প্রদীপ দে সরকার: অফিস থেকে ফিরে সমরেশ জামার পকেট থেকে টিকিটগুলো বের করে টেবিলে পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে রাখল। সুতপা ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স আর জলের বোতল বের করে রান্নঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎই ঘুরে দাঁড়াল। টিকিটগুলো দেখিয়ে সমরেশকে ঝাঁঝাঁলো স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘এই নেশা আর ক’দ্দিন চলবে শুনি?’
সমরেশ খুব মোলায়েম গলায় বলল, ‘আর ক’টা দিন ধৈর্য ধর। ভোম্বল বলেছে এক মাসের মধ্যে আমার লটারিতে প্রাপ্তিযোগ আছে। ষোলো দিন হয়ে গেছে, আর চোদ্দো দিনের মধ্যেই কোটিপতি। তারপর আর চিন্তা নেই। বাইপাসের ধারে ওই যে কমপ্লেক্সটা দেখতে গিয়েছিলাম মনে আছে? চৌষট্টি লাখ। বলেছিল ফাইনাল করার সময় কিছু ছাড় দেবে। তারপর ভেবলির...’
সমরেশকে থামিয়ে দেয় সুতপা। ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘থাক, উইশ লিস্ট আর লম্বা করতে হবে না। সবটাই এখনও ফিউচার টেন্স। তোমার কাছেই তো শুনেছি ক্লাস নাইনে একবার ডিগবাজি খেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল। সেই ভোম্বল আবার বড় জ্যোতিষী হয়েছে! যত্তসব বুজরুকি’।
সমরেশ ঠেকা দেওয়ার চেষ্টা করে, ‘যাঃ! এইভাবে বোলো না। এখন ওর যথেষ্ট নামডাক হয়েছে। নেমপ্লেটে লেখা আছে ডঃ তপোধীর খাস্তগীর’।
সুতপা ধমকে থামায়, ‘হয়েছে, ক্লাস নাইনের ফেলুদা কি না ডক্টরেট! লোকে বিশ্বাস করে কী করে?’
‘বিশ্বাস করে মানে? বড় বড় ব্যবসায়ীরা ওর কাছে ঠিকুজি-কোষ্ঠী বিচার করিয়ে ওর বলে দেওয়া দিনক্ষণ মেনে কাজ করে। শুনেছি রুলিং পার্টির তিন চারজন এমএলএ নিয়মিত ওর পরামর্শ নেয়। কত তারিখ ঠিক ক’টার সময় নমিনেশন জমা দিলে জয় নিশ্চিত সেটা ভোম্বলের কাছেই জেনে নেয়। আর ভোম্বলের গণনা এখনও পর্যন্ত ফেল করেনি’।
‘যে ক্লাস নাইনে নিজেই ফেল করেছিল তার গণনা নাকি ফেল করে না। অঙ্কে ফেল করা লোক নাকি অঙ্ক কষে নেতাদের পাশ করার সময় বাতলে দেয়! এইজন্যই দেশের এই হাল। তা, রোজ কত করে খসাচ্ছ শুনি?’
সমরেশ এবার একটু চাপে পড়ে যায়। সামলে নিয়ে বলে, ‘ভোম্বল এত বিচার টিচার করে যখন বলেছে আমার কপালে আছে, দেখো ঠিক লাগবে। আর এতগুলো টাকা পাওয়ার জন্য একটু খরচা তো করতেই হবে তাই না?’
এমন সময় ভেবলি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। মনে হচ্ছে কোথাও যাচ্ছে। সুতপা জিজ্ঞেস করল, ‘কীরে ভেবলি, এই তো একটু আগেই তো ফিরলি। এখন আবার সন্ধেবেলা কোথায় যাচ্ছিস?’
