কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: ইতিহাসের একটা বিবর্ণ পাতা হারিয়েই যাচ্ছিল, খপ করে ধরে নেওয়া গিয়েছে। আর স্মৃতির ভারে হারিয়ে যাওয়া কয়েকজন মানুষ। একটি অরঅরাজনৈতিক এবং কিছুটা রাজনৈতিক মুভমেন্ট। আর ১১৫ বছর আগের কলকাতার ভাঙতে থাকা কিছু টুকরো ছবি। তার আগে ছোট একটি প্রশ্ন। কলকাতায় বারোয়ারি পুজো কবে শুরু হয়েছিল মনে আছে?
উত্তর হল, ১৯১০ সালে ভবানীপুরে ‘সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা’ প্রথম আয়োজন করে বারোয়ারি পুজোর। দ্বিতীয় পুজোটি হয় উত্তর কলকাতায় ১৯১১ সালে। সেটি হল, ‘শ্যামপুকুর আদি সার্ব্বজনীন দুর্গোৎসব’। ১১৫ বছরে আগের ইতিহাসের বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সে পৃষ্ঠাটিই একবার উল্টে দেখা ২০২৫ সালের দুর্গোৎসবের আগে।
১৯১১ সাল। ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাঙালিদের লড়াইয়ে অন্য মাত্রা যোগ হয়েছে মোহন বাগানের দৌলতে। গোরাদের হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জিতেছেন ভাদুড়ি ভাইয়েরা। স্বাধীনতা আন্দোলনের পালে নতুন হাওয়া জুগিয়েছে সে জিত। তখন কলকাতা তো এরকম নয়। বড় জমিদার বাড়ি যেমন রয়েছে তেমনই আছে মধ্যবিত্তের একতলা-দোতলা বাড়ি। তেমনই মাটির বাড়িও আছে। শহরে জলাশয় আছে। ফাঁকা জমি, জঙ্গল। কাঁচা রাস্তা। পাড়ার লোকেরা নিজেদের পল্লিবাসী বলে পরিচয় দেন। শ্যামপুকুর তেমনই একটি পল্লিঅঞ্চল। দেশজুড়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। দুর্গাপুজো হচ্ছে জমিদারদের বাড়িতে। জাঁকজমকের শেষ নেই। ইংরেজরা আসছে। আমোদ চলছে যতখুশি। খোলমকুচির মতো উড়ছে টাকা। সাধারণ মানুষ সে পুজোয় অংশ নেয় বটে তবে প্রাণ পায় না। সেই প্রেক্ষিতেই জনসাধারণ ভবানীপুরে বারোয়ারি পুজো শুরু করল। বলা চলে, সে উদ্যোগ তৎকালীন সময়ের বিচারে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনও বটে। রাজবাড়ির অঙ্গন থেকে বেরিয়ে দুর্গা হলেন সবার। সে পথে হাঁটল শ্যামপুকুরও। তার কয়েক বছরের মধ্যে স্বদেশি আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা নেবেবাঙালির দুর্গাপুজো। সুভাষচন্দ্র বসু এবং অন্যান্য বিপ্লবীরা বিপ্লব সংগঠিত করতে দুর্গার আরাধনার দিকে ঝুঁকবেন। শ্যামপুকুর কয়েক বছর এগিয়ে সে কাজ ততদিনে শুরু করে দিয়েছে। সামান্য একটি ঘটনা থেকে যদিও সে পুজোর শুরু কিন্তু তা আন্দোলনের মুক্তপীঠ হয়ে উঠতে দেরি করল না।
ফড়িয়াপুকুর থেকে শ্যামপুকুর স্ট্রিটে পড়ার পর ডানহাতে দু-এক পা এগলে ডানহাতেই একটি সরু গলি। রামধন মিত্র লেন। সেখানে এখনও হয়ে চলেছে শ্যামপুকুর আদি সর্বজনীন। পুজো সেকালের তুলনায় আড়ে বহরে খুব একটি বাড়েনি। জাঁকজমক প্রায় নেই। পাড়ার জনা পঞ্চাশেক উদ্যোক্তা পুজোর কৌলিন্য বজায় রাখতে চাঁদা তুলে প্যান্ডেল করেন। আচারনিষ্ঠ হয়ে পুজো করেন। কলকাতার পুজোর ইতিহাস লিখতে বসলে দ্বিতীয় লাইনেই যে নামটি আসে সেই শ্যামপুকুরের দিকে কর্পোরেট জগতের নজর নেই। ফলে টিমটিম করে জ্বলে কলকাতার দ্বিতীয় বারোয়ারি পুজোর আলো। শহরজুড়েঐতিহ্যের সে ছটাখুব বেশি ছড়ায় না। সত্যচরণ দাস, সুবোধ মিত্র (গোবিন্দ), নিবারণচরণ দাস, দেবেন মিত্র, ফণীবাবু, মণিবাবুদের হাত ধরে শুরু হয়েছিল কলকাতার দ্বিতীয় বারোয়ারির। ইতিহাস তাঁদের ভুলেই গিয়েছে।
বাঙালির সৌভাগ্য, ইতিহাসের বিবর্ণ পাতাটি একেবারে হারিয়ে যায়নি। এখনও মাঝেমধ্যে খুলে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।