নির্ঝর আর মুনমুন হঠাৎই ঠিক করল একসঙ্গে থাকবে। বন্ধুত্বটা তাদের বহুদিনের। প্রায় স্কুল শেষ করে কলেজে ঢুকেই মুনমুনকে চোখে পড়েছিল নির্ঝরের। মেয়েটার মধ্যে এমন একটা স্মার্টনেস রয়েছে যা ভীষণ স্বাভাবিক আর সহজাত। একটু দেখানেপনা নেই, অথচ মনে মনে দারুণ আধুনিক। এই জিনিসটাই নির্ঝরকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল। বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হলেও সম্পর্কটা সেই গণ্ডি ছাড়াতে সময় নেয়নি। কিন্তু ওই পর্যন্তই নির্ঝর বা মুনমুন কেউই নিজেদের সম্পর্কে কোনও সিলমোহর বসাতে চায়নি। তাই প্রণয় থেকে পরিণয়ের পথে পা বাড়াতে পারেনি। এইভাবে বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। পড়াশোনার শেষে চাকরি, অন্য রাজ্যে বদলি সব ঝড় পেরনোর পরেও যখন সম্পর্কটা ভাঙল না তখন মুনমুনই স্থায়িত্বের প্রসঙ্গ টেনেছিল। স্থায়ী সম্পর্ক চাইলেও বিয়ে করার তাগিদ নেই দু’জনের একজনেরও। অতএব লিভ ইন। একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্তটা পাকাপাকি হয়েছিল এইভাবেই। তারপরেও বেশ কয়েক বছর কেটে গিয়েছে। সম্পর্কটা ভালো-মন্দ মিশিয়ে চলছিল। মান অভিমান, রাগ ঝগড়া, ভালোবাসা কিছুরই অভাব ছিল না। কিন্তু ক্রমশ নির্ঝরের মধ্যে একটু বদল দেখা গেল। মুনমুনের চোখে প্রথমে ধরাই পড়েনি বদলটা। পরে তা স্পষ্ট হতে শুরু করল। অল্পে বিরক্তি, কথাকাটাকাটির মাত্রা বেড়ে যাওয়া, মুনমুনের প্রতি একটা আলগা তাচ্ছিল্য, কিছুই চোখ এড়ায়নি মুনমুনের। একদিন সরাসরি তাই সে প্রশ্ন করে বসল, ‘তুমি কি অন্য কারও প্রতি আকর্ষণ অনুভব করছ?’ নির্ঝর একটু থমকে গেল, খানিক থতমত খেল, তারপর স্বীকার করে নিল অকপটে তাদের সম্পর্কের মাঝে অপর্ণা এসে পড়েছে। নির্ঝরের নতুন সহকর্মী। দিল্লি অফিস থেকে বদলি হয়ে এসেছে। মুনমুনের মতোই স্মার্ট। কিন্তু ভীষণ নম্র। বন্ধুত্ব দিয়েই শুরু হয়েছিল সম্পর্কটা, তারপর কবে যে সে গণ্ডি লঙ্ঘন করেছে দু’জনের কেউ-ই বুঝতে পারেনি। ‘স্মার্ট কিন্তু ভীষণ নম্র’ শব্দগুলো শেলের মতো বিঁধেছিল মুনমুনের মনে। তবে কী সে উদ্ধত? প্রশ্নটা করেও ফেলেছিল সে নির্ঝরকে। কোনও উত্তর দেয়নি নির্ঝর। চোখ নামিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল কেবল। ব্যস, বিষয়টা ওখানেই থেমে গেল। মুনমুন আর এই নিয়ে দ্বিতীয় কথাটিও বলল না। জোড়াতালি দিয়ে তারপরেও কয়েকটা মাস একসঙ্গে থেকেছিল ওরা। তার মধ্যে নির্ঝর বারবার বলার চেষ্টা করেছিল ওদের সম্পর্কটা তো প্রথম থেকেই বাঁধাগতের বাইরে, প্রত্যাশার পরিমাণ কম ইত্যাদি। সবেতেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়া ছাড়া আর কোনও উত্তর দেয়নি মুনমুন। তারপর একদিন স্যুটকেস গুছিয়ে বাড়ির চাবি নির্ঝরের হাতে তুলে দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গিয়েছিল।
নির্ঝরকে সব দিক থেকে স্বাধীন করে মুনমুন চলে গেল। অথচ কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসতে লাগল নির্ঝরের। অপর্ণার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়তে কোনও বাধা আর নেই, তবু অজানা একটা পাপবোধ তাকে তাড়া করে বেড়াত। সারাক্ষণ মনে হতো এর চেয়ে মুনমুন যদি তাকে দোষ দিত, চিৎকার করে ঝগড়া করত, নিজে ঠিক আর নির্ঝর ভুল এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করত, তাহলেই বোধহয় শান্তি পেত সে। কিন্তু এমন কিছুই করেনি মুনমুন। শুধু একটাই প্রশ্ন করেছিল। ব্যস, তারপর চুপচাপ সবটা মেনে নিয়ে চলে গিয়েছে। লিভ ইন সম্পর্কের আলগা বাঁধন ছিঁড়ে মুনমুন নির্ঝরকে স্বাধীন করে দিয়ে গিয়েছে। তবুও কেন অজানা পাপবোধ ক্লান্ত করে তুলছে নির্ঝরকে? কেন সে সহজে অপর্ণার সঙ্গে মিশতে পারছে না? কেন এক অজানা দ্বিধা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কেন বারবার মুনমুনকে ঠকানোর অপরাধ কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে?