ভেবলি একটু চড়া সুরেই বলল, ‘মা, তোমাকে একটা কথা বলি। আমি এখন চাকরি করছি, আমার বয়সটাও খুব কম নয়, ছাব্বিশ। এবার আমাকে একটু স্বাধীনভাবে বাঁচতে দাও’।
সুতপা এমন ঝটকা আশা করেনি। কয়েক মুহূর্ত থমকে থেকে সমরেশকেই টার্গেট করল, ‘তোমার জন্য, এই তোমার জন্যেই মেয়েটা উচ্ছন্নে যাবে। তোমার সামনে আমাকে এভাবে বলল আর তুমি কিছু বলবে না?’
সমরেশ এমন মারাত্মক পরিস্থিতিতে কী বলবে ভেবে পায় না। কূল রাখে না মান রাখে। সে আমতা আমতা করে দু’জনের উদ্দেশেই কিছু বলতে চায় কিন্তু শব্দগুলো কেমন জট পাকিয়ে যেতে থাকে। ভেবলি সেই জটটাকে আরও জটিল পাক খাইয়ে বলে, ‘মা, তুমি বরং বাপির দিকে একটু খেয়াল রাখ। লটারি খেলা আর জুয়া খেলায় খুব কিছু তফাৎ আছে কি? মহাভারতের যুধিষ্ঠিরও কিন্তু পাশা খেলার নামে জুয়াই খেলেছিল। আর সব হারিয়ে শেষপর্যন্ত দ্রৌপদীকেও পণ রেখেছিল’। একটা মারাত্মক রিভার্স সুইং-এ সুতপাকে ভেবলে দিয়ে ভেবলি টুক করে কেটে পড়ল।
সমরেশের মনে হল ভেবলি যেন কোনও এক ভয়ঙ্কর উগ্রপন্থীর হাতে পারমাণবিক বোমা তুলে দিয়ে গেল। লটারি খেলাকে জুয়া খেলার সঙ্গে তুলনা করাটা কীভাবে কাটানো যায় ভাবছিল সমরেশ। কিন্তু কোনও জম্পেশ যুক্তি খুঁজে না পেয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। আত্মরক্ষার জন্য বাথরুমকেই সেরা জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে সমরেশ।
দুই
সৌম্যও প্রায়শই আত্মরক্ষার্থে বাথরুমে ছোটে, তবে সেটা আমাশার চাপে। আজ সন্ধ্যায় মোচড়টা দিল এক্কেবারে মোক্ষম মুহূর্তে। দেশপ্রিয় পার্কের শিমুল গাছটার তলায় একহাতে গোলাপ আর অন্য হাতে নিজের হৃদয়ের মতো গলতে শুরু করা আইসক্রিম নিয়ে সৌম্য রোমান্স-ঘন কাঁপা গলায় পল্লবীকে যখন ফাইনালি প্রোপোজটা করতে চলেছে ঠিক সেই মুহূর্তে। এমন মোচড়কে ট্যুইস্টও বলা যায়। কহানিমে ট্যুইস্ট যাকে বলে আর কী! কারণ, এমন এক একটা মোচড়েই জীবনের মোড় ঘুরে যায়। আজ সকাল থেকে কতবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস করেছে গোটা ডায়লগটা। অথচ, আসল সময়ে সেসব বলার আগেই সৌম্যর মুখ দিয়ে একটা কাতর শব্দ বেরিয়ে এল, ‘আঁক’।
