জ্যোতির কথা বল্লে—নাম করলেই জ্যোতি পাওয়া যায়?
হাঁ, নাম যত গাঢ় হয় ততো জ্যোতির বিকাশ হয়। মধ্যমায় জ্যোতি, নাদ দুইই মিলে।
আগে জ্যোতি, না আগে নাদ?
তার কোন স্থির নাই, অধিকারী বিশেষে জ্যোতি, নাদ অগ্র-পশ্চাৎ আত্মপ্রকাশ করেন।
জ্যোতিটি কি তুমি একবার আমায় ভাল ক’রে বুঝিয়ে বল।
অথ যদতঃ পরো দিবো জ্যোতির্দীপ্যতে। অনন্তর দ্যুলোকের ঊর্দ্ধে, বিশ্বের পৃষ্ঠে, সকলের পৃষ্ঠে অর্থাৎ সংসারের অতীতরূপে অতিশয় উৎকৃষ্ট সত্যাদি লোকসমূহে যে ব্রহ্মজ্যোতি স্বপ্রকাশভাবে দেদীপ্যমান, সেই জ্যোতিই এই পুরুষের শরীর মধ্যে উপলব্ধ হন।
তাহ’লে জ্যোতি যে আমার মধ্যে আছে তা কি করে বোঝা যায়?
তাপই হল জ্যোতির দর্শনের চিহ্ন। গায়ে হাত দিলে তাপ অনুভব হলেই বোঝা যাবে যে এর মধ্যে সেই ব্রহ্ম-জ্যোতি আছে, মৃতশরীরে তা থাকে না। শুনেছি সমাধিস্থ পুরুষগণের গায়ে তাপ থাকে না। তাঁদের ব্রহ্মরন্ধ্রে অতি সূক্ষ্মভাবে সে তাপ থাকে, স্থূলদেহ স্পর্শে তা বুঝা যায় না।
নাদ কি?
নাদ হোলো এ জ্যোতির শ্রবণের চিহ্ন।… “তস্যৈষা শ্রুতির্যত্রৈতৎ কর্ণাবপিগৃহ্য নিনদমিব নদথুরিবাগ্নেরিব জ্বলত উপশৃণোতি।” কান বন্ধ কর্লে যে রথ চলার ন্যায় শব্দ, বৃষনিনাদ, ষাঁড়ের ডাকার মত ধ্বনি অথবা প্রজ্বলিত অগ্নির সদৃশ যে শব্দ শোনা যায়, তা সেই ব্রহ্মজ্যোতির শ্রবণের চিহ্ন।
ও, তাহ’লে জ্যোতি হল তাঁর দর্শনের এবং নাদ তাঁর শ্রবণের চিহ্ন? জ্যোতি দেখা মানে সেই ব্রহ্মজ্যোতি দেখা; নাদ শোনা মানে সেই ব্রহ্ম জ্যোতি শোনা। আচ্ছা, এর সঙ্গে নামের সম্বন্ধ কি?
সকল নামের আদিনাম ওঙ্কার—অ, উ, ম ত্রিবর্ণাত্মক। এই ‘অ’ হ’তেই সর্ব বর্ণের সৃষ্টি হয়েছে। কাজে কাজেই সমস্ত নামই ওঙ্কারস্বরূপ।
সেই ব্রহ্মজ্যোতির সঙ্গে প্রণব বা ওঙ্কারের সম্বন্ধ কি?
প্রণবই তো ব্রহ্ম। পরপ্রণব নির্গুণ ব্রহ্ম বা পরব্রহ্ম এবং অপর প্রণব সগুণব্রহ্ম বা অপর ব্রহ্ম। সেও পরপ্রণব সূত্রে বস্ত্রের মত ওতপ্রোতভাবে অপর প্রণবে অবস্থান কর্ছেন।
জ্যোতির সম্বন্ধের কথা জিজ্ঞাসা করেছি।
‘তদা পশ্চিমাভিমুখপ্রকাশঃ স্ফটিক ধুম্র বিন্দু নাদ কলা নক্ষত্র খদ্যোত দীপ নেত্র- সুবর্ণ- নবরত্নাদি প্রভা দৃশ্যন্তে। তদেব প্রণবস্বরূপম্’। মেরুদণ্ডস্থিত সুষুম্নায় স্ফটিকমণি, ধূম্র, বিন্দু, নাদ, কলা, নক্ষত্র, জোনাকী, দীপ, নেত্র, সুবর্ণ, নবরত্নাদি প্রভা দেখা যায়; তাহাই প্রণবের স্বরূপ।
শ্রীগুরুপ্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘শ্রীওঙ্কারনাথ-রচনাবলী’ (৩য়) থেকে