লিভ ইন সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তির প্রভাব কতটা এবং কীভাবে পড়ে? মনোবিদ ডাঃ রীমা মুখোপাধ্যায় জানালেন, কোনও সম্পর্ক বা তার ভাঙা-গড়া নিয়ে কথা বলার আগে কয়েকটা জিনিস একটু স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার। আমাদের চোখে কোনটা সমাজসিদ্ধ আর কোনটা নয়। ‘লিভ ইন’ এমনই একটা সম্পর্ক যা এখনও লোকের চোখে ফুলপ্রুফ হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে এই সম্পর্কটা নিয়ে অনেকের মনেই একটা দ্বিধা কাজ করে। এখন প্রশ্ন হল এহেন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কি তৃতীয় ব্যক্তির আনাগোনা অশনিসঙ্কেত রূপে ধরা দেয়? রীমা মুখোপাধ্যায়ের মতে, অবশ্যই দেয়। কিন্তু তারও কিছু তারতম্য রয়েছে। অর্থাৎ যাঁরা এই লিভ ইন সম্পর্কের মধ্যে যাচ্ছেন তাঁদের দু’জনের মনোভাবই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু ভাগ রয়েছে
এখানে কিছু ভাগ রয়েছে। এগুলো সবই মনোভাবগত ভাগ। যেমন অনেক ক্ষেত্রেই লিভ ইন রিলেশনশিপ-এর দু’জন পার্টনার এই সম্পর্কটা নিয়ে খুব একটা তলিয়ে ভাবেন না। তাঁদের মনোভাব এইরকম—
(১) একজনকে আমার ভালো লাগে, প্রেমের বাইরে সম্পর্কটা নিয়ে যেতে চাই। অথচ বিয়ে করব কি না, স্থির করতে পারছি না। অতএব একসঙ্গে থেকে দেখা যাক। ভালো লাগলে বিয়ে করা যেতেই পারে।
(২) বিয়ে নামের ব্যবস্থাটির প্রতি আমার কোনও আস্থা বা বিশ্বাস কিছুই নেই। তাই কারও প্রতি সৎ থাকতে গেলে তাকে বিয়ে করতে হবে একথা ঠিক নয়। ফলে আমার কাছে লিভ ইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজনকে ভালোবেসে তার সঙ্গে ঘর বাঁধার জন্য লিভ ইন-ই যথেষ্ট, বিয়ে অপ্রয়োজনীয়।
(৩) আমরা কেউ-ই একজনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকায় বিশ্বাসী নই। ফলে লিভ ইন সম্পর্কই আমাদের জন্য আদর্শ।
মনোভাবের বাছবিচার
এই যে তিন ধরনের মনোভাব, এর উপর লিভ ইন সম্পর্কের ভাঙা গড়া, তৃতীয় ব্যক্তির প্রভাব সবই নির্ভর করে। এবার একে একে প্রতিটি ক্ষেত্র বিচার করা যাক। যদি প্রথম ক্ষেত্রটি দেখা হয় তাহলে তার মধ্যে একটা মানসিক দ্বন্দ্ব প্রথম থেকেই লক্ষ করা যাচ্ছে। ভালোবাসি কিন্তু সারা জীবন কাটাতে পারব কিনা জানি না। ফলে বিয়ে করার ঝামেলায় যেতে চাই না। কেন? না, তাহলেই আবার বিয়ে ভাঙা, আইনি পথে ডিভোর্স ইত্যাদির একটা প্রশ্ন থেকে যায়। তার চেয়ে বরং লিভ ইন-এ থাকা যাক। যতদিন ভালো লাগল থাকলাম। যবে মনে হল ছেড়ে দিলাম। বা যদি মনে হয় তাহলে সারা জীবনই একসঙ্গে থেকে গেলাম। এবার এই যে একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া, অথচ বিয়ে না করা, এর মধ্যে কিছু না বলা কথা থেকে যায়। সেই কথাগুলো যে সম্পর্কে যত বেশি থাকে ততই সমস্যার আশঙ্কাও বাড়ে। কিন্তু লিভ ইন রিলেশন যদি প্রথম থেকেই স্বচ্ছ হয় তাহলে সমস্যা অনেক কমে যায়। এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার, যে কোনও সম্পর্কেই একটা আশা বা এক্সপেকটেশন থাকে। একে অপরের কাছে কিছু পাওয়ার বাসনা থাকে। সেই কথাগুলো সম্পর্ক গড়ার শুরুতেই বলে নেওয়া দরকার।
একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বোঝাতে সুবিধে হবে। ধরুন একটি পুরুষ ও একটি নারী একটা লিভ ইন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। তখন একেবারে গোড়াতেই তাদের পরিষ্কার করে বলে নিতে হবে তারা সেই সম্পর্কটা থেকে কী কী চায়। একে অপরের কাছে তাদের প্রত্যাশা কতটা? এটা যদি প্রথমেই স্পষ্ট করে নেওয়া যায় তাহলে সমস্যা অনেকটাই কম হয়। অর্থাৎ যদি মেয়েটি মনে করে সম্পর্কটা লিভ ইন হলেও তাতে সম্পূর্ণ সততা থাকা দরকার, তাহলে প্রথমেই সেটা স্পষ্ট করে পুরুষটিকে জানিয়ে দিতে হবে। পুরুষটি যদি এর সঙ্গে সহমত হন তবেই তিনি সম্পর্কে জড়াবেন, নাহলে নয়। অথবা যদি পুরুষটি মনে করে তিনি ‘ওপেন রিলেশন’ রাখতে চান তাহলেও সেটা বলে নেওয়া দরকার। সাধারণত যাঁরা কমিটমেন্ট বা সেটলমেন্টে যেতে চান না, তাঁদের মধ্যে একাধিক সম্পর্ক তৈরি করার প্রবণতা থাকে। একটা সম্পর্কে থাকতে থাকতেও অন্য সম্পর্ক গড়তে তাঁরা দ্বিধাবোধ করেন না। কিন্তু এটা যদি হয় তাহলেও তা একে অপরকে জানিয়ে দেওয়া উচিত।
দ্বিতীয় ক্ষেত্র, তর্থাৎ লিভ ইন-ই ভালো, সম্পর্কে সততা বজায় রাখতে বিয়ের প্রয়োজন নেই— এই মনোভাবের ক্ষেত্রে নারী, পুরুষ দু’জনের মধ্যেই একটা কমিটমেন্ট কাজ করে। ফলে এখানে তৃতীয় ব্যক্তির আবির্ভাব ও সেই নিয়ে সমস্যার সম্ভাবনা কম। কিন্তু যদিও বা তৃতীয় ব্যক্তি এই ধরনের সম্পর্কে আসে তখনও দেখা যায় নারী এবং পুরুষ দু’জনেই সে বিষয়ে খুবই স্বচ্ছ থাকেন। একে অপরকে প্রথমেই জানিয়ে দেন বিষয়টি নিয়ে এবং সেই অনুযায়ী দু’জনে মিলে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রটিতে ‘হার্টব্রেক’ বেশি মাত্রায় হয়। বিশ্বাসের পরিমাণটাও বেশি থাকে বলেই বোধহয় এক্ষেত্রে সম্পর্কটা ভেঙে যাওয়ার পর তার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগে। তবে এই যে মনখারাপ, হার্টব্রেক যা-ই হোক না কেন, সেটা কিন্তু উভয় তরফেই ঘটে। অর্থাৎ সম্পর্কে যিনি তৃতীয় ব্যক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছেন, তিনিও যে মনখারাপ থেকে মুক্ত থাকেন তা নয়। তার একটা কারণ হয়তো অপরাধবোধ। অর্থাৎ একটা মনোভাব নিয়ে সম্পর্কটা তৈরি হয়েছিল। তারপরে অন্য একজনের চারিত্রিক বিচ্যুতির ফলে তা ভেঙে গেল। তখন যিনি ভাঙলেন, তিনিও অসম্ভব অপরাধবোধে ভোগেন। অন্যজনকে ঠকানোর খারাপ লাগাটা অনেক ক্ষেত্রেই এঁদের সারা জীবনই থেকে যায়। উল্টোদিকে যিনি ঠকলেন তাঁর একটা মন ভেঙে যাওয়ার মতো দুঃখ হয়। পরবর্তীকালে কোনও সম্পর্ক তৈরি করতেও হয়তো দ্বিধাবোধ করেন। নিজের প্রতি, নিজের আচরণের প্রতি, সহজাত স্বভাবের প্রতি নিজেই সন্দিহান হয়ে পড়েন। সবসময় একটা সংশয় কাজ করতে থাকে মনে মনে।
