সাতের দশকের কথা। কাকা কৃষ্ণকমল চ্যাটার্জি কলকাতা লিগে খেলতেন। কাকার খেলা দেখতেই প্রথম ময়দানে যাওয়া। সে কী উন্মাদনা! আর মোহন বাগান-ইস্ট বেঙ্গলের খেলা থাকলে তো কথায় নেই। সকাল ৯টা থেকেই ভিড় জমে যেত। আমার খেলোয়াড়ি জীবনেও একই অবস্থা। কিন্তু এখন সেই উন্মাদনা উধাও। কোনওরকমে লিগ হচ্ছে। তা’ও অধিকাংশ ম্যাচ হয় জেলায়। আইএসএলের প্লেয়াররা খেলে না। সত্যিই এমন নিম্নমুখী বিবর্তন চোখে দেখা যায় না!
আমাদের সময় সেরা পাঁচ টুর্নামেন্টের মধ্যে ছিল কলকাতা লিগ। আইএফএ শিল্ড, ডুরান্ড, ফেডারেশন কাপ, রোভার্সের সঙ্গে উচ্চারিত হতো সিএফএলের নাম। আমি নিজেও এই লিগ থেকেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছি। উত্তরপাড়া স্পোর্টিং, বালি প্রতিভা হয়ে নাম লেখাই জর্জ টেলিগ্রাফে। অবশ্য কেরিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল জুনিয়র ন্যাশনাল। সেখানে ভালো পারফরম্যান্সের সুবাদেই সবার নজরে পড়ে যাই। প্রথমে আমায় অফার করেছিল ইস্ট বেঙ্গল। তবে ছোট থেকেই বাড়ির সবাই মোহন বাগানের সমর্থক। তাই পালতোলা নৌকাকেই বেছে নিয়েছিলাম। সবুজ-মেরুন জার্সিতে কলকাতা লিগে বহু স্মরণীয় ম্যাচ খেলেছি। একটা ম্যাচের কথা খুব মনে পড়ছে। ১৯৮৬ সালে মোহন বাগান বনাম পোর্ট ট্রাস্ট। তখন লিগের ম্যাচ ৭০ মিনিটের হতো। প্রথম লেগে পোর্ট আমাদের ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে দেয়, যা আমরা কিছুতেই মানতে পারছিলাম। তাই ফিরতি লেগে জবাব দিতে মুখিয়ে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ১-০ জিতি। একমাত্র গোল বাবলু দা’র (সুব্রত ভট্টাচার্যের)। তখন ছোট দলগুলিও এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি ছিল না। আসলে বেশিরভাগ ফুটবলারই তো ছোট টিমে নজর কেড়ে তিন প্রধানের জার্সি গায়ে চাপিয়েছে। শুধু ময়দানের নয়, কলকাতা লিগ তখন ভারতীয় ফুটবলের প্রধান সাপ্লাইলাইন ছিল। এখন ভারতীয় জাতীয় দলে হাতে গোনা বাঙালি ফুটবলার। তাছাড়া এই লিগে রোদে পুড়ে, আবার কখনও বৃষ্টিতে ভিজেও খেলতে হয়। এতে ফুটবলারদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ে। বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সুবিধা হয়।
এখন তো লিগে বিদেশি ফুটবলারও খেলানোর নিয়ম নেই। এর ফলে নিঃসন্দেহে স্থানীয় ফুটবলারদের জন্য সুযোগ বাড়ল। তবে জৌলুসও তো কমেছে। আগে মজিদ বাসকরের অনুশীলন দেখতেই সমর্থকদের ভিড় উপচে পড়ত। তাছাড়া ফুটবল থেকে মধ্যবিত্তদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটাও লিগের অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। এখন তো ফুটবলারদের চাকরিও কমে গিয়েছে। তাই পরিবারের সাপোর্টটাও কমেছে। আর কলকাতা লিগের প্রসার ঘটাতে জেলাতে বেশিরভাগ ম্যাচ করানোর সিদ্ধান্তটাও ব্যুমেরাং হচ্ছে আইএফএ’র । ময়দানেই বেশিরভাগ ম্যাচ আয়োজন করা উচিত। কলকাতা লিগের গরিমা ফেরানোটা খুবই জরুরি।