও হয়েছে হার। রয়েছে আরও এক বিশেষ চমক। প্রতিমা দেখলে মনে হবে যেন কমিক বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছেন মা দুর্গা। পাশাপাশি, ‘পথের কাঁটা’ গল্পটিকে একটি ২৫ ফুট দীর্ঘ পপ আর্ট কমিক বইয়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।
কিন্তু এবারের ভাবনায় ‘সত্যান্বেষী’ কেন? সৃজন ও ভাবনার ভার যাঁর কাঁধে, সেই অনির্বাণের কথায়, ব্যোমকেশ বক্সি আদ্যোপান্ত বাঙালি। স্বভাবে একটু অলস, ঘরকুনো। আর পাঁচজনের মতো তাঁকেও টাকাপয়সার চিন্তা করতে হয়। ব্যোমকেশ কোনও সুপারহিরো নন। কিন্তু এই ব্যোমকেশই মেধায় ও বুদ্ধিতে গড়পড়তা মানুষদের থেকে শত যোজন এগিয়ে। কোনও অপরাধ তাঁর কাছে নিছক ‘কেস’ নয়, তা যেন ‘আলোয় ঢাকা অন্ধকার’। আর সেই কারণেই অপরাধীকে ধরা বা শাস্তি দেওয়ার থেকেও তাঁর কাছে মুখ্য সত্যের কেন্দ্রে পৌঁছনো। সেটাই ব্যোমকেশকে বহু গোয়েন্দার ভিড়ে অনন্য করে তুলেছে। তিনি হয়ে উঠেছেন আমাদের আবহমান জীবনের সঙ্গী।
একজন সত্যান্বেষী অপরাধকে ঘিরে থাকা অসত্যের বলয় ভেদ করে সত্যকে আলোর সামনে আনেন। মা দুর্গাও স্বয়ং সত্যস্বরূপা। তাঁর পুজোর মধ্যে দিয়ে আসলে আমরা সত্যের আরাধনা করি। সত্যস্বরূপা মায়ের আরাধনায় সত্যান্বেষী ব্যোমকেশের উপস্থিতি একেবারে রাজযোটক।