তৃতীয় ক্ষেত্রটি, যেখানে একজনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার কোনও দাবিই নেই, সেখানেও কিন্তু সম্পর্কে তৃতীয় কেউ এলে সমস্যা তৈরি হয়। এক্ষেত্রে প্রথম থেকেই সম্পর্কে অসৎ মনোভাব থাকে। কোনও একজনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা সম্ভব নয়, এই চিন্তাধারা নিয়ে কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াটাই ভুল। ফলে এই ধরনের সম্পর্কে যখন তৃতীয় ব্যক্তি, এমনকী চতুর্থ ব্যক্তিও আসে তখনও একেবারে গোড়ার সম্পর্কে দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব কাজ করে। এখানে একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে লিভ ইন রিলেশনে গেল, তারপর মেয়েটি অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল। স্বাভাবিকভাবেই প্রাথমিক সম্পর্কটা একটু হলেও চিড় খেল। তারপর ছেলেটিও অন্য একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল, তখন দেখা গেল মেয়েটি, যার কিনা একাধিক সম্পর্ক রয়েছে সে-ই বিষয়টা মেনে নিতে পারছে না। এই ধরনের দ্বৈত মনোভাব চলতেই থাকে। ফলে এই সম্পর্কগুলো শুরুই হয় ভাঙবে বলে, এবং যখন ভাঙে তখন তিক্ততার মাত্রা তাতে বেশ বেশিই থাকে।
বলাটা কঠিন
একে অপরকে তৃতীয় সম্পর্কের কথা জানানো নিয়েও অনেক সমস্যা দেখা দেয়। পুরুষ বা নারী যে-ই অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, অপরজন তখন একটা হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করেন। তাঁর মনে হয় নিজের মধ্যে কিছু অপূর্ণতা নিশ্চয়ই রয়েছে, যে কারণে অন্যজন তৃতীয় ব্যক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। অথবা তাঁর বিশ্বাসে একটা বড়সড় ধাক্কা লাগে। আত্মবিশ্বাসে একটু ঘাটতি দেখা দেয়। নিজেই নিজেকে বারবার প্রশ্ন করতে থাকে কী করছি, ঠিক করছি কি না ইত্যাদি। এবং এর কারণেও মানসিক অবসাদের সৃষ্টি হয়। ফলে লিভ ইন সম্পর্ক হলেও তাতে তৃতীয় ব্যক্তির আবির্ভাবের কথাটা একে অপরকে জানানো একটা কঠিন কাজ। যে কোনও সম্পর্কেই কিছুদিন থাকার পর একে অপরের প্রতি নির্ভরতা, বিশ্বাস, অভ্যাস ইত্যাদি তৈরি হয়। এবং এগুলোর হাত ধরেই কিছু প্রত্যাশারও জন্ম হয়। ফলে হঠাৎ সেখানে একজন যখন অন্য একটি সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে পড়ে তখন তাঁর সঙ্গীকে সেটা বোঝানো বা জানানো কঠিন হয়। আর সেই থেকেই অনেকে পুরো ব্যাপারটা আড়ালে রাখার চেষ্টা করেন। লিভ ইন-এর ক্ষেত্রে এই আড়াল করার প্রবণতা বেশি। কারণ এখানে অনেকেই ভাবেন সম্পর্কটা যখন লিখিত পড়িত নয়, তখন তাতে বাধ্যবাধকতাও কম। ফলে অন্য সম্পর্ক তৈরি হলেও প্রথমজনকে যে ঠকানো হচ্ছে এই কথাটা তাঁদের মাথায় কাজই করে না। অনেকটা ভাবের ঘরে চুরি করার মতো দাঁড়ায়। যাই হোক, যে কোনও সম্পর্কই বেশিদিন আড়াল করা যায় না, ধরা একদিন সবাই পড়েন। আর তখনই অন্যজন আহত হন। তাঁর মনে নানারকম দ্বন্দ্ব কাজ করতে শুরু করে।
সমাধানটা কী?
