


যুদ্ধ কখনোই কাম্য নয়। ভারত বরাবরই শান্তি এবং গণতন্ত্রের পক্ষে। কিন্তু যুদ্ধ যদি চাপিয়ে দেওয়া হয়? স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ভারতের পক্ষে চুপ করে বসে থাকা সম্ভব কী করে? রাষ্ট্রগঠনের সূচনালগ্ন থেকেই পাকিস্তান গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে জোর দিয়েছে আঞ্চলিক সামরিক শক্তি হয়ে ওঠার উপরে। কেননা, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে তৈরি ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তানের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের বেশিরভাগই অস্ত্র ব্যবসাটা ভালো বোঝে। তারাই দখল করে রেখেছে সেনা বাহিনীর উচ্চ পদগুলি। কেন্দ্রে এবং রাজ্যে রাজ্যে আসীন সেনারই পুতুল সরকার। এমন রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক চাহিদা মেটাবার কোনও দায় থাকে না। তারা বরং দায়বদ্ধ ভাড়াটে গুন্ডা বাহিনীর কাছে। তাদের দায়িত্ব বিশ্বজুড়ে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া। কোমলমতি যুব শ্রেণিকে উগ্র ইসলামে দীক্ষা দেওয়া হয় আর নাশকতার প্রশিক্ষণ শেষে হাতে হাতে তুলে দেওয়া হয় বেআইনি অস্ত্রশস্ত্র। তার ফলে পাকিস্তান জুড়ে আম জনতার দুর্দশার শেষ নেই। মুসলিম জনগণ আর মানবাধিকার হত্যায় তারা বিশ্ব রেকর্ড করেছে। আর এহেন একটি দেশেরই চোখে কাশ্মীরিদের মানবাধিকার নিয়ে কুম্ভীরাশ্রু! তারা চার চারবার যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে ভারতের উপর। এছাড়া লাগাতার চালান করে চলেছে জঙ্গি বাহিনী। ভারতের অভ্যন্তরে অসংখ্যবার নাশকতামূলক অপরাধ করেছে তারা। পাকিস্তানের নষ্টামির সর্বশেষ উদাহরণ পহেলগাঁওয়ে টার্গেট কিলিং। ২৬ জন নিরীহ পর্যটককে তারা ধর্মপরিচয় জেনে হাসতে হাসতে হত্যা করেছে!
স্বভাবতই তার বদলা নেওয়া শুরু করেছিল ভারত। ঘটনার পক্ষকাল পরে ‘অপারেশন সিন্দুর’ শুরু হতেই ত্রাহি মধুসূদন রব তুলেছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ড এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীর মিলিয়ে মোট ন’টি স্থানে জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় সেনা। লস্কর এবং জয়েশসহ তিনটি জঙ্গি সংগঠনের সদর দপ্তরও ধূলিসাৎ হয়েছে ওই অভিযানে। বেশকিছু জঙ্গি নেতাকেও খতম করা হয়েছে। শত্রুর পাল্টা হামলা সাফল্যের সঙ্গেই রুখে দিচ্ছে ভারতীয় সমরকৌশল। পাকিস্তানের পর্যুদস্ত হওয়া যখন সময়ের অপেক্ষা বলে ভারতবাসী মনে করছিল, ঠিক তখনই খবর এল যুদ্ধবিরতির! শনিবারের বারবেলায় আচমকা তা কে ঘোষণা করলেন? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নজিরবিহীনভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্প বললেন, ‘অত্যন্ত খুশি হয়ে জানাচ্ছি, দু’দেশের সঙ্গেই আলোচনা করে আমেরিকার মধ্যস্থতায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে রাজি।’ এরপরই ভারত সরকারিভাবে জানায়, এদিন বিকেলে আমাদের ডিজিএমও’কে ফোন করেন পাক ডিজিএমও। তিনিই যুদ্ধবিরতি চান! পাক ডিজিএমও আশ্বস্ত করেন যে, তাঁরা আর কোনও অস্ত্র ব্যবহার করবেন না। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, শনিবার বিকেল ৫টা থেকে যুযুধান দু’দেশই সবরকম আগ্রাসন থেকে সরে আসবে। অর্থাৎ ঘোষণা হল যুদ্ধবিরতি। দু’দেশের সেনা স্তরে পুনরায় কথা হবে আজ, সোমবার। কিছুক্ষণের মধ্যে পাল্টি খান পাক বিদেশমন্ত্রী ইশাক দারও। তাঁর নরম ঘোষণা, ‘পাকিস্তান তো সর্বদাই শান্তির পক্ষে!’
কিন্তু পাকিস্তান এবং তাদের কোনও নেতারই যে সামান্যতম বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, তার প্রমাণ মিলল অতিদ্রুত। ট্রাম্পের মধ্যস্থতাই সার। ফোন করে যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ করার ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই, যথারীতি বিশ্বাসভঙ্গ করল ইসলামাবাদ। শনিবার সন্ধ্যা হতে না হতেই ফের স্বমহিমায় গোলাবর্ষণ শুরু করেছে পাকিস্তানি সেনা। পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের খবর রাতেই নিশ্চিত করেন বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রি। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত নিন্দনীয়। সেনাকে সংযত রাখতে উপযুক্ত পদক্ষেপ করুক পাকিস্তান। না-হলে কড়া ব্যবস্থা নেব।’ তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘ভারতীয় সেনাকে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। আর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হলে কঠোর প্রত্যাঘাতই করা হবে।’ যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং তিন বাহিনীর প্রধানকে নিয়ে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সরকারি সূত্রের খবর, সিন্ধু জলচুক্তি আপাতত স্থগিতই থাকবে। একইসঙ্গে যবনিকার অন্তরালে থাকবে যাবতীয় বাণিজ্য এবং অন্যবিধ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী দিনে যেকোনও আগ্রাসী আক্রমণ ভারত ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং তার জবাবও দেবে পূর্ণশক্তিতে। ভারতবাসী শান্তিকামী হলেও যে পদ্ধতিতে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত, তাতে কেউই খুশি নন। কারণ চিহ্নিত জঙ্গিঘাঁটির বেশিরভাগই এখনও অক্ষত। দাউদ ইব্রাহিম, মাসুদ আজহার, হাফিজ সইদ-সহ একঝাঁক কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী নেতাকে ভারত হাতে পায়নি। ফলে সিঁদুরের প্রকৃত বদলা কোথায় হল? কোথায় পূরণ হল পাক অধিগৃহীত কাশ্মীর ফেরাবার অঙ্গীকার? কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত যেন আমেরিকা বা অন্যকোনও ‘দাদা’র মধ্যস্থতা স্বীকার না করে, কেননা কাশ্মীর চিরদিনই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়। যুদ্ধবিরতির বিষয়ে দেশবাসীকে অবগত করার জন্য অবিলম্বে সংসদের বিশেষ অধিবেশনও ডাকা উচিত।