এমন আবেগঘন মুহূর্তে এই শব্দটা একেবারেই অবাঞ্ছিত। কিন্তু এটা তো আর শব্দ বাছাইয়ের সময় নয়। বাঞ্ছিত না অবাঞ্ছিত তার বিচার করারও সময় নয়। যাকে বলে অ্যাকিউট এমারজেন্সি। এমারজেন্সিতে প্লেনকেও অনেক সময় বেলি ল্যান্ডিং করতে হয়। আর সৌম্যর তো বেলি নিজেই ল্যান্ড করতে চাইছে। উপায় কী! এরপরেই সব কথা কেমন যেন গুলিয়ে গেল। ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র মহার্ঘ গোলাপ আর আইসক্রিম কোনটা পল্লবীর হাতে কোনওমতে গুঁজে দিয়ে সৌম্য বলল, ‘একটু দাঁড়া, আমি এক্ষুনি আসছি’। বলেই পিঠের ব্যাগ পাশের বেঞ্চিতে নামিয়ে রেখে দৌড় লাগাল। প্রিয়া সিনেমার উল্টো দিকে দেশপ্রিয় পার্কের কোণে একটা পাবলিক টয়লেট আছে, সৌম্য জানে। আসলে কলকাতার কোথায় কোথায় পাবলিক টয়লেট সেটা গুগলের চাইতে সৌম্য অনেক ভালো বলতে পারবে। গুগল জেনেছে ব্যবসার জন্য আর সৌম্যকে জানতে হয়েছে প্রাণের দায়ে। তাই এ জানায় কোনও ফাঁকি নেই। বলতে গেলে অনেক জায়গায় জানাশোনাটা প্রায় ব্যক্তিগত স্তরেও পৌঁছে গেছে। কলকাতার বহু সুলভ শৌচালয়ের ক্যাশ কাউন্টারে বসে থাকা মহিলা কিংবা পুরুষরাও সৌম্যকে চেনে। তেমন এমারজেন্সিতে টাকাটা পরে দিলেও চলে। চেনাজানাটা অনেকদূর এগিয়ে গেছে আর কী।
সৌম্য মুখে বিশ্বজয়ের প্রশান্তি মাখিয়ে যখন ফিরে এল ততক্ষণে পল্লবীর আইসক্রিম খাওয়া হয়ে গেছে। গোলাপটা নামিয়ে রেখেছে সৌম্যর ব্যাগের পাশে। সৌম্য কিছু বলার আগেই পল্লবী হাতের ইশারায় ওকে থামাল। নিজের ব্যাগটা এক ঝটকায় কাঁধে ফেলে বলল, ‘দেখ সৌম্য, আমি আমার জীবনের ইম্পর্ট্যান্ট মুহূর্তগুলো পাবলিক টয়লেটের আশেপাশে কাটিয়ে দিতে পারব না। সরি।’ বলে হাঁটা দিল।
সৌম্য পিছন পিছন হাঁটতে লাগল। কাকুতি মিনতি করল, ‘এই, শোন না। আসলে আজকেই তোকে অফিসিয়ালি প্রোপোজ করব ঠিক করেছিলাম তো। তাই বড্ড টেনশন হচ্ছিল। টেনশনের জন্যই পেটে হঠাৎ মোচড় দিল। কী করব বল?’
পল্লবী ঘুরে দাঁড়িয়ে ভুরু কুঁচকে বলল, ‘জীবনে এমন টেনশনের মুহূর্ত অনেক আসবে, সৌম্য। সবসময়েই তোর যদি পেটে মোচড় দেয় তাহলে আমি একা সেই টেনশন সামলাব কী করে? তোর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আর এগনো ঠিক হবে না। আমি চললাম।’ বলে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে পল্লবী হাঁটতে শুরু করল।
সৌম্য শিমুল গাছের তলায় চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল পার্কের লম্বা মাঠটা কোণাকুণি পেরিয়ে যাচ্ছে পল্লবী। হাঁটতে হাঁটতে মাঠ পেরিয়ে রাস্তার ভিড়ে হারিয়ে গেল।
