সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: আসানসোল পুরসভার ৫৮নম্বর ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় কার্যত একটি পরিবারের রাজত্ব চলে। নিজের জমি ইচ্ছেমতো বিক্রি করার অধিকার নেই এলাকার বাসিন্দাদের। কোনোভাবে জমি বিক্রি করলেও নতুন মালিক তা দখল নিতে পারবেন না। তার আগেই ‘রাজা’র অনুগামীরা অল্প টাকার বিনিময়ে তা দখল করে নেয়। সাধারণ মানুষের জন্য পথবাতি বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পুরসভা। ওই পরিবারের অঙ্গুলিহেলনে তা বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ। এই পরিবার প্রশাসনের সঙ্গেও টক্কর নেয়। এই এলাকা দিয়ে হাইটেনশন বিদ্যুতের তার নিয়ে যেতে নাজেহাল হয়েছিল প্রশাসন।
এই পরিবার আদতে জমি হাঙর। বাম আমল থেকে তৃণমূলের শাসনকালে ১৫ বছর একইভাবে প্রভাব খাটিয়ে গিয়েছে তারা। বাম আমলে বাবা ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ। সরকার বদল হতেই এক ছেলেকে তৃণমূলে ভিড়িয়ে দেন। বিপুল অর্থবলের জেরে সেই ছেলেই এলাকায় ছড়ি ঘোরাতে থাকেন। সরকার বদল হলেও একইরকমভাবে ওই অবাঙালি পরিবারের কর্তৃত্ব বজায় থাকে। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর একদা বাম নেতা তাঁর আর এক ছেলেকে বিজেপিতে ভিড়িয়ে দিতে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। কৌশল সফল হলেই ফের ধেমো মেন এলাকার বাসিন্দাদের ওই পরিবারের ‘দাসত্ব’ স্বীকার করতে হবে। পরিস্থিতি টের পেয়ে এলাকার বাসিন্দারা বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য থেকে বিজেপি শীর্ষনেতাদের কাছে গণস্বাক্ষরিত স্মারকলিপি পাঠিয়েছেন। বাম আমল থেকে তৃণমূল আমল পর্যন্ত তাঁদের লাগামছাড়া দুর্নীতির প্রমাণ সহ অভিযোগপত্র পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের কাছেও। বিজেপি সরকারের কাছে তাঁরা সুবিচার চাইছেন। শিল্পাঞ্চলের নানা প্রান্তেই এই অবস্থা। আসানসোল উত্তর বিধানসভা এলাকায় একসময় কয়লা মাফিয়ারা এখন জমি মাফিয়া হয়ে ১৯নম্বর জাতীয় সড়কের দু’পাশের সব জমি দখল করেছে। বহু দুঃস্থ পরিবারের জমি, পুকুর দখল করে নির্মাণ হয়েছে। তাঁরা নতুন সরকারের কাছে সুবিচারের আশা করছেন। একই অবস্থা অণ্ডাল ব্লকজুড়ে। সেখানেও সরকারি বহু জমি দখল হয়ে গিয়েছে। এলাকার অনেকের জমি জমি হাঙরদের নামে রেকর্ড হয়ে গিয়েছে। বারাবনি বিধানসভা এলাকায় জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে পাথর খাদান, ক্র্যাশার। তৃণমূল আমলে বিচার পাননি তাঁরা।
একইভাবে হীরাপুর থানা এলাকায় এক প্রভাবশালী বহু সরকারি জমি, সাধারণ মানুষের জমি দখল করেছে বলে অভিযোগ। নতুন সরকার কি তাঁদের বিচার দেবে? এখনও পর্যন্ত নতুন সরকারের পদক্ষেপ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেরই সীমাবদ্ধ। বেনিয়ম, তোলাবাজি, রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগে বহু তৃণমূল নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু, তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকা মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা কবে হবে সেদিকেই তাকিয়ে আমজনতা। চুপ করে বসে নেই জমিহাঙর মাফিয়ারাও। তারা তলায় তলায় বিজেপির সঙ্গে ‘সেটিং’ করতে মরিয়া। শিল্পাঞ্চলে ঠিক যেমনটা ঘটেছিল ২০১১সালের পর। বাম আমলের প্রভাবশালীরা জামা পালটে রাতারাতি তৃণমূলী হয়ে গিয়েছিলেন। জমির দালালরা তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে পার্টনারশিপে প্রোমোটারিও চালিয়েছেন। এখন বিজেপি নেতাদের কাছে আসছে নানা ‘অফার’। কিছু নেতা পত্রপাঠ তা বিদায় করে দিচ্ছেন। কিছু নেতা টাকার গন্ধ পেয়ে তাঁদের কিছুদিনের জন্য ‘চুপ’ থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। ‘শেল্টার’ মিলবে ভেবে সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জমিহাঙর থেকে অবৈধ কারবারিরা। যদিও বিজেপির জেলা সভাপতি দেবতনু ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের দল কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করবে না। আমাদের সরকার অন্যায়কারীদের শাস্তি দেবেই।