


ঢাকা: বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত মহিলা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, খুলনা—যেখানেই নির্বাচনে লড়েছেন, বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। সেদেশের ইতিহাসে খালেদা জিয়াই একমাত্র উদাহরণ, যিনি পাঁচটি সংসদীয় নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই বিজয়ী হয়েছেন। মঙ্গলবার তাঁর প্রয়াণের পর এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশে ভবিষ্যতের নেতা কে? সেই সূত্রেই ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচন আগে সবার চোখ প্রয়াত নেত্রীর পুত্র তারেক রহমানের দিকে। ১৭ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন কাটিয়ে তিনি সম্প্রতি বাংলাদেশে ফিরেছেন। মায়ের প্রয়াণের পর সহানুভূতির হাওয়া কাজে লাগিয়ে তিনি কি পারবেন বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের জোটবদ্ধ করে আসন্ন নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে আনতে? আপাতত সেই দিকেই থাকবে আগ্রহীদের চোখ।
ভোটে হারার গল্প খালেদার নির্বাচনি ইতিহাসে নেই। এমনকি যেসব নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারেনি, সেখানেও তিনি যতগুলি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন, সবক’টিতে জয়ী হন। ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদীয় নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বগুড়া–৭, ঢাকা–৫, ঢাকা–৯, ফেনী–১ ও চট্টগ্রাম–৮ আসনে। পাঁচটিতেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। সেবার বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়াই বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন। বিশ্বের ইতিহাসে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনও দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনও নারী হিসেবে এই কৃতিত্ব লাভ করেন।
১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন জিতে সরকার গঠন করে আওয়ামি লিগ। সেই ভোটেও পাঁচটি আসনের প্রার্থী খালেদা জিয়াকে হারাতে পারেননি কেউ। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদীয় নির্বাচনেও খালেদা জিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন পাঁচ কেন্দ্রে। এবং সব আসনে বিপুল ভোটে জয়ী। সেবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশন একজনের জন্য সর্বোচ্চ তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নির্ধারণ করে। খালেদা যথারীতি তিন কেন্দ্রেই অনায়াসে জয়ী হন।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকারে গিয়েছিল বিএনপি। সেই নির্বাচনে পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন খালেদা। টানা দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। যদিও একতরফা সেই ভোট বিতর্কের জন্ম দেয়। ওই সংসদেই অবশ্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস হয়। শপথ নেওয়ার মাত্র ১১ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন খালেদা। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য (শিক্ষা) দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আপসহীনতার কারণে দলমত নির্বিশেষে খালেদা জিয়াকে সবাই পছন্দ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সবাই ধরে নিয়েছিল আওয়ামি লিগ ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু সে সময় টিভিতে খালেদার একটি ভাষণ সব হিসেব উলটে দেয়। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে খালেদা তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র পেশ করেছিলেন। কিন্তু আদালতের কারাদণ্ডের রারে কারণে তাঁর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনে বগুড়া–৭, দিনাজপুর–৩ ও ফেনী–১ আসনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে চেয়েছিলেন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হলেও আর ভোটে লড়া হল না বেগমের। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে ঢাকার হাসপাতালের বাইরে ভিড়। দূরে দেখা যাচ্ছে শোকবার্তা লেখা বিলবোর্ড। ছবি: এএফপি