সৌম্য খানিকক্ষণ চুপ করে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। বসন্তের প্রথম দিন আজ। খানিক দূরেই একটা পলাশ গাছ। প্রচুর ফুল পড়ে আছে গাছের তলায়। সৌম্য উঠে গিয়ে সেই ছড়িয়ে থাকা ফুলের মাঝখানে এতক্ষণ অনেক যত্ন করে ধরে থাকা ওর হাতের গোলাপটাকে আলতো করে শুইয়ে দিল। অনেক ঝাড়াই বাছাই করে মিনিট দশেকের দরদামের পর কিনেছিল রাঙতায় মোড়া গোলাপখানা। মনে হল ওর প্রথম প্রেমের ডেডবডিকে শুইয়ে দিল ঝরে পড়া পলাশ ফুলের মাঝে। কোথায় যেন গান বাজছে ‘বসন্ত এসে গেছে’। সবার জীবনে বসন্ত সমাগত আর সৌম্যর জীবনের বসন্ত এই শুভক্ষণেই পার্কের মাঠ পেরিয়ে চলে গেল।
তিন
আজকাল এইসব লটারির খেলা অনেকটা আগেকার দিনের সিনেমার শো-টাইমের মতো। দুপুর থেকেই স্বপ্ন বিলি শুরু হয়। দুপুর একটা, সন্ধে ছটা আবার রাত আটটা। ঠিক যেন নুন, ম্যাটিনি, ইভনিং শো। রূপোলি পর্দার নায়ক নায়িকার জায়গায় রূপের ঝনঝনানি শোনার নেশা। আজ সমরেশেরটা ছিল ইভনিং শোয়ের টিকিট। রাত আটটায় ওয়েবসাইটে রেজাল্ট পেয়ে গেল।
এবং কী আশ্চর্য! সমরেশের টিকিটে প্রাইজ লাগল! প্রাইজ ঠিকই, তবে ফার্স্ট নয়, সেকেন্ড প্রাইজ। সমরেশ এ খেলার হিসেবটা জানে। ফার্স্ট প্রাইজ এক কোটি। কিন্তু সেকেণ্ড প্রাইজ মাত্র ন’ হাজার। লটারি পাওয়ার ভাগ্যটা এভাবেই কেটে গেল হয়তো, কোটি আর কপালে লাগল না। এই ভেবেই সে কেমন ঝিমিয়ে পড়ল। ওদিকে সমরেশের লটারি লেগেছে জানতে পেরে সুতপা আহ্লাদে আটখানা। কাল বাইরে খাওয়ার আবদারও করে রেখেছে। সমরেশ একবার ভাবল ন’ হাজার আর এক কোটির মাঝে যে বিপুল মহাসমুদ্র তফাৎ সেটা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু করল না। থাক, ক্ষণিকের আনন্দে বিভোর থাক নাহয়। এমনিতে তো সুতপাকে জীবনে বিশেষ কিছুই দিতে পারেনি। লটারি প্রাপ্তির এই নির্মল আনন্দ থেকে ওকে বাস্তবের নির্মম মাটিতে এখনই নামিয়ে আনতে ইচ্ছে করল না। অন্যদিন হলে রাত নটার পরে চায়ের ব্যবস্থা নিজেকেই করে নিতে হতো। আজ লটারির সৌভাগ্যে সুতপা স্বেচ্ছায় চা বানাতে চলে গেল। সমরেশ সোফায় বসে ভাবছিল কাল একবার ভোম্বলের কাছে যেতে হবে। ওর লটারির প্রাপ্তিযোগটা বোধহয় এভাবেই ফস্কে গেল। আরেকবার কোষ্ঠী বিচার করিয়ে দেখে নিতে হবে চান্স এখনও বাকি আছে কি না। সুতপা ট্রেতে সাজিয়ে দু’কাপ চা নিয়ে এসে বেশ আয়েস করে বসল সোফায়। তারপর মুচকি হেসে বলল, ‘তোমার ভোম্বল দেখছি ততটা খারাপ জ্যোতিষী নয়। নাইনে ফেল করা তো তাই, অঙ্কের সামান্য গরমিলে কোটি না হাজার বুঝতে পারেনি ঠিকই কিন্তু লটারি প্রাপ্তিটা মিলিয়ে দিয়েছে’।
সমরেশ ঘুরে তাকায়। বলে, ‘আবার ভোম্বলকে নিয়ে পড়লে?’
