রবীন রায়, আলিপুরদুয়ার: বোড়ো মহিলাদের পরিচালিত কালচিনির দক্ষিণ সাঁতালির কার্জিপাড়া কিষান সংঘের দুর্গাপুজো শুরু হয় মহালয়ার দিন থেকেই। মহালয়াতে বাড়িতে ‘বাথৌ’-কে (শিব) পুজো দিয়ে ‘মাইনাও’ (দু্র্গা) মণ্ডপে যায় মেয়েরা। কার্জিপাড়ায় বানিয়া নদীর তীরে বোড়োদের পুজোয় উমা শাড়ি পরে না। আসে ডোকনা পরে। লক্ষ্মী, সরস্বতীর পরনেও থাকে ডোকনা। আর গণেশ, কার্তিক ও মহিষাসুর আসে গামছা পরে।
পুজো এবার ৫৭ বছরে পা দিল। দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মীকে অসমের গোঁসাইগাঁও থেকে আনা বোড়োদের ঐতিহ্যবাহী ডোকনা পরানো হয়। অসুর, কার্তিক ও গণেশের গামছাও আসে অসম থেকে। মায়ের বাহন সিংহের অবশ্য কোনও সাজ পোশাক থাকে না। তবে বোড়োদের দুর্গা প্রতিমার সঙ্গে শিবের কোনও মূর্তি থাকে না। শুধু শিবের ফটো বা ছবি থাকে মায়ের মূর্তির সঙ্গে। কার্জিপাড়া, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম সাঁতালি গ্রামে বোড়ো, আদিবাসী ও রাভা সম্প্রদায়ের মানুষেরা বসবাস করেন। প্রতিমা নিয়ে আসা, বাড়ি বাড়ি চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে পুজোর আয়োজন ও প্রসাদ বিলি সবই করেন মহিলা সদস্যরাই। পুরুষরা থাকে পিছনের সারিতে।
বোড়োদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ডোকনা ও গামছা। এখন ডুয়ার্সেও এই পোশাক তৈরি হয়। তবে অসমে ভালো মানের ডোকনা ও গামছা তৈরি হয়। সেই জন্য মায়ের ও তাঁর সন্তানদের পুজোর জন্য ওই পোশাক অসম থেকে আনা হয়। ডোকনা পরিয়েই মায়ের পুজো করা হয়। এটাই বোড়োদের দুর্গাপুজোর প্রাচীন রীতি। সেই রীতি মেনে এ বছরও ধুমধাম করে পুজো হবে মায়ের।
পুজো কমিটিতেও মহিলাদের দাপট। পুজো কমিটির সভানেত্রী সারথী নার্জিনারী, সম্পাদিকা রিঙ্কু নার্জিনারী ও কোষাধ্যক্ষ অনিন্দিতা শৈব। রিংকু বলেন, হ্যামিল্টনগঞ্জ থেকে আসবে মায়ের মাটির প্রতিমা। মায়ের প্রতিমায় মহিলারাই ডোকনা পরাবেন। ডোকনা ও গামছা আমাদের সমাজের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। সারথী নার্জিনারী আরও বলেন, দুর্গার মতো সরস্বতী ও লক্ষ্মীকেও ডোকনা পরিয়ে পুজো করা হয় এখানে। কার্তিক, গণেশ আর অসুরের পরনে থাকবে গামছা।
বোড়ো সমাজের মানুষ প্রকৃতির উপাষক। তাই স্থায়ী মন্দিরে গাছপালা রেখে দেবী দুর্গাকে প্রকৃতিরূপে পুজো করেন। মহালয়ার দিন প্রথমে মায়ের পুজো হয় বোড়ো পুরোহিত দিয়ে। পরে পুজোর চার দিন মায়ের পুজো হয় বাঙালি পণ্ডিত বা পুরোহিত দিয়ে। পুজোর চার দিন বোড়ো, রাভা, মেচ ও আদিবাসীদের লোকায়ত নৃত্যের জমজমাট আসরও বসে। অষ্টমী ও নবমীতে সর্বসাধারণের মধ্যে খিচুড়ি বিলি হবে। দশমীতে শোভাযাত্রার মাধ্যমে ডোকনা পরিহিত উমার
নিরঞ্জন হবে বানিয়া নদীতে।
ফাইল চিত্র।