স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: বিধানসভা কেন্দ্র হিসাবে কসবার জন্মলগ্ন থেকে এলাকায় তাঁর অবাধ বিচরণ। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা। বিধায়ক হিসাবে খান সাহেবকেই চেনেন সবাই। আর দল বলতে তৃণমূল। প্রতিপক্ষ কোথায়? তারা থাকলে গতবার ব্যবধান ৬৩ হাজার হতো নাকি? জাভেদ খানই এখানে ফ্যাক্টর! তাই তো চতুর্থবারের জন্য দিদির ভরসা খান সাহেব। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলছিলেন তিলজলা মোড়ে এক বিরিয়ানির দোকানের মালিক। তাঁর কথাতেই স্পষ্ট, কসবার ‘মসিহা’ আর কেউ নন। তিনি জাভেদ খান।
স্থান বদলে পিকনিক গার্ডেনে গেলেও খান সাহেব সম্পর্কে একই কথা শোনা গেল। ২০১১, ২০১৬, ২০২১ সালের পর এবারও জাভেদ খানের হাতেই এলাকার উন্নয়নের চাবিকাঠি দেখতে পাচ্ছে কসবা। তাহলে বিরোধীদের ভূমিকা কী? স্থানীয় তৃণমূল কর্মীরা বলছেন, খান সাহেবের কাছে বিজেপি, সিপিএম হল এক-একটা ব্যাটারি। সেই ‘ব্যাটারি’ আবার ডাউন। গত নির্বাচনগুলির পরিসংখ্যান বলছে, বিরোধীদের ভোট নিজের কবজায় আনাই খান সাহেবের স্ট্র্যাটেজি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুর বেঁধে দেওয়া উন্নয়নের রাস্তা ধরেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় তৃণমূল। বিজেপির দাবি, ‘গুণ্ডামি করে, মানুষকে ভয় দেখিয়ে ভোট চুরি করে শাসকদল।’
কেমন আছে কসবা? নাগরিক পরিষেবার হালই বা কী? কলকাতা পুরসভার ৬টি ওয়ার্ড (৬৬, ৬৭, ৯১, ৯২, ১০৭, ১০৮) নিয়ে তৈরি কসবা বিধানসভা। এর মধ্যে ৬৭ নম্বর ওয়ার্ড মানেই বাম আমলের কথা মনে পড়ে বাসিন্দাদের— জলকষ্ট। স্থানীয় বাসিন্দা আকাশ ঘোষ বলেন, এই এলাকা অনেকটা ভিতরে হওয়ায় এক সময় পানীয় জলের ব্যাপক সংকট ছিল। এখন সেই জলকষ্ট অনেকটাই মিটেছে। তবে কিছু জায়গায় এখনও সমস্যা রয়েছে। পিকনিক গার্ডেন রোডের অবস্থা বেহাল। এই রাস্তা ধরেই কলোনি গেট থেকে পিকনিক গার্ডেন যাওয়া যায়। বাসিন্দারা বলছেন, মেরামতি হলেও বারবার ভেঙে যায় এই রাস্তা। তবে বর্ষায় আর জল জমে না। গত ১০ বছরে কসবা, পিকনিক গার্ডেন অঞ্চলে নিকাশি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে।
ভোট পরিসংখ্যানে নজর দিলে দেখা যাবে, বাম আমলে কসবা বিধানসভা এলাকা বিভক্ত ছিল তৎকালীন বালিগঞ্জ, ঢাকুরিয়া ও যাদবপুর কেন্দ্রের মধ্যে। ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে কসবা বিধানসভা কেন্দ্রটি গঠিত হয়। তৃণমূলের প্রার্থী হন জাভেদ খান। প্রায় ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম বিধায়ক হন তিনি। জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ২০ হাজার ভোটের। ২০১৬ সালে প্রায় ৭ শতাংশ কমে যায় খান সাহেবের ভোট। সেবার সিপিএম পেয়েছিল প্রায় ৪১ শতাংশ ভোট। একুশের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপির ভোট ৯ তেকে বেড়ে ২৫ শতাংশে পৌঁছায়। আর সিপিএমের ভোট কমে হয় ১৭ শতাংশ। বাকি ভোট ঘাসফুলে ‘শিফট’ হওয়ায় খান সাহেব ৬৩ হাজার ৬২২ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
জাভেদ খানের কথায়, ‘এখানে আমার উপর প্রতিটি পাড়ার বাসিন্দাদের ভরসা আছে। আমি প্রতিটি মানুষকে চিনি। তাঁদের সঙ্গে আত্মিক যোগ রয়েছে। এবার মার্জিন আরও বাড়বে।’ তবে জাভেদের সঙ্গে লড়াই যে বেশ কঠিন, তা প্রচারে বেরিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন বিজেপি প্রার্থী সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিকে, জোড়াফুল ও পদ্মফুলের টক্করের মধ্যে ‘সেটিং’ তত্ত্বকে খাড়া করছেন সিপিএমের প্রার্থী দীপু দাস। তাঁর কথায়, ‘কসবা অঞ্চল চিরকালীনই বামপন্থীদের ঘাঁটি। নির্বাচনের পর এখানকার মানুষকে ভয়মুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত কসবা উপহার দেওয়াই আমার লক্ষ্য। অঞ্চলে তো বিধায়ককে দেখাই যায় না। তাহলে কীসের বিধায়ক!’
বিরোধীদের নিশানা থাকলেও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর জাভেদের মুখে একটাই ডায়লগ— ‘ওরা ব্যাটারি ডাউন ক্যান্ডিডেট’।