সুতপা হেসে বলে, ‘এই, শোনো না, ভেবলির কোষ্ঠীটা একটু বিচার করালে হয় না? মেয়েটা তো বিয়ের কথা শুনলেই রেগে যাচ্ছে।’
সমরেশ চিন্তিত মুখে বলে, ‘কিন্তু ও তো কোষ্ঠী বিচারের সঙ্গে হাতও দেখে। ভেবলিকেও যেতে হবে যে। ওকে তো রাজি করাতে হবে’।
‘সে আমি ঠিক রাজি করিয়ে নেব’।
চার
ওয়েটিং রুমটায় অন্তত জনা পনেরো নারী-পুরুষ বসে আছে। বোঝাই যাচ্ছে ডাক্তারের পসার মন্দ নয়। এই ডাক্তারের নাম বলে দিয়েছিল অফিস কলিগ তাপসদা। বলেছিল, ‘আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না করালে দেখাতে পারবি না। সেইমতো গতকালই এসে নাম লিখিয়ে গিয়েছিল। ভিজিটের অর্ধেক মানে পাঁচশো টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে যেতে হয়েছে। এই ডাক্তারের আরও অনেক বায়নাক্কা আছে। শুধু নাম লেখালেই হবে না। নাম, ঠিকানা, বাবার নাম, মায়ের নাম, জন্মের তারিখ মাস সময় পর্যন্ত লিখিয়ে যেতে হয়েছে। আবার চেম্বারে ঢোকার আগে নাকি রিশেপশনে ফোন জমা রেখে যেতে হয়। অনেকে চেম্বারে ঢুকেও ফোনে ব্যস্ত থাকে বলে নাকি এই নিয়ম। আজব ডাক্তার। যাক গে, সৌম্যর এখন ওসব ভাবলে হবে না। আমাশা না সারলে যে ওর জীবনটাই ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় রিসেপশন কাউন্টারে বসে থাকা সুন্দরী মহিলা বেশ কর্কশ গলায় ডাকল, ‘সৌম্যজিৎ বাসু, আপনি ফোন রেখে ভেতরে যান’। ডাক্তার মুখ ভরা হাসি নিয়ে সৌম্যকে চেয়ারে বসতে ইশারা করলেন। তারপর সেই হাসি ঠোঁটে লটকে রেখেই বললেন, ‘আপনার হাত দুটো ওপর লম্বা করে বাড়িয়ে দিন তো, দেখি একবার’। সৌম্য ভাবল প্রেশার টেশার মাপবে বোধহয়। হাতদুটো পেতে দিল টেবিলে। ডাক্তার ওর দুটো হাতকে চিৎ করে একবার দেখলেন। তারপর উল্টে পাল্টে দেখলেন, ঝুঁকে পড়ে দেখলেন, আতশ কাচ দিয়ে দেখলেন। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, ‘মঙ্গল আর শনি ....’
ডাক্তারকে থামিয়ে দিয়ে সৌম্য একটু রাগত স্বরেই বলল, ‘আপনি তো আমার সমস্যাটাই শুনছেন না। শুক্র, শনি, রবি কোনও তফাৎ নেই। পেটে যখন তখন মোচড় দিচ্ছে। ওদিকে ঠাকুমা রোজ থানকুনি পাতার রস খাইয়ে চলেছে। কিন্তু কোনও কাজ হচ্ছে না। ঠাকুমা বলছে থানকুনি পাতাও নাকি ভেজাল হয়ে গেছে। এবার বলছে রোজ বিকেলে বেলের পানা খাওয়াবে। সকালে থানকুনি, বিকেলে বেল। লাইফ পুরো হেল হয়ে গেল। রোজ সন্ধেবেলা বন্ধুরা এগরোল, চাইনিজ, মোগলাই সাঁটাচ্ছে আর ওসব দেখলেও আমার পেটে শুধুই মোচড় মারছে। আপনি কিছু একটা করুন। অনেক আশা নিয়ে আমাশা সারাতে এসেছি’।
ডাক্তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই হাসিটাকে ফিরিয়ে এনেছেন। বললেন, ‘শুক্র, শনি, রবি নিয়ে তেমন সমস্যা নেই। শনি সামান্য বাঁকা, কিন্তু তাতে কী। আমার কাছে এসে গেছেন। বাঁকা শনিকে সোজা করে দেব। তবে, আপনার মঙ্গলের জায়গাটাই বড্ড নড়বড়ে, শরীর তো বিগড়োবেই। আমাশার আর দোষ কী! কিন্তু চিন্তা নেই, আমি আছি কী করতে। তারও উপায় আছে’।
সৌম্যর এবার ঘোর সন্দেহ হল। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আপনি ডাক্তার হয়ে জ্যোতিষীদের মত কথা বলছেন কেন বলুন তো?’ ডাক্তারের মুখের হাসি হঠাৎই মিলিয়ে গেল। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ইয়ারকি হচ্ছে? জ্যোতিষাচার্য ডক্টর খাস্তগীরকে জিজ্ঞেস করছেন, আপনি কেন জ্যোতিষীদের মতো কথা বলছেন?’
