সৌম্যজিৎ সাহা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: প্রায় ৩১৯ বছর আগেকার কথা। জমিদার লক্ষ্মীকান্ত ভট্টাচার্য হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান। শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় দেহ। কিন্তু চিতা সাজানোর সময় সবাইকে অবাক করে দিয়ে আচমকা জেগে ওঠেন তিনি। বিস্মিত শ্মশানযাত্রীরা। তাঁরা তড়িঘড়ি তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এমন অলৌকিক ঘটনা ঘটার পর থেকেই বাড়িতে দুর্গাপুজো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন লক্ষ্মীকান্তের বাবা হরমোহন ভট্টাচার্য। এভাবেই ডায়মন্ডহারবারের বাসুলডাঙার বারোদ্রোণে পুজোর সূচনা হয়েছিল ভট্টাচার্য পরিবারে। রীতি, রেওয়াজ মেনে এখনও পরিবারের বর্তমান সদস্যরা পুজো করে চলেছেন। এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, ঠাকুরের ভোগ থেকে নারকেলের নাড়ু, পুজোআচ্চা— সবই গঙ্গাজল দিয়ে করা হয়। সেই নিয়ম এখনও চলে আসছে। এই নারকেলের নাড়ুই মাকে মিষ্টি হিসেবে দেওয়া হয়। দোকান থেকে কেনা মিষ্টি বা সন্দেশ ঠাকুরকে দেওয়া হয় না। যাঁরা পুজো দিতে আসেন, তাঁদের মিষ্টি আলাদা করে রাখা হয়। এছাড়াও পুজোয় দুই কুইন্টাল আতপ চাল লাগে। নৈবেদ্য তৈরি করা হয় আট পালি চাল দিয়ে। সঙ্গে ফুলকপি, কড়াইশুঁটি এবং নতুন আলু। এখন ম্যারাপ বেঁধে ভক্তদের খাওয়ানো হয়। আগে অবশ্য এমন আড়ম্বর ছিল না।
পরিবারের সদস্য আশিস ভট্টাচার্য পুজোর রীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আগে ১২-১৪টি পাঁঠা বলি দেওয়া হতো। এখন সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে তিনটি পাঁঠা বলি হয়। এছাড়াও বলি দেওয়া হয় আখ ও চালকুমড়ো। ভট্টাচার্যদের জমিদারি ছিল যকন, তখন পুজোয় বসার আগে শূন্যে বন্দুকের গুলি ছোড়া হতো। সেই রীতি এখন আর পালন করা হয় না। পরিবারের সদস্যরা জানান, এখন আর বন্দুক নেই। আগে পুজোয় যে জাঁকজমক ছিল, তাও অনেকটা কমেছে বলে জানান আশিসবাবু। তাঁর কথায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের অনেকেই এদিক সেদিকে চলে গিয়েছেন। তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, বাড়ির পুজোয় কোনও খামতি রাখা হয় না। আগে গ্রামের প্রায় সব মানুষই এখানে এসে ভোগ খেতেন। সেই সংখ্যাও এখন কমেছে।
মায়ের হাতের সব অস্ত্রই রুপো দিয়ে তৈরি। গয়নাও সব আসল। পরিবারের সদস্যদের কথায়, এই পুজোয় প্রচুর গঙ্গাজল লাগে। প্রথমদিকে, ৭০-৮০টি মাটির কলসি ভর্তি করে দক্ষিণ বিষ্ণুপুর থেকে গঙ্গার জল আনা হতো। কিন্তু পরবর্তীকালে পরিবহণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এখন ১৪টি বড় ড্রাম ভর্তি করে জল আনা হয়। মহালয়ার পর থেকেই গঙ্গাজল মজুত করা শুরু হয়। বিসর্জন হয় সন্ধ্যা নামার আগে।



