সৌমিত্র দাস, কাঁথি: ১৯৪২সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে ব্রিটিশ পুলিসের বন্দুকের সামনে বুক পেতে কাঁথির মহিষাগোট সহ আশপাশের গ্রামের ছয় বীর শহিদ হয়েছিলেন। সেই বীরগাথা এখনও ভোলেননি মহিষাগোটের মানুষ। মহিষাগোটে শহিদদের স্মৃতিস্তম্ভও রয়েছে। স্বাধীনতা দিবসের আগে শহিদদের স্মৃতি রক্ষার্থে উদ্যোগী হওয়ার দাবি উঠেছে। কাঁথি-১ বিডিও অমিতাভ বিশ্বাস বলেন, এলাকার মানুষ দাবি জানালে প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
৮আগস্ট মহাত্মা গান্ধী ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দেন। স্বাধীনতার স্বাদ পেতে সারা দেশের সঙ্গে মেদিনীপুরের কাঁথি মহকুমাও উত্তাল হয়ে ওঠে। আন্দোলন চলাকালীন ২০সেপ্টেম্বর পিছাবনিতে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবককে ব্রিটিশ পুলিস গ্রেপ্তার করেছিল। পরে স্থানীয় জনতার চাপে পুলিস তাঁদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পুনরায় পুলিসি অত্যাচারের আশঙ্কায় সরিষাবেড়িয়ায়(মহিষাগোট) কাঁথি-দীঘা রাস্তার উপর স্থানীয়রা একটি বড় খাদ খনন করেন। পুলিস যাতে গাড়ি নিয়ে এলাকায় ঢুকতে না পারে, সেজন্যই এই খাদ খনন করা হয়। কিন্তু ২২সেপ্টেম্বর মহকুমা শাসক বিশাল পুলিসবাহিনী নিয়ে এসে জনগণকে সেই খাদ মেরামত করতে বাধ্য করে। এর প্রতিবাদে সেখানে ক্রমশ জমায়েত বাড়তে থাকে। একটা সময় পুলিস-জনতা খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। পুলিসের নির্মম গুলিচালনায় ছয়জন মারা যান। জখম হন ২৪জন।
কাঁথির তাজপুরের যামিনীরঞ্জন কামিলা, রামনগরের দক্ষিণ শীতলা গ্রামের সর্বেশ্বর প্রামাণিক ও ইসলামপুরের রাখহরি জানা, মহিষাগোটের পোতাপুকুরিয়ার অনন্তকুমার পাত্র, বেলতলার অনন্তকুমার দাস ও আদামবাড় গ্রামের কুঞ্জবিহারী শীট-এই ছয়জন শহিদ হয়েছিলেন। গান্ধীজির ভাষায় যা ছিল ‘বীরোচিত ও গৌরবময়’। এভাবেই মহিষাগোট হয়ে ওঠে শহিদতীর্থ।
পরে স্বাধীনতা সংগ্রামে মহিষাগোটের গৌরবময় ইতিহাস মনে রাখতে ও শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপিত হয়। পিছাবনি কংগ্রেস কমিটির উদ্যোগে বাংলা ১৩৫৫সালে স্মৃতিস্তম্ভের আবরণ উন্মোচন করেন প্রয়াত প্রাক্তন রাজ্যপাল কৈলাসনাথ কাটজু। পরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পরে সেটি বেহাল হয়ে পড়েছিল। ২০১৯সালে মহিষাগোট শহিদবেদী সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কমিটি সেটি সংস্কারে উদ্যোগী হয়।
প্রতিবছরই স্বাধীনতা দিবস সহ বিভিন্ন দিনে এলাকার মানুষ শহিদবেদীতে মাল্যদান করেন। শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্থানীয় হাইস্কুলের নামকরণ হয়েছে মহিষাগোট শহিদ স্মৃতি বিদ্যামন্দির। সেখানকার একটি ক্লাবের নাম হয়েছে শহিদ স্মৃতি সঙ্ঘ।
মহিষাগোট হাইস্কুল যে জমিতে গড়ে উঠেছে, শহিদদের স্মৃতিতে তা দান করেছিলেন প্রয়াত অচিন্ত্যকুমার জানা দাস। স্কুল চত্বরে অচিন্ত্যবাবুর সময়ে তৈরি পুরনো ভবনটি ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। সেই ভবন সংস্কার সহ স্কুলের সামগ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়ন, শহিদদের নামে এলাকার রাস্তাঘাটের নামকরণের দাবি অনেকদিন ধরেই রয়েছে।
মহিষাগোট হাইস্কুলের বাংলার শিক্ষক কৌস্তভকান্তি প্রধান, রামনগরের সটিলাপুরের বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক নন্দগোপাল পাত্র বলেন, পিছাবনিতে শহিদ স্মৃতি সংগ্রহশালা গড়ে উঠছে। শহিদদের স্মৃতি সহ তথ্য সেই সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করা হলে খুবই ভালো হয়। আরও বিভিন্ন দাবি পূরণ হলে শহিদদের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান জানানো হবে।