‘মানে, আপনি ডাক্তার নন?’ উঠে দাঁড়িয়েছে সৌম্য।
খাস্তগীর বললেন, ‘ডাক্তার দিয়ে কী হবে? হবেটা কী শুনি? কী করতে পারে ওরা? কলকাতার সব বিখ্যাত ডাক্তাররা আমার কাছে ঠিকুজি-কোষ্ঠী বিচার করিয়ে তবে চেম্বার খোলে। হাত দেখিয়ে দু’হাতে অন্তত ছ’টা করে আংটি পরে। এই তো আমার নীচের ফ্লোরেই ডক্টর রাস্তোগির চেম্বার। চেম্বার খোলার আগে আমার কাছে বাস্তুবিচার করিয়ে গেল। তারপর হাত দেখিয়ে একটা ছ’রতির নীলা আর একটা চার রতির গোমেদ ধারণ করল। এখন দেখুন গিয়ে চেম্বার কেমন রমরমিয়ে চলছে’।
সৌম্য এতক্ষণে বুঝতে পারল যে তার মারাত্মক ভুলটা ঠিক কোথায় হয়েছে। তিনতলার বদলে সে থার্ড ফ্লোর মানে চারতলায় এসে নাম লিখিয়েছিল। আর তাপসদার রেফার করা ডক্টর রাস্তোগির কাছে নাম না লিখিয়ে জ্যোতিষী ডক্টর খাস্তগীরের কাছে নাম লিখিয়েছিল। ইসস্! এতবড় ভুলটা করল কী করে? রাস্তোগির বদলে খাস্তগীরের পাল্লায় পড়ল! নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছে সৌম্যর।
জ্যোতিষাচার্য ডক্টর খাস্তগীর ড্রয়ার থেকে একটা লম্বা কাগজ বের করলেন। সেই কাগজ দেখিয়ে বললেন, ‘এই হচ্ছে আপনার কোষ্ঠী। আপনার জন্ম তারিখ সময় মিলিয়ে আমি কোষ্ঠী বিচার করে দেখেছি পেটের রোগ আপনার এমনি এমনি সারবে না। একমাত্র উপায় হল প্রবাল ধারণ। আমার দেওয়া প্রবাল ধারণ করলে আপনার আমাশা সাতদিনে সেরে যাবে। গ্যারান্টি দিচ্ছি। জ্যোতিষাচার্য ডক্টর খাস্তগীরের গ্যারান্টি। কত বড় বড় রোগ সারিয়ে দিলাম আর আপনার তো সামান্য আমাশা’।
আমাশা নিয়ে এমন তামাশা আর সহ্য হল না সৌম্যর। সে আর কোনও কথা না বলে বেরিয়ে এল চেম্বার থেকে। সোজা হেঁটে বড় রাস্তায় উঠে একটা সিগারেট ধরালো। আফশোস হচ্ছে। হাজার টাকা একেবারে জলে গেল! তাপসদার ওপরেও রাগ হচ্ছে। ফ্লোর বলার সময় গণ্ডগোল করেছে তাপসদাই। আর ডাক্তারের নাম বলার সময়েও একটা কনফিউশন ঝুলিয়ে রেখেছিল। বলেছিল, ‘ওই খাস্তগীর না রাস্তোগি কিছু একটা হবে’। এমন সময় হঠাৎই খেয়াল হল মাথাটা গরম থাকায় ফোনটা রিশেপশন থেকে নিতে ভুলে গেছে।
পাঁচ
বাড়ি ফেরার পথে সৌম্যর পকেটে ফোন বেজে উঠল। বের করে দেখল মা। ‘হ্যাঁ মা, বল’।
