সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: অবশেষে মিলল বহু প্রতীক্ষিত জিআই স্বীকৃতি। নদীয়ার কৃষ্ণনগরের বিশ্ববিখ্যাত মাটির পুতুল পেল ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন তথা জিআই রেজিস্ট্রেশনের মর্যাদা। অসংখ্য শিল্পীর আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং ঐতিহ্য রক্ষার লড়াইয়ের স্বীকৃতি মেলায় কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের মধ্যে বইছে খুশির হাওয়া। শিল্পীদের মতে, এই স্বীকৃতি কৃষ্ণনগরের তিন শতাব্দীর বেশি প্রাচীন মৃৎশিল্পের ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও পরিচিতি এনে দেবে।
যদিও এবিষয়ে জানার জন্য জেলাশাসক শ্রীকান্ত পাল্লিকে ফোন করা হলে উনি ফোন ধরেননি। তবে, কৃষ্ণনগর উত্তরের বিজেপি বিধায়ক তারকনাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, মৃৎশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি আমাদের ছিল। সেটাই এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে। কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল জিআই তকমা পাওয়াটা খুশির খবর। আগামী দিনে এই শিল্পের আরও উন্নতি করা হবে। মাটির দলা কীভাবে শিল্পীর হাতের স্পর্শ, ধৈর্য, কল্পনা ও অসাধারণ দক্ষতায় জীবন্ত শিল্পকর্মে পরিণত হতে পারে, তার অনন্য উদাহরণ কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল। প্রতিটি পুতুলের চোখের টান, মুখের আদল, সূক্ষ্ম কারুকার্য এতটাই জীবন্ত হয় যে, প্রথম দেখাতেই অনেকে বিস্মিত হয়ে যান। এই অসামান্য শিল্পনৈপুণ্যই কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলকে ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক শিল্পমহলেও বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছে।
ইতিহাস বলছে, আঠারো শতকে নদীয়ার রাজা মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশে বিশেষ উদ্যোগ নেন। তাঁর আমলে বাংলাদেশের নাটোর অঞ্চল থেকে কিছু দক্ষ মৃৎশিল্পীকে কৃষ্ণনগরে নিয়ে আসা হয়। তাঁদের হাত ধরেই এই শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শিল্পচর্চা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। ঘূর্ণি হয়ে ওঠে বিশ্বখ্যাত মাটির পুতুল তৈরির কেন্দ্র। আজ কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল শুধু বাংলার ঘর সাজানো নয়, আমেরিকা, ইউরোপ,অস্ট্রেলিয়া সহ একাধিক মহাদেশে রপ্তানি হয়। দেশ-বিদেশের নানা শিল্পপ্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক উৎসব এবং জাদুঘরেও এই শিল্প বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে।
এই ঐতিহ্যকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে ২০২১ সালে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করা হয়। এব্যাপারে উদ্যোগী হয় ঘূর্ণি ক্লে ডল অ্যান্ড টেরাকোটা আর্টিজেন ক্লাস্টার কো-অপারেটিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি লিমিটেড। যাচাই পর্বের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করার পর ভারত সরকারের অনুমোদন মিলেছে। সার্টিফিকেট চলে আসবে কিছুদিনের মধ্যেই। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের স্বতন্ত্র ভৌগোলিক পরিচয় এবং সরকারি স্বীকৃতি লাভ করল।
মৃৎশিল্পীরা বলেন, জিআই স্বীকৃতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল কৃষ্ণনগরের নাম ব্যবহার করে অন্য কোথাও তৈরি নিম্নমানের পুতুল বিক্রি করতে পারবে না। ফলে আসল শিল্পের মর্যাদা ও গুণমান বজায় থাকবে। এবার সরকার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের উন্নয়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী সুবীর পাল বলেন, আমাদের অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত। বিশ্বমানচিত্রে আমাদের মৃৎশিল্প জায়গা করে নিল। খুশি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও বেড়ে গেল। আমাদের আরও উন্নতমানের পুতুল তৈরি করতে হবে। সেই পুতুল যাতে আগামী দিনে বিশ্ব বাজারে জায়গা করে নিতে পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা শুভাশিস হালদার বলেন, এখানকার মাটির পুতুল জিআই ট্যাগ পেয়েছে, এটা অত্যন্ত গর্বের বিষয়।