অভিষেক পাল, বহরমপুর: মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের লক্ষ্মীজনার্দনপুরের বহুরা গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পুজো আজও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অন্যতম নজির। জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো এই পুজোয় মুসলমান সম্প্রদায়ের কেউ না কেউ ‘কোদাখাকি দুর্গা’কে স্বপ্নে দেখেন। ১৪দিন আগে ঘট বসিয়ে চণ্ডীপাঠ করে বলি দিয়ে পুজো শুরু হয়। সপ্তমী, সন্ধিপুজো ও নবমীতে বলি দেওয়া হয়। মায়ের ভোগে কাউনের চাল আবশ্যিক। সেখান থেকেই নাম হয় কোদাখাকি। সন্ধ্যায় কোনও আরতি হয় না। সন্ধিপুজোয় কোনও সময় দেখা হয় না। প্রদীপের শিখা ঠিক উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ঘুরলে তখনই সন্ধিপুজো শুরু হয়। এখানে কারও অঞ্জলি দেওয়ার রীতি নেই।
বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল সাগরদিঘির মণিগ্রামে। বিশেষ কারণে বহুকাল আগেই তাঁরা সেখান থেকে বহুরায় চলে আসেন। পরিবারের সদস্যরা এখনও এই পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন। কথিত আছে, একবার পুজোর আগে ভয়াবহ বন্যায় সব ভেসে যায়। প্রজারা কোনও কর দিতে পারেননি। সেবার পুজো করার সামর্থ্য ছিল না বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের। তখন স্বপ্নে দর্শন দিয়ে দেবী জানান, লক্ষ্মীজনার্দনপুরে কাউনের চাল হয়েছে। সেই চালের ভোগ দিয়েই পুজো হবে। সঙ্গে থাকবে কাঁঠাল, ডাঁটা ও গঙ্গার ইলিশ। কাউন বা কোদার চাল খেয়েছিলেন বলেই এই পরিবারের দুর্গা ‘কোদাখাকি’ নামে পরিচিত।
এছাড়াও, কথিত আছে, বন্দোপাধ্যায় বাড়ির পিছনে এক মুসলিম মহিলা থাকতেন। বহুদিন ধরেই তাঁর সন্তান হচ্ছিল না। বাড়ির পাশের ওই মহিলা স্নান সেরে মায়ের কাছে সন্তান প্রার্থনা করেন। মা তাঁর মনোস্কামনা পূর্ণ করেন। পরবর্তীতে এই পুজোর সঙ্গে জুড়ে যায় মুসলিম বধূর পুত্রসন্তান জন্মের কাহিনি। তার নাম রাখা হয় লোকমান। সেই থেকে ওই বধূ ‘লোকার মা’ বলে পরিচিত হন। প্রতি বছর দেবীর প্রতিমা তৈরির সময় প্রতিমাকে একটি করে শাঁখা ও নোয়া দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। দেবীর গায়ে মাটি পড়লে তখনই শাঁখা এবং নোয়া পরিয়ে দেওয়া হতো। তারপর উনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, মায়ের হাতে শাঁখা ও নোয়া দিয়ে যেতেন। পরবর্তীতে লোকার মায়ের মতো কোনও না কোনও মুসলিম পরিবার দেবীর কাছে কিছু না কিছু দান করছেন। শোনা যায়, পুজোর আগে মুসলমান সম্প্রদায়ের কোনও না কোনও মানুষকে দেবী দর্শন দেন। একবার স্বপ্নাদেশ পেয়ে ঢাকা থেকে কাউনের চাল নিয়ে চলে আসেন একজন। সেই চাল দিয়েই মায়ের ভোগ রান্না করা হয়।
পরিবারের অষ্টম পুরুষ স্বপন বন্দোপাধ্যায় বলেন, ষোড়শ শতাব্দীতে আমাদের পুজোর শুরু হয়। আমরা অযোধ্যা থেকে আগত পুরোহিত। বল্লাল সেনের কাছ থেকে জায়গির পাই। তিনটি মহল্লার অধিকার পাই। আমাদের মোট ৪৭০০বিঘার সম্পত্তি ছিল। আমাদের পুজোর কিছু নিয়ম-নীতি আছে। ১৪দিন আগে ঘট বসিয়ে চণ্ডীপাঠ করে বলি দিয়ে পুজো শুরু হয়। সপ্তমী, সন্ধিপুজো ও নবমীতে বলি দেওয়া হয়। মায়ের ভোগে কাউনের চাল আবশ্যিক। সেখান থেকে নাম হয়েছে ‘কোদাখাকি’। সন্ধ্যায় কোনও আরতি হয় না। সন্ধিপুজোর সময় কোনও সময় দেখা হয় না। প্রদীপের শিখা ঠিক উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ঘুরলে তখনই সন্ধিপুজো শুরু হয়। এখানে কারও অঞ্জলি দেওয়ার রীতি নেই। তন্ত্রমতে পুজো হয়। মায়ের মূর্তির যে ধরণ, তাঁকে নটরাজ মূর্তি বলা হয়। ১৪দিন আগে পুজোর ঘট বসে। তারপর চণ্ডীপাঠ করে ছাগ বলি দিয়ে পুজো শুরু হয়।