নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: জরাজীর্ণ ধ্বংসাবশেষ। কালের নিয়মে কোনোমতে টিকে রয়েছে একটি প্রাচীন প্রাচীর, আর তাতে এখনও আবছা অক্ষরে লেখা ‘দুবরাজপুর পোস্ট অফিস’। পরাধীন ভারতে ঠিক এই জায়গাতেই ব্রিটিশদের ঔদ্ধত্য গুঁড়িয়ে সগর্বে উড়েছিল ভারতের জাতীয় পতাকা। অথচ উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে আজ ধুলোয় মিশে যেতে বসেছে ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এবার স্বাধীনতা সংগ্রামের এই নীরব সাক্ষী অর্থাৎ ওই প্রাচীন ডাকঘর এবং সংলগ্ন মুন্সেফ আদালত ভবনকে অবিলম্বে হেরিটেজ স্থানের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুললেন দুবরাজপুরের সাধারণ মানুষ। শহরবাসীর এই আবেগ ও দাবিকে মান্যতা দিয়েই সম্প্রতি রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের কাছে একটি লিখিত আবেদন জানান শহরের এক আইনজীবী। ইতিহাসের পাতা উল্টোলে জানা যায়, ১৯৪২ সালের আগস্ট মাস নাগাদ গোটা দেশ মহাত্মা গান্ধীর ডাকা ‹ভারত ছাড়ো› আন্দোলনে তখন উত্তাল। সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রবল আঁচ বীরভূমের লালমাটিতেও এসে পড়েছিল। ২৮ অগস্ট (মতান্তরে ২৮ সেপ্টেম্বর) দুবরাজপুরের বুকে আছড়ে পড়ে এক বিশাল ব্রিটিশ বিরোধী গণ-বিক্ষোভ। প্রায় ৫০০ জন অকুতোভয় দেশপ্রেমিক একজোট হয়ে ‹বন্দে মাতরম› স্লোগান দিয়ে পদযাত্রা করে তৎকালীন মুন্সেফ আদালত এবং তার পূর্ব দিকে অবস্থিত ওই ডাকঘরের দিকে এগিয়ে যান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল অটুট। পরাধীন ভারতের মাটিতে ঔপনিবেশিক শক্তির দম্ভের প্রতীক ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা। ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা সেদিন আদালত ও ডাকঘরে ঢুকে ব্রিটিশ প্রশাসনের একাধিক সরকারি নথিপত্র পুড়িয়ে ধ্বংস করেন। প্রবল ক্ষোভ উগরে দিয়ে তেরঙ্গা উত্তোলন করেন। এই ঘটনার পরেই আসরে নামে ব্রিটিশ প্রশাসন। আন্দোলন দমনে বিশাল বাহিনী ও পুলিশ নামিয়ে শুরু হয় অকথ্য অত্যাচার। এই গণ-বিস্ফোরণকে দমন করার পর ব্রিটিশ সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একটি মামলা রুজু করেছিল। ব্রিটিশদের খাতায় যার নাম দেওয়া হয় ‹দুবরাজপুর হাঙ্গামা› মামলা। সেই মামলায় প্রায় ৫০জন স্বাধীনতা সংগ্রামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে পঁচিশ জনের বেশি বিপ্লবীর কঠোর সাজা হয়। বেশ কয়েকজন প্রথম সারির আন্দোলনকারীকে আন্দামানের সেলুলার জেলে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। সেই নির্বাসিত বিপ্লবীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দুবরাজপুরের ভূমিপুত্র হারান খাঙ্গার। আন্দামানের জেলের দেওয়ালে আজও স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা রয়েছে বীরভূমের এই বীর সন্তানের নাম।
দুবরাজপুরের আইনজীব অভিজিৎ ভট্টাচার্যর কথায়, দুবরাজপুর, হেতমপুর ও সংলগ্ন এলাকার মানুষের কাছে হেরিটেজ ঘোষণার দাবি নিছকই কোনো ইট-পাথরের ভবনের সংরক্ষণ নয়। বরং নিজেদের আত্মপরিচয় ও পূর্বপুরুষদের বীরগাথাকে বাঁচিয়ে রাখার এক লড়াই। সাধারণ মানুষের দাবিকে মান্যতা দিয়েই পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের সচিবের কাছে ওই আবেদনপত্র পাঠিয়েছি। আবেদনের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বীরভূম জেলা দায়রা বিচারক, জেলাশাসক, রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী এবং স্থানীয় বিধায়ক-সহ নাগরিক সমিতির সম্পাদকের কাছেও। বিধায়ক অনুপ সাহা বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।



