সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর। পুজোর মরশুম। উৎসবের জোয়ার গোটা বাংলায়। উৎসব মুখর বর্ধমান শহরও। রাস্তায় মানুষের ঢল। আচমকা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল খাগড়াগড়ে। উৎসবের রেশ মিলিয়ে গেল আতঙ্কে। তদন্তে নামল দেশের তাবড় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। জানা গেল, বিস্ফোরণের নেপথ্য কারিগর বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। শিকড় বাংলাদেশে থাকলেও খাগড়াগড় ছিল সংগঠনের বিস্ফোরক তৈরির ল্যাবরেটরি। খাগড়াগড়ের বদনাম সেই থেকে। তারপর কেটে গিয়েছে এক যুগ। এখনও খাগড়াগড়ের কেউ বাইরে গেলেই শুনতে হয় বিস্ফোরণের কথা। অনেকে লুকিয়ে ‘জঙ্গি এলাকার লোক’ বলে চর্চা করেন। সেই বদনাম ঘোচাতে এবার মরিয়া খাগড়াগড়। বাইরে থেকে আসা কারও গতিবিধি সন্দেহজনক ঠেকলেই ফোন যায় থানায়। এলাকার কেউ না কেউ সেই ফোন করেন। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দার সংস্থার ফোন নম্বরও রয়েছে অনেকের কাছেই। ফলে, তারাও সহজে খবর পেয়ে যায়।
খাগড়গড়ের সেই বিস্ফোরণস্থলের পড়শি পাড়ায় বাড়ি ঝুমা বিবির। কথা হচ্ছিল তাঁর বাড়ির উঠোনো দাঁড়িয়ে। তিনি বলছিলেন, ‘ওই ঘটনায় স্থানীয় কেউ যুক্ত ছিল না। তবুও আমাদের বদনাম শুনতে হয়। বাড়ি গিয়ে বাড়ি খাগড়াগড় বললেই বহু প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর ওই ধরণের ঘটনা আর হতে দেব না। বাইরে থেকে বাড়ি ভাড়া নিতে এলে তাঁর নাড়ি-নক্ষত্র জানা হয়। তারপর বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়।’ খাগড়াগড়ের আর এক যুবকের কথায়, ‘আমরা আর ঝুঁকি নিইনা। কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে থানায় খবর দিই। পাড়ার লোকজনরাও নজরদারি চালায়।’ এলাকার বাসিন্দা সামিম শেখ বলছিলেন, ‘আমাদের এখানে অনেক ভাল কাজ হয়। কিন্তু মানুষ মনে রেখেছে খাগড়াগড়ের সেই বিস্ফোরণের ঘটনা। আগামী দিনে মানুষ যাতে ভাল কাজের জন্য খাগড়াগড়কে মনে রাখে সেই ব্যবস্থা করা হবে।’প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এখন শহরের আভিজাত্য এলাকাগুলি চিন্তা বাড়াচ্ছে। কয়েক দিন আগেই ‘রেনেসাঁ’ থেকে এক পাকচর গ্রেপ্তার হয়েছে। তিন মাস আগে সে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল। সেখানকার বাসিন্দারা বলছেন, এখানে বাইরে থেকে কেউ এসে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকলেও কেউ খবর নেয় না। রাতের দিকে যে কেউ উপনগরীতে ঢুকে যায়। বিজেপি নেতা তথা রেনেসাঁর বাসিন্দা দেবজ্যোতি দাস বলেন, ‘পরিচয়পত্র দেখেই যাতে ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া হয় তারজন্য আমরা বুধবার মাইকে প্রচার করেছি। এখানকার নিরাপত্তা ব্যাবস্থা যাতে আরও জোরদার করা হয়, তা পুলিশকে দেখতে বলা হয়েছে।’স্থানীয়রা বলছেন, অপরাধীরা বর্ধমান শহরকে ‘সেফজোন’ হিসাবে বেছে নিয়েছে। এই শহর থেকে খুব সহজেই সড়ক ও রেলপথে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া যায়। শহরের সর্বত্র মাথা তুলেছে আবাসন। সেখানে বাইরে থেকে এসে কেউ আশ্রয় নিলেও টের পায় না। কিন্তু এখন সজাগ খাগড়াগড়। বাইরে থেকে কেউ এসে যাতে নাশকতামূলক কাজ করতে না পারে তারজন্য অতীন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় রয়েছেন খাগড়াগড়বাসী।