জগৎ দেখলে বোঝা যায় যে তিনি আছেন। কিন্তু তাঁর বিষয়ে শোনা একরকম, তাঁকে দেখা একরকম, তাঁর সঙ্গে আলাপ করা আর একরকম। দুধের কথা কেউ শুনেছে, কেউ দেখেছে, কেউ খেয়েছে। আমার জ্ঞানীর স্বভাব নয়। জ্ঞানী আপনাকে বড় দেখে। আমার স্বভাব মা সব জানে। তিনি আমায় ভক্তের অবস্থায় বিজ্ঞানীর অবস্থায় রেখেছেন। তাই রাখাল প্রভৃতির সঙ্গে ফচ্কিমি করি। জ্ঞানীর অবস্থায় উটি হয় না। যে নিত্যে পৌঁছে লীলা নিয়ে থাকে, আবার লীলা থেকে নিত্যে যেতে পারে, তারই পাকা জ্ঞান, পাকা ভক্তি। নারদাদি ব্রহ্মজ্ঞানের পর ভক্তি নিয়ে ছিলেন। এরই নাম বিজ্ঞান। শুধু শুষ্ক জ্ঞান—ও যেন ভস্ করে ওঠা তুবড়ি—খানিকটা ফুল কেটে ভস্ করে ভেঙ্গে যায়। জ্ঞানী সাধু আর বিজ্ঞানী সাধুর প্রভেদ আছে। জ্ঞানী সাধুর বসবার ভক্তি আলাদা। গোঁপে চাড়া দিয়ে বসে। কেউ দেখা করতে এলে বলে, ‘তুমি কেমন আছ; বাড়ীর সব কেমন আছে? তোমার কিছু জিজ্ঞাসা আছে?’ আর বিজ্ঞানী সাধু, যে ঈশ্বরকে সর্ব্বদা দর্শন করছে, তাঁর সঙ্গে কথা কচ্চে, তার স্বভাব কখনও বালকবৎ, কখনও জড়বৎ, কখনও উন্মাদবৎ, কখনও পিশাচবৎ। পাঁচ বছর বালকের মত স্বভাব হয়। লজ্জা, ঘৃণা, সঙ্কোচ প্রভৃতি কোন পাশ নাই—ত্রিগুণাতীত—কোন গুণের আঁট নেই। জড়বৎ—সমাধিস্থ হয়ে বাহ্য শূন্য হয়—জড়ের ন্যায় চুপ করে বসে থাকে।
ঈশ্বর দর্শন করলে আর ছেলে মেয়ের জন্ম দেওয়া, সৃষ্টির কাজ হয় না। ধান পুতলে গাছ হয়, কিন্তু সিদ্ধ ধান পুতলে গাছ হয় না। ঈশ্বর দর্শন করলে ‘আমি’টা নাম মাত্র থাকে, সে ‘আমি’র দ্বারা কোন অন্যায় কাজ হয় না। যেমন নারিকেলের দাগ, বেল্লো ঝরে গেলে কেবল দাগমাত্র থাকে।
প্রহ্লাদের যখন তত্ত্বজ্ঞান হত, তখন তিনি সোঽহং হয়ে থাকতেন। আবার যখন দেহবুদ্ধি আসত তখন ‘আমি তোমার দাস’ এই ভাব আসত। হনুমানেরও কখন ‘সোঽহং’ কখন ‘দাস আমি’ কখন ‘আমি তোমার অংশ’ এই ভাব আসত। ভক্তি নিয়ে না থাকলে মানুষ কি নিয়ে দিন কাটায়? ‘আমি’ তো যাবার নয়, সমাধিস্থ হলে ‘আমি’ পুঁছে যায়,—তখন যা আছে তাই।
পরমহংসের সর্ব্বদা এই বোধ—ঈশ্বরই সত্য আর সব অনিত্য। দুধকে জল থেকে তফাৎ করা কেবল হাঁসেরই শক্তি আছে। দুধে জলে যদি মিশিয়ে থাকে, তাদের জিভেতে একরকম টক রস আছে, সেই রসের দ্বারা দুধ আর জল আলাদা আলাদা হয়ে যায়। পরমহংসের মুখেও সেই টক রস আছে, প্রেমাভক্তি। প্রেমাভক্তি থাকলেই নিত্য অনিত্য বিবেক হয়। ঈশ্বরের অনুভূতি হয়, ঈশ্বর দর্শন হয়। জ্ঞান জ্ঞান বললেই কি জ্ঞান হয়? জ্ঞান হবার লক্ষণ আছে। দুটী লক্ষণ—প্রথম, ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ চাই, ভালবাসা চাই। শুধু জ্ঞান বিচার করছি, অথচ তাঁর উপর ভালবাসা নাই, সে মিছে। আর একটী, কুলকুণ্ডলিনীকে জাগাতে হবে। কুণ্ডলিনী শক্তি যতক্ষণ নিদ্রিত থাকেন ততক্ষণ জ্ঞান হয় না। বসে বসে বই পড়ে বিচার করছি অথচ ভিতরে ব্যাকুলতা নাই, সেটী জ্ঞানের লক্ষণ নয়। কুমারকৃষ্ণ নন্দী সংকলিত ‘শ্রীরামকৃষ্ণ বাণী ও শাস্ত্রপ্রমাণ’ থেকে