লিভ ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে যখন তৃতীয় ব্যক্তির প্রভাবে সমস্যার সৃষ্টি হয়, অবসাদ আসে তখন কী করবেন?
একে অপরের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলুন।
যে কোনও সম্পর্কই দাঁড়িয়ে থাকে সততার উপর। ফলে একে অপরের কাছে সৎ থাকা ভীষণ জরুরি।
যিনি একটা সম্পর্কে থাকতে তৃতীয় কারও প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছেন তাঁকেই ভেবে নিতে হবে যে এই কাজের কিছু কনসিকুয়েন্স থাকবে। এবং সেটার মোকাবিলা করা প্রয়োজন। তৃতীয় কোনও সম্পর্কে লিপ্ত হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেটা নিয়ে নিজের পার্টনারের সঙ্গে কথা বলুন।
সম্পর্ক ভেঙে যাবে, বন্ধুত্ব নষ্ট হবে, অন্যজন দুঃখ পাবে— এই ধরনের অজুহাত দিয়ে নিজেকে বোঝাবেন না। তাতে সমস্যা এড়ানো যাবে না।
যিনি তৃতীয় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন তাঁকে খুব সহানুভূতির সঙ্গে, সন্তর্পণে জিনিসটা সামলাতে হবে।
লিভ ইন সম্পর্ক মূলত আধুনিক। কিন্তু এটা ভেবে যদি খোলামেলা কথাবার্তা বন্ধ করে দেন তাহলে সমস্যা বাড়বে বই কমবে না।
একটা পরিণত মনোভাব নিয়ে এই সম্পর্কে ঢুকতে হবে। ধরেই নিতে হবে এই সম্পর্কটা কখনও না কখনও ভেঙে যাবে। কেউ অন্য সম্পর্কে লিপ্ত হবে। ফলে তা নিয়ে মনখারাপ হতে পারে, কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না। এই মনোভাব যদি প্রথম থেকেই দু’জন লিভ ইন পার্টনারের মধ্যে থাকে তাহলে কোনও সমস্যা হয় না। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সম্পর্ক নিজের ছন্দে চলেছে। তাতে নির্ভরতার সঙ্গেই কিছু প্রত্যাশা যুক্ত হয়েছে এবং সব মিলিয়ে সম্পর্কটা বিয়ের নামান্তর হয়ে গিয়েছে। এবার এই মনোভাব যদি দু’জনেরই সমানভাবে আসে, তাহলে কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু একজন আধুনিক মনোভাবে লিভ ইন-এ থাকলে আর অন্যজন বিয়ের নামান্তর হিসেবে সম্পর্কটাকে দেখতে শুরু করলে মুশকিল। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয়জনকে এগিয়ে এসে নিজের মনোভাব, মানসিকতার বদল ইত্যাদি খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে।
মনে রাখবেন, আর পাঁচটা সম্পর্কের মতোই লিভ ইন রিলেশনেও কমিউনিকেশন খুবই জরুরি। সেটা যত ভালো করা যাবে ততই সম্পর্ক টেকসই হবে। সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া যাবে।
লিভ ইন সম্পর্কে যখন বিশ্বাসের অভাব ঘটে, সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিছুদিন গেলে পরিস্থিতি বদলে যাবে, বিশ্বাস ফিরে আসবে, পার্টনারের আচরণে বদল দেখা দেবে এই ধরনের মনোভাব রাখা চলবে না। একবার যখন বিশ্বাস ভেঙে যায় তা কিন্তু আর জোড়া লাগে না। একসঙ্গে থেকে একে অপরকে সন্দেহ করে মনখারাপ করার চেয়ে সম্পর্ক ভেঙে বেরিয়ে আসা অনেক ভালো। তাতে হার্টব্রেক, অবসাদ কিছুই থাকে না।
আর ভাবের ঘরে চুরি করবেন না। লিভ ইন সম্পর্কে যেমন কিছু সুবিধা আছে, আধুনিকতার আড়াল আছে, তেমনই কিছু অসুবিধাও আছে। সেটা মন থেকে মেনে নিতে হবে। তাহলে তৃতীয় ব্যক্তির প্রভাব এবং তার থেকে তৈরি হওয়া অবসাদ অনেকটাই কমে যাবে।