উল্টো দিকের নারীকণ্ঠ যেন চমকে উঠল, ‘কে, আপনি কে? আমার মেয়েকে দিন ফোনটা’।
সৌম্য এবার যেন খানিকটা আন্দাজ করতে পারছে কী হয়েছে। নিশ্চয়ই একই মডেলের দুটো ফোন হাত-বদল হয়েছে রিশেপশনিস্টের ভুলে। সে আমতা আমতা করে বলল, ‘না, মানে, আপনার মেয়ের ফোনটা বোধহয় আমার কাছে রয়ে গেছে’।
ভদ্রমহিলা হঠাৎই মারাত্মক উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, ‘সে কী! ভেবলির ফোন আপনার কাছে কেন রয়ে গেল? আমার ভেবলি কোথায়?’ সৌম্য কিছু বলার আগেই ভদ্রমহিলা হাউমাউ করে কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন। সৌম্য শুনতে পাচ্ছে ভদ্রমহিলা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘ওগো, শুনছ, ভেবলিটাকে বোধহয় কিডন্যাপ করে ফেলেছে। ওর ফোনটা এখন একটা গুন্ডার হাতে। ও মাগো, এখন কী হবে গো! আরে, তুমি এখনই থানায় খবর দাও’।
সৌম্য তার মধ্যেই বলার চেষ্টা করল, ‘মাসিমা শুনুন, কিডন্যাপ নয়, ফোনটা শুধু পাল্টা পাল্টি হয়ে গেছে মনে হচ্ছে’। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ওপার থেকে শোনা যাচ্ছে ভদ্রমহিলা ততক্ষণে চিল চিৎকার জুড়েছেন। সৌম্য বুঝতে পারছে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর পিছনে পুলিস লাগবে। ফোন ট্র্যাক করে ওর বাড়িতে হাজির হবে পুলিস। ভাবতেই হাত-পা অবশ হয়ে এল।
এমন সময় ফোনের ও প্রান্তে এক পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল। খাস্তগীরের চেম্বারে ফোন বদল হয়েছে বুঝতে পেরে বললেন, ‘শোনো, তুমি ওই চেম্বারে গেলে হয়তো আমার মেয়েকে পেয়ে যাবে। না পেলে প্লিজ আমাদের বাড়ি চলে এসো। খাস্তগীরের চেম্বার থেকে আমাদের বাড়ি হাঁটা পথ। আমি ঠিকানা বলে দিচ্ছি। মেয়ে ফিরলেই ফোন বদলে নিতে পারবে’।
খাস্তগীরের চেম্বারে মেয়েটিকে না পেয়ে অগত্যা ঠিকানা অনুযায়ী ওদের বাড়িতেই যেতে হল। বসার ঘরে বসতে বলেও ভদ্রমহিলা এখনও ওকে কড়া চোখে মাপছেন। ভদ্রলোক ওর নম্বর নিয়ে একটা ফোন করলেন।
সমরেশ সৌম্যর ফোনে কল করে ভেবলিকে পেল, ‘হ্যাঁ রে মা তুই কোথায় আছিস?’
