নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘আড়াই লক্ষ মানুষের স্বার্থের কাছে আড়াইশো মানুষের স্বার্থ বড় হতে পারে না।’ থমকে থাকা তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেল প্রকল্প নিয়ে এবার এমনই মন্তব্য করল কলকাতা হাইকোর্ট। দীর্ঘদিন ধরে ভাবাদিঘির জটে আটকে রয়েছে এই প্রকল্পের কাজ। সেই সমস্যা সমাধানে এবার হস্তক্ষেপ করল হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। উচ্চ আদালতের সাফ নির্দেশ— ‘আগামী তিন মাসের মধ্যে যাবতীয় জটিলতা মিটিয়ে ওই প্রকল্পের কাজ শুরু করতে হবে। রাজ্য ও রেল উভয়পক্ষ বৈঠকে বসে এই সমস্যার সমাধান করবে।’ হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে এই প্রকল্প শেষ হলে উপকৃত হবেন বহু মানুষ।
তারকেশ্বর ও বিষ্ণুপুর দুই-ই গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ক্ষেত্র। তাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন এই দুই ক্ষেত্রকে রেলপথে যুক্ত করার কথা ঘোষণা করেন। বর্তমানে তারকেশ্বর থেকে গোঘাট পর্যন্ত চলছে ট্রেন। গোঘাট থেকে যাত্রীরা এক ট্রেনে সরাসরি হাওড়ায় যাচ্ছেন। বিষ্ণুপুরের ময়নাপুর থেকে বড় গোপীনাথপুর পর্যন্ত নতুন রেল লাইনে ‘ট্রায়াল রান’ হয়ে গিয়েছে বহু আগে। কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটি হয়ে বিষ্ণুপুর পর্যন্ত রেল লাইনের কাজও চলছে। কিন্তু, গোঘাট ও কামারপুকুরের মাঝে ভাবাদিঘিতে আটকে রয়েছে প্রকল্পের কাজ। দিঘি বাঁচিয়ে রেল পথ নির্মাণের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই এই মামলা।
এদিন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম ও বিচারপতি চৈতালি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি ছিল। শুরুতেই মামলাকারীর আইনজীবী দাবি করেন, রাজ্য সরকার ও রেলের মধ্যে রাজনৈতিক বিবাদের কারণে আটকে মাত্র দেড় কিমি পথ। ভাবাদিঘি আন্দোলনকারীদের আইনজীবী পাল্টা বলেন, ‘১৭ একর জুড়ে এই দিঘি। আড়াইশো মানুষের রুজিরুটির প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে জলাভূমি সংরক্ষণের বিষয়টিও।’ এই বক্তব্য শুনেই প্রধান বিচারপতি বলে ওঠেন, ‘আড়াই লক্ষ মানুষের স্বার্থের কাছে আড়াইশো মানুষের স্বার্থ বড় হতে পারে না। তা ছাড়া রেল প্রকল্পের জন্য দিঘির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। প্রয়োজনে দিঘির উপর পিলার করে রেলপথ সম্প্রসারণ করা যায়। বঙ্গোপসাগরের উপর যদি রেলপথ গড়া যায়, তাহলে এক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়?’ রেলের তরফে দাবি করা হয়, ‘নবান্ন গিয়ে মুখ্য সচিবের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে। কিন্তু রাজ্য সহযোগিতা করছে না। যে কারণে এই প্রকল্পের খরচ ৪৮০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এখন ১৩০০ কোটি ছাড়িয়েছে।’
সবপক্ষের বক্তব্য শোনার পর প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আদালত মনে করে যেহেতু এরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজে রেলমন্ত্রী থাকাকালীন এই প্রকল্পের ঘোষণা করেছিলেন, তাই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সবরকম সাহায্য করা উচিত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের।’ এরপরই তিন মাসের মধ্যে কাজ শুরুর নির্দেশ দেয় ডিভিশন বেঞ্চ। যদিও তবে দিঘিকে বাঁচিয়ে রেলপথ নির্মাণের ব্যাপারে এখনও অনড় ভাবাদিঘি বাঁচাও কমিটির সম্পাদক সুকুমার রায়।