অন্যের উপর প্রভাব
লিভ ইন সম্পর্ক এখনও সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের আগের প্রজন্মের অধিকাংশই এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেন না। ফলে সেই সম্পর্ক যখন ভেঙে যায়, একজন যখন অপরজনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেন তখন বাবা মা বা বাড়ির আর পাঁচজন গুরুজনের মুখে একটা ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম’ গোছের সংলাপ শোনা যায়। এটা এড়ানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে লিভ ইন-রত পাত্র বা পাত্রী কেউ-ই সম্পর্ক ভেঙে গেলেও তা প্রথমেই বাড়িতে জানাতে চায় না। মেয়েদের মধ্যে এই লুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতাটা ছেলেদের চেয়ে বেশি। তার কারণ হয়তো কিছুটা হলেও আমাদের সমাজ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পর্ক ভাঙা বা গড়ার দায় মেয়েটির উপর বর্তায়। ফলে তারা সম্পর্ক খারাপ হলেও তা যতদিন সম্ভব বাড়িতে জানাতে চায় না।
তবে এর অন্যথাও হয়। এমন সম্পর্কে মা বাবা অনেক সময় অন্যজনের (মেয়ের ক্ষেত্রে ছেলেটির, ছেলের ক্ষেত্রে মেয়েটির) উপর অতিরিক্ত ভরসা করে ফেলেন। তখন সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলে বাবা মা খুবই আহত হন। অনেক সময় তাঁরা ভাবেন লিভ ইন না হয়ে বিয়ে করলে হয়তো বা সম্পর্কের স্থায়িত্ব প্রগাঢ় হতো। তবে যাই হোক না কেন, লিভ ইন সম্পর্ক ভেঙে গেলে শুধুই যে পাত্র পাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা নয়, কিছু প্রভাব বাড়ির অন্যান্যদের উপরেও পড়ে। সাধারণত লিভ ইন সম্পর্ক যদি একাধিক বছর গড়িয়ে যায় তাহলে তা ভেঙে যাওয়ার পর বাবা-মা বা বাড়ির অন্যান্যরা বেশি প্রভাবিত হন। আসলে সময়ের সঙ্গে মনে মনে ছেলেটিকে বা মেয়েটিকে বাড়ির একজন হিসেবে ভেবে নিতে শুরু করার পর যখন সেই সম্পর্ক ভেঙে ছেলেটি বা মেয়েটি বেরিয়ে যায় তখন মন তাদের ছাড়তে চায় না। মনে হয়, পরিবার যেন সদস্যহারা হয়ে গেল। এই ধাক্কা অনেক বাবা মা সামলে উঠতে পারেন না। মন খারাপ এতটাই গুরুতর হয়ে যায় যে শরীরও ভেঙে পড়ে। এই জিনিসগুলো একটু খেয়াল রেখে সচেতনভাবে লিভ ইন সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে খেয়াল আমরা করতে পারি না।
বিদেশে সমাজটা একটু খোলামেলা বলে অনেক সময় ছেলের আগের পক্ষের সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্ক বজায় থাকে। পাত্র-পাত্রী নির্বিশেষেই বাবা মায়ের সম্পর্ক বজায় রাখা সেখানে অদ্ভুত বা অস্বাভাবিক কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু আমাদের মতো সমাজে এগুলোই দৃষ্টিকটু হয়ে দাঁড়ায়। ফলে হার্টব্রেক, অন্যের উপর তার প্রভাব ইত্যাদি নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। পাশ্চাত্যের অনুকরণে যখন সম্পর্কে সমীকরণগুলো পাল্টে যাচ্ছে ক্রমশ তখন মনোভাবগুলোও বদলে ফেলার সময় কিন্তু এসে গিয়েছে। এবং সেটা সব প্রজন্মেরই মনে রাখা দরকার। তাহলে সমস্যার ভাগ অনেকটাই কমে যাবে।