ওপাশ থেকে ভেবলি বলছে, ‘আর বোলো না, একটা উজবুক আমার ফোনটা নিয়ে চলে গেছে’।
‘তোর সেই উজবেকিস্তানের লোকটা এখন আমাদের বাড়িতেই বসে আছে। ওর ফোনটা নিয়ে চলে আয়’। সমরেশের কথার ইঙ্গিত বুঝতে অসুবিধে হল না সৌম্যর। রাগ হলেও কিছু করার নেই।
একটু পরেই ভেবলি ফিরল। কিন্তু সৌম্য অবাক হয়ে দেখল ভেবলি কোথায়, এ তো পল্লবী। পল্লবীও ঘরে ঢুকে সৌম্যকে দেখে অবাক। ‘তুই এখানে! তাই ভাবি নিজের ফোন না নিয়ে অন্যের ফোন আর কোন উজবুক নিয়ে যাবে’।
সৌম্যও ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘খবরদার পল্লবী, একদম বাজে কথা বলবি না। আমার ফোনটা দেখেই তুই কিনেছিলি। তাই তো এক রকম দেখতে। বুঝব কী করে?’ সুতপা হা করে ওদের ঝগড়া শুনছিল। ঢোঁক গিলে বলল, ‘হ্যাঁ রে ভেবলি, তুই ওকে চিনিস?’
ভ্যালেন্টাইনস ডে-র সেই রাগ এখনও যায়নি পল্লবীর। সেই রাগের রেশ টেনেই বলল, ‘চিনি মানে, হাড়ে হাড়ে চিনি। সারক্ষণ নাকি ওর পেটে মোচড় দেয়। ইডিয়ট একটা’।
সৌম্যও তেড়ে উঠতে যাচ্ছিল। সমরেশ থামায় ওকে, ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, তোমাদের মধ্যে ঝামেলাটা কীসের?’
এবার পল্লবী থামানোর চেষ্টা করে সৌম্যকে। কিন্তু এত অপমানের পর সৌম্যর মাথার ঠিক নেই। দু’দিন আগে ভ্যালেন্টাইনস ডে-র ঘটনা বলতে শুরু করে দেয়। কীভাবে অফিসে ম্যানেজ করে বেরিয়ে আধঘণ্টা ঝাড়াই-বাছাই করে, দরদাম করে পছন্দসই গোলাপ কিনেছিল সেটাও বলে দিল সৌম্য। পল্লবী ধমকেও থামাতে পারে না ওকে। তবে ঘটনাটা বলতে বলতেই সংবিত ফেরে সৌম্যর। কিন্তু ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে গেছে সমরেশ আর সুতপা। ওরা মুচকি হাসছে দেখে সৌম্য আর পল্লবী দু’জনেই চুপ করে যায়। সুতপা পরিস্থিতি সামলাতে বলে, ‘তোমরা বোসো, আমি সবার জন্য শরবত বানিয়ে আনছি’।
পল্লবী ফুট কাটে, ‘একটায় বেলের পানা এনো’।
সৌম্য সমরেশকে বলে, ‘এই ভেবলি নামটাই ঠিক রেখেছেন। আমাকে বলেনি এটা। নাম শুনলেই বোঝা যায় মাথায় গণ্ডগোল আছে।’ পল্লবী পাল্টা দেয়, ‘তোর মতো পেটের গণ্ডগোল থাকার চেয়ে মাথার গণ্ডগোলও ভালো’। সমরেশ ওদের প্রাণ ভরে ঝগড়া করতে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দেয়। সুতপার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, ‘দেখলে তো ভোম্বলের গণনায় কোনও ভুল নেই, এ বাড়িতে লটারি ঠিক লেগেছে’। সুতপা বলল, ‘কিন্তু ওই একটাই খিঁচ রয়ে গেল, আমাশা।’ সমরেশ বলল, ‘বাঙালির তো এই আছে। ছোট ছোট সাধারণ আশা মানে আম-আশা আর আমাশা। এ নিয়ে খুঁতখুঁত করলে হবে? কীভাবে ঝগড়া করছে দেখেছ? একেবারে